
এখনই রাজনৈতিক দল গঠন না করে রাজ্যে রাজ্যে সংগঠন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের কথা শুনবেন ‘তেলাপোকারা’। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা দুদিন ধরে নিজেদের মধ্যে আলোচনার পর এই রণনীতি তৈরি করেছেন। আগামী মাস থেকে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে তাঁরা জনগণের কথা শুনবেন। মানুষের মন জানবেন। বুঝবেন। সেই কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে, ‘কেয়া বোলতি পাবলিক’, অর্থাৎ মানুষ কী বলছে।
সিজেপির রাষ্ট্রীয় আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে দুদিনের বৈঠক শেষে এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে জানিয়েছেন, মানুষের সমস্যা কী কী—তা জানাই এই কর্মসূচির লক্ষ্য। সেসব জানা ও প্রতিকারের চেষ্টায় তাঁরা নিজেদের তৈরি করবেন। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, শিক্ষার সংস্কারই তাঁদের মূল লক্ষ্য। কারণ, শিক্ষা ক্রমেই মহার্ঘ হয়ে উঠেছে। ধনীদের কাছে সহজলভ্য, সাধারণের নাগালের বাইরে।
সিজেপির কোর কমিটির ওই বৈঠকে ঠিক হয়েছে, এখনই রাজনৈতিক দল গঠনের পথে তাঁরা হাঁটবেন না। দলের অন্যতম নেতা সৌরভ দাস বলেন, ‘অনেকেই চাইছেন সিজেপি একটা রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করুক। কিন্তু আমরা ওই পথে হাঁটতে চাইছি না। দেশে রাজনৈতিক দলের অভাব নেই। কীভাবে ইডি, সিবিআই, আয়কর বিভাগকে লেলিয়ে রাজনৈতিক দল ভাঙা হচ্ছে সবার জানা।’
সৌরভ দাস বলেন, সিজেপি ওই পথে হাঁটতে চায় না। কারণ, আরেক রাজনৈতিক দল গড়ে কোনো লাভ হবে না। তাই ওপথে না গিয়ে সিজেপি তৃণমূল স্তরে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজ্যে রাজ্যে ঘুরে জনতা কী বলছে, তরুণ প্রজন্ম কী ভাবছে, তা বুঝে সেই অনুযায়ী সিজেপি কাজ করবে। সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজবে।
কেন রাজনৈতিক দল গড়ার পথে তাঁরা এগোতে চাইছেন না, তা বিশদে ব্যাখ্যা করেন অভিজিৎ। তিনি বলেন, আপাতত প্রেশার গ্রুপ হিসেবেই তাঁরা থাকতে চান। ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা তাঁদের সাফল্য। মানুষের মন থেকে ভয় তাঁরা অনেকটাই দূর করতে পেরেছেন। তাঁদের কথা শুনতে সরকার বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁদের লক্ষ্য সংবিধানের আদর্শ, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়প্রতিষ্ঠা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে অভিজিৎ নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও বিচারব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন। বলেন, ইসির প্রতি মানুষের ভরসা নেই। সকালে মানুষ ভোট দিয়ে যাঁকে জেতাল, সন্ধ্যায় দেখা গেল তিনি অন্য দলে চলে গেলেন। এক দলকে মানুষ ভোট দিয়ে জেতাচ্ছে, অথচ সরকার গড়ছে অন্য দল। দল ভাঙতে দেদার ব্যবহার করা হচ্ছে ইডি–সিবিআইকে।
অভিজিৎ বলেন, কোথায় ভোটার ঠিক করবে, কে সরকার গড়বে—তা না। এখন সরকার ঠিক করছে কে ভোট দেবে। ইসির প্রতি যেমন বিন্দুমাত্র ভরসা নেই, তেমনই সাধারণ মানুষ সুবিচারও পান না। বিচারের তারিখ পেতে জীবন কেটে যায়। অথচ প্রভাবশালীদের অপেক্ষা করতে হয় না। দেখা যায়, মধ্যরাত্রেও শুনানি হচ্ছে।
সিজেপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বলেন, যন্তর মন্তরের আন্দোলন চলাকালে তাঁরা দেখেছেন, মানুষ এসব নিয়ে ক্ষুব্ধ। তাঁরা প্রতিকার চান। সেই লক্ষ্যে আরও বিশদে মানুষের মন জানা জরুরি। তাই ‘কেয়া বোলতি পাবলিক’ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
