
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসে বড় ধরনের ভাঙন ধরেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় দলটির ২৮ সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০ জনই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন। রোববার দিল্লিতে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে লোকসভায় আলাদা বসার (পৃথক আসন) আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা।
বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। রোববার বিকেলে দিল্লিতে তিনি জানান, ইতিমধ্যে ২০ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন তাঁরা পেয়েছেন। সোমবারের মধ্যে আরও দুজন সংসদ সদস্য তাঁদের সঙ্গে যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
স্পিকারের বাসভবনে যাওয়ার আগে রোববার এই বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের দিল্লির বাসভবনে একটি বৈঠক করেন। এই সংসদ সদস্যরা জানিয়েছেন, তাঁরা বিজেপিতে যোগ দেবেন না, তবে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (এনডিএ) বিভিন্ন কর্মসূচিতে সমর্থন দিয়ে যাবেন।
তৃণমূলের বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের মধ্যে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, মালা রায়, শতাব্দী রায়, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেব (চলচ্চিত্র অভিনেতা), ইউসুফ পাঠান, সায়নী ঘোষ, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, শর্মিলা সরকার প্রমুখ রয়েছেন।
এদিকে বিদ্রোহীরা স্পিকারের কাছে যাওয়ার আগেই তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি চিঠি নিয়ে স্পিকারের কাছে যান তৃণমূল সংসদ সদস্য সাগরিকা ঘোষ ও কীর্তি আজাদ। চিঠিতে বিচ্ছিন্ন কোনো গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি না দেওয়ার এবং তৃণমূলকে লোকসভায় একটি দল হিসেবে রাখার দাবি জানানো হয়।
এবারের পশ্চিম বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল মাত্র ৮০টি আসন পেয়ে চরম পরাজয় বরণ করে। এরপরই মূলত দলের চেয়ারপারসন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বাঁধে। বিধানসভায় তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬৫ জনই এখন বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষে বলে দাবি করা হচ্ছে।
বিদ্রোহের সূত্রপাত মূলত বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচন ঘিরে। নির্বাচনের পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করে স্পিকারের কাছে একটি চিঠি পাঠান। ওই চিঠিতে তৃণমূলের ৭০ জন বিধায়কের স্বাক্ষর ছিল। কিন্তু বিদ্রোহী বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা অভিযোগ করেন, শোভনদেবকে নেতা বানাতে চিঠিতে অনেক বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে।
স্পিকারের কাছে এই অভিযোগ যাওয়ার পর রাজ্য সরকারের নির্দেশে স্বাক্ষর জালের অভিযোগে মামলা দায়ের হয় এবং সিআইডি তদন্ত শুরু করে। এই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিআইডি গত বৃহস্পতিবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তলব করেছিল। সে সময় বিধায়কদের স্বাক্ষরসংক্রান্ত বৈঠকের রেজোল্যুশনের কাগজপত্র দেখতে চায় সিআইডি। কিন্তু তা দিতে না পারায় কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি সন্তোষজনক মনে হয়নি।
এর জেরে রোববার দুপুর ১২টায় অভিষেককে আবারও ভবানী ভবনে তলব করে সিআইডি। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই তিনি সেখানে পৌঁছান। রেজোল্যুশনের নথিপত্র না পাওয়ায় তাঁকে টানা সাত ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করেন কর্মকর্তারা।
একই মামলায় তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষকেও রোববার সাড়ে তিন ঘণ্টা জেরা করার পর সন্ধ্যা সাতটার দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। দুজনকে মুখোমুখি বসিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিষেককে ছাড়েনি সিআইডি।
তৃণমূলে এই নজিরবিহীন বিদ্রোহের পর রোববার বিজেপি নেতা সুকান্ত মজুমদার বলেন, ‘তৃণমূল ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। দলে এখন মমতা আর অভিষেক ছাড়া কেউ থাকবেন না।’