ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

বিধানসভা নির্বাচনের আগে কেরালার নাম বদল করল মোদি সরকার, নতুন নাম ‘কেরলম’

বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভারতের দক্ষিণী রাজ্য কেরালার নাম বদলানোর অনুমোদন দিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। কেরালা এবার থেকে পরিচিত হবে ‘কেরলম’ নামে।

গতকাল মঙ্গলবার ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে কেরালার নাম বদলের সিদ্ধান্তে অনুমোদন দেওয়া হয়। নাম বদলানোর জন্য কেরালার বিধানসভায় ২০২৩–২৪ সালে দুবার প্রস্তাব পাস করানো হয়েছিল। অবশেষে বিধানসভা নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় সরকার সেই প্রস্তাবে সায় দিল।

কেরালা রাজ্য বিধানসভার ভোট এই বছরের এপ্রিল-মে মাসে।

গতকাল ওই সিদ্ধান্তের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘এক্স’ হ্যান্ডলে লেখেন, কেরালার নাম পরিবর্তন নিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে ওই রাজ্যের জনগণেরই ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে।

কেরালায় সিপিএম নেতৃত্বাধীন বাম ফ্রন্ট সরকারে রয়েছে। গত লোকসভা ভোটে ওই রাজ্যে বিজেপি ত্রিশুর আসনটি জিতেছিল। যদিও আগে জেতা তিরুবনন্তপুরম আসনটিতে তাদের প্রার্থী সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজীব চন্দ্রশেখর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর কংগ্রেসের শশী থারুরের কাছে হেরে যান।

রাজনৈতিক মহলের ধারণা, আগামী বিধানসভার ভোটে ভালো ফলের আশায় বিজেপি রাজ্যের নাম বদলের প্রস্তাব মেনে নিয়েছে। বাম ফ্রন্ট ও কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউডিএফের মোকাবিলায় তৃতীয় শক্তি হিসেবে বিজেপি ওই রাজ্যে দ্রুত প্রভাব বিস্তার করছে।

দাক্ষিণাত্যে প্রভাব বিস্তারে বিজেপি অনেক দিন ধরেই সক্রিয়। যদিও কর্নাটকে শাসন ক্ষমতায় থেকেও তারা তা ধরে রাখতে পারেনি। কংগ্রেসের কাছে তারা হেরে যায়। তামিলনাড়ু ও কেরালায় তারা কখনো ক্ষমতায় আসতে পারেনি।

তেলেঙ্গানায় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গত বিধানসভা নির্বাচনে তারা কংগ্রেসের কাছে হেরে যায়। শুধু অন্ধ্র প্রদেশে তারা ক্ষমতা ভোগ করছে টিডিপির সঙ্গে জোট বেঁধে। বিজেপি মনে করছে ক্ষমতায় না এলেও কেরালায় তারা সিপিএম ও কংগ্রেসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পায়ের তলার জমি শক্ত করবে। রাজ্যের নাম বদলের সিদ্ধান্তে সায় দেওয়া সেই লক্ষ্যেই।

সেই রাজ্যের পিনারাই বিজয়ন সরকারের যুক্তি ছিল মালয়ালম ভাষায় রাজ্যের নাম ‘কেরলম’-ই। তাঁদের পাঠানো প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, সংবিধানের অষ্টম তফসিলেও ‘কেরালা’ বদলে ‘কেরলম’ রাখা হোক।

কেরালার মতোই বিজেপির নজর অনেক দিন ধরে তামিলনাড়ুতেও রয়েছে, যদিও সেখানে তারা সুবিধা করতে পারেনি। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে ওই রাজ্যের মানুষের মন জিততে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারবার সেখানে গিয়েছেন। বিভিন্ন প্রকল্প মঞ্জুর করেছেন। এমনকি ২০২৩ সালের ২৮ মে দেশের নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনের সময় সোনায় মোড়া ঐতিহাসিক রাজদণ্ড ‘সেঙ্গল’ ওই রাজ্য থেকে এনে লোকসভায় স্পিকারের আসনের পাশে বসিয়েছেন।

ব্রিটিশদের কাছ থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক হিসেবে রাজদণ্ডটি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। দাক্ষিণাত্যে চোল সাম্রাজ্যের সময় থেকেই ‘সেঙ্গল’ ন্যায়বিচার ও সুশাসনের প্রতীক।