দুদিনের বৈঠকে সিজেপি তাদের সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করেছে। তারা জাতীয় ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করেছে ১১ সদস্যের। কমিটির সর্বভারতীয় আহ্বায়ক অভিজিৎ দীপকে। সহ–আহ্বায়ক করা হয়েছে দুই মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে। লক্ষণীয়, ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের প্রত্যেকের বয়স ২৬ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
কারণ হিসেবে সিজেপি নেতারা জানিয়েছেন, দেশের ৬৫ শতাংশ মানুষ এই বয়সের। দেশকে চারটি ভাগে ভাগ করে একেক ভাগের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নেতারা সেখানে সংগঠন তৈরিতে সচেষ্ট হবেন। সদস্য সংগ্রহ অভিযান চালানো হবে। সে জন্য ওয়েবসাইট তৈরি হয়েছে।
সিজেপির নেতারা বলছেন, তহবিল গড়ার লক্ষ্যে কারও কাছ থেকে এখন অর্থ নেওয়া হচ্ছে না। স্বচ্ছতার স্বার্থে সে কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ বা ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ করা হবে।
কোনো সন্দেহ নেই বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকার তেলাপোকাদের গুরুত্ব দিচ্ছে। নতুন প্রজন্ম বা ‘জেন–জি’ প্রজন্মকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলেই শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবি মেনে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রায় নিয়ম করে বিভিন্ন বিষয় ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করছেন। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে জুড়তে চাইছেন। সে জন্য দলীয় কর্মসূচিও গৃহীত হচ্ছে।
এ অবস্থায় নড়েচড়ে বসেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘও (আরএসএস)। বিজেপির একাংশ যখন জেন–জিকে ‘দেশবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে দমন–পীড়নের পক্ষে, আরএসএস–প্রধান মোহন ভাগবত তখন বলেছেন, কেউ আন্দোলন করছেন বলেই দেশদ্রোহী নন। তরুণ প্রজন্ম কোনো বিষয়ে প্রতিবাদী হলে তার নিরসন করা প্রয়োজন।
হিন্দুত্ববাদী আরএসএস প্রধান বলেন, ‘জেন–জিরা আমাদেরই লোক। আমাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম। তাঁদের ভাষা আমাদের বুঝতে হবে।’
মোহন ভাগবত বৃহস্পতিবার মুম্বাইয়ে এক অনুষ্ঠানে এক শ শহরের দুই হাজার স্কুল পড়ুয়ার মুখোমুখি হয়েছিলেন। নিজের সময়ের সঙ্গে তুলনা করে তিনি সেখানে বলেন, ‘আমাদের সময়ে বড়রা যা বলতেন, আমরা তা মেনে নিতাম। আজকের জেন–জি প্রশ্ন করে। তারা যুক্তি খোঁজে। বিনা তর্কে সব কিছু মেনে নেয় না। এর অর্থ এই নয়, কোনো বিষয়ে আন্দোলন করার অর্থ তারা দেশদ্রোহী। এদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন জরুরি।’
আরএসএস প্রধান বলেন, ‘আজকের জেন–জি বা জেন আলফা আমাদের তুলনায় অনেক বেশি সৎ। দেশভক্তি ও দেশসেবার মনোভাব তাদের আছে। আমি চোখ বন্ধ করে এদের ভরসা করতে পারি।’
যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থী আন্দোলনের মোকাবিলায় দিল্লি পুলিশের ‘অত্যাচার’, লাঠিপেটা, পেলেট গান ব্যবহার সংক্রান্ত বিষয় অবশ্য আরএসএস প্রধান সন্তর্পণে এড়িয়ে গেছেন। বলেছেন, ‘সেদিন ঠিক কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে, কীভাবে ঘটেছে, কী ঠিক, কী–ই বা ভুল, আমার জানা নেই।’
অথচ এই প্রশ্নেই বিরোধীরা এখনো অনড়। সংসদ অচল। শিক্ষার্থীদের মতো বিরোধীদেরও দাবি, পুলিশি অত্যাচারের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায় নিয়ে সংসদে বিবৃতি দিতে হবে। ওই দাবির কারণেই মোহন ভাগবত পুলিশি অত্যাচারের প্রসঙ্গ সন্তর্পণে এড়িয়ে যান।
সংসদ