
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত সপ্তাহান্তে ভারত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র সেশেলসে পৌঁছানোর পর দেশটির সর্বোচ্চ সম্মাননাগুলোর একটি তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়। প্রজাতন্ত্রটির প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিক হারমিনি যখন তাঁকে ‘গার্ডিয়ান অব দ্য ব্লু হরাইজন’ পুরস্কারের ট্রফি ও সনদ দিচ্ছিলেন, তখন চওড়া হাসি দেখা যাচ্ছিল তাঁর (ভারতের প্রধানমন্ত্রী) মুখে।
তবে পর্যবেক্ষকেরা দ্রুতই এ পুরস্কারের পেছনে বেশ কিছু অসংগতি বা ত্রুটি খুঁজে বের করেন। পুরস্কারের সনদে ‘রিপাবলিক’ (Republic) বানানের জায়গায় ‘Repubblic’ ও খোদ দেশের নাম ‘সেশেলস’(Seychelles)–এর জায়গায় ‘Seycheeles’ লেখা ছিল।
বিতর্ক আরও উসকে দেয় যখন মোদির পাওয়া সনদকে বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। তাতে সনদটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বলে ব্যাপকভাবে চিহ্নিত হয়।
পরে জানা যায়, মোদির সেশেলস পৌঁছানোর মাত্র তিন দিন আগে এ পুরস্কারটি তৈরি করা হয়েছিল এবং মোদিই এর প্রথম ও একমাত্র গ্রহীতা।
বিতর্ক আরও উসকে দেয় যখন এ সনদকে বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। তাতে সনদটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বলে ব্যাপকভাবে চিহ্নিত হয়।
এই বিতর্ক লুফে নিতে একটুও সময় নেয়নি ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। তারা দাবি করে, তাঁকে (মোদি) যেকোনো পুরস্কার দিলেই তিনি ছুটে যান।
তারা এত তাড়াহুড়া করছিল যে, (পুরস্কারের সনদে) সেশেলস প্রজাতন্ত্রের অফিশিয়াল নামটি পর্যন্ত ভুল লিখেছে।—সুপ্রিয়া শ্রীনেত, কংগ্রেসের রাজনীতিক
কংগ্রেসের রাজনীতিক সুপ্রিয়া শ্রীনেত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ‘তারা এত তাড়াহুড়া করছিল যে, সেশেলস প্রজাতন্ত্রের অফিশিয়াল নামটি পর্যন্ত ভুল লিখেছে।’
মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অবশ্য এ সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছে। দলটি বলেছে, তাঁর পরিবেশবান্ধব নেতৃত্বের জন্য এ পুরস্কার পাওয়া ‘ভারতের জন্য একটি গর্বের মুহূর্ত’।
গত মাসে মোদির ইসরায়েল সফরের মাত্র কয়েক দিন আগে দেশটির পার্লামেন্ট তাড়াহুড়া করে তাদের দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মাননা হিসেবে ‘মেডেল অব দ্য নেসেট’ নামের একটি পদক তৈরি করে। মোদি দেশটিতে পৌঁছানোর পর তাঁর হাতে এটি তুলে দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত তিনিই এ পদকের একমাত্র গ্রহীতা।
গতকাল বৃহস্পতিবার সেশেলসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিতর্কের জবাবে একটি বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে তারা দাবি করে, ভুলবশত একটি ‘খসড়া সংস্করণ’ ছড়িয়ে পড়েছিল। এখন একটি ‘খাঁটি ও যথাযথভাবে অনুমোদিত’ সনদ ইস্যু করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, ‘গার্ডিয়ান অব দ্য ব্লু হরাইজন’ সম্মাননাটি সম্পূর্ণ আসল বা প্রকৃত।
সমালোচকেরা অবশ্য মনে করিয়ে দিয়েছেন, মোদি তাঁর ১২ বছরের শাসনকালজুড়ে দেশে ও বিদেশে পুরস্কার পাওয়ার প্রতি একটি বিশেষ দুর্বলতা বা ঝোঁক দেখিয়েছেন।
গত মাসে মোদির ইসরায়েল সফরের মাত্র কয়েক দিন আগে দেশটির পার্লামেন্ট তাড়াহুড়া করে তাদের দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মাননা হিসেবে ‘মেডেল অব দ্য নেসেট’ নামের একটি পদক তৈরি করে। মোদি দেশটিতে পৌঁছানোর পর তাঁর হাতে এটি তুলে দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত তিনিই এ পদকের একমাত্র গ্রহীতা।
সন্দেহ বা প্রশ্ন জাগায় এমন পরিস্থিতিতে দেওয়া এসব পুরস্কার সংগ্রহের পেছনের উদ্দেশ্য হলো, তাঁর সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদের কাছে এ বার্তা পৌঁছানো যে মোদির মহানুভবতার কারণে সারা বিশ্বে তিনি সম্মানিত হচ্ছেন এবং ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব আসলে মোদির ব্যক্তিত্বেরই অবদান।—নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়, মোদির জীবনীকার ও লেখক
২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদি ভারতের ‘ফিলিপ কোটলার প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাওয়ার্ড’–এরও প্রথম গ্রহীতা হন। দেশের প্রতি তাঁর ‘অসামান্য নেতৃত্বের’ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল।
সরকারের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, এ সম্মাননা প্রতিবছর কোনো না কোনো দেশের নেতাকে দেওয়া হবে। তবে এরপর আর কোনো দেশের নেতাকে পুরস্কারটি দেওয়া হয়নি এবং এর ওয়েবসাইটও এখন নিষ্ক্রিয় পড়ে রয়েছে।
ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্বীকার করেন যে, মোদির বিদেশ সফরের সময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও পুরস্কার পাওয়াটা এখন একটি অলিখিত প্রত্যাশায় পরিণত হয়েছে। নরেন্দ্র মোদির জীবনীকার ও লেখক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলেন, বিশ্বজুড়ে পুরস্কার পাওয়ার এই মরিয়া চেষ্টা আসলে প্রধানমন্ত্রীর ‘ব্যক্তিত্ব–কেন্দ্রিক রাজনীতি’ বা আত্মপ্রচারের একটি লক্ষণ।
নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘সন্দেহ বা প্রশ্ন জাগায় এমন পরিস্থিতিতে দেওয়া এসব পুরস্কার সংগ্রহের পেছনের উদ্দেশ্য হলো, তাঁর সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদের কাছে এ বার্তা পৌঁছানো যে মোদির মহানুভবতার কারণে সারা বিশ্বে তিনি সম্মানিত হচ্ছেন এবং ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব আসলে মোদির ব্যক্তিত্বেরই অবদান।’
গত এক বছরে নরেন্দ্র মোদি প্রথম কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ইথিওপিয়ার ‘গ্রেট অনার নিশান’ ও ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর ‘অর্ডার অব দ্য রিপাবলিক’ সম্মাননাও পেয়েছেন।
তবে বিজেপির দাবি, এসব পুরস্কার নরেন্দ্র মোদির আন্তর্জাতিক স্তরের সুউচ্চ মর্যাদারই একটি বড় স্বীকৃতি।