কিন্তু তা সত্ত্বেও তামিলনাড়ুর জনতা বিজেপির প্রতি সদয় হয়নি। লোকসভা ভোটে রাজ্যের ৩৯টি আসনই ডিএমকে নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়া’ জোট দখল করেছিল। তার মধ্যে কংগ্রেস জিতেছিল ৯টি আসন।

বিজেপি কিন্তু চেষ্টা ছাড়েনি। সংসদে ‘সেঙ্গল’ স্থাপন আশানুরূপ ফল না দিলেও এবার তামিল মন জিততে মোদি সরকার রাষ্ট্রপতি ভবনে স্থাপন করেছে ভারতের প্রথম ও একমাত্র ভারতীয় গভর্নর জেনারেল চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারির আবক্ষ মূর্তি। সেটাও স্থাপিত হলো যাঁর মূর্তি সরিয়ে, তিনি নয়াদিল্লির মূল স্থপতিই শুধু নন, রাষ্ট্রপতি ভবনও তাঁরই তৈরি।

ব্রিটিশ সেই স্থপতির নাম এডউইন লুটিয়েন্স। গত সোমবার লুটিয়েন্সের মূর্তি সরিয়ে রাজাগোপালাচারির মূর্তি স্থাপন করেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু।

এই উদ্যোগকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘ঔপনিবেশিক মানসিকতা’ থেকে বেরিয়ে আসারই অঙ্গ বলে অভিহিত করেছেন। যদিও রাজনৈতিক মহলে তা বিবেচিত হচ্ছে তামিলনাড়ু বিধানসভা ভোট জেতার তাগিদ হিসেবে।

ঔপনিবেশিকতা ঝেড়ে ফেলতে রাষ্ট্রপতি ভবনের ‘মোগল উদ্যান’–এর নাম বদলে করা হয় ‘অমৃত উদ্যান’। রাজপথের নাম বদলে রাখা হয় ‘কর্তব্য পথ’। নতুন সংসদ ভবনের সর্বত্র ইংরেজির জায়গায় সংস্কৃতের প্রাধান্য। প্রতিটি কেন্দ্রীয় আইনের নাম রাখা হচ্ছে সংস্কৃতে।

যেমন ভারতীয় দণ্ডবিধি পরিবর্তনের পর নতুন নাম ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’। প্রধানমন্ত্রী তাঁর নতুন কার্যালয়ের নাম দিয়েছেন ‘সেবা তীর্থ’।

কেরালা ‘কেরলম’ হওয়ায় সরব হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেরালাবাসীদের অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি কেন্দ্রের ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, সিপিএমের সঙ্গে বিজেপির আঁতাত রয়েছে বলেই এটা হলো। অসন্তোষ প্রকাশ করে মমতা বলেন, পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ রাখার আর্জি কেন্দ্রের কাছে ২০১৮ সাল থেকে পড়ে রয়েছে। অথচ আজও সরকার তা খারিজ করেনি, সম্মতিও জানায়নি।

রাজ্যের নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’ থেকে কেন ‘বাংলা’ রাখার প্রস্তাব বিধানসভা গ্রহণ করেছে, তার যুক্তি দেখিয়ে মমতা বলেন, ইংরেজি বর্ণমালা অনুযায়ী ‘ডবলিউ’ সবার শেষে আসে। মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠকে গেলে বলার জন্য তাঁকে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। নাম ‘বাংলা’ হলে ইংরেজি বর্ণমালা অনুযায়ী ‘বি’ শুরুতেই আসবে। নাম বদলের প্রস্তাব পাঠানোর এটা একটা বড় কারণ। অথচ মোদি সরকার নিরুত্তর।

মমতার অভিযোগ, এই নাম বদলের ফলে বোঝা গেল, কেরালায় সিপিএমের সঙ্গে বিজেপির জোট আর অলিখিত নয়। এটা এখন লিখিত জোট।

কংগ্রেস নেতা ও তিরুবনন্তপুরমের লোকসভা সদস্য শশী থারুর অবশ্য ‘কেরলম’ নিয়ে খোঁচা দিতে ছাড়েননি। ‘এক্স’ হ্যান্ডলে তিনি জানতে চেয়েছেন, কেরলমের বাসিন্দাদের কাছে ‘কেরালাইট’ ও ‘কেরালান’ শব্দ দুটির হাল এখন কী হবে? ‘কেরালামাইট’ শব্দটি কেমন জীবাণুর মতো শোনায়, আর, ‘কেরালামিয়ান’ যেন বিরল খনিজ পদার্থ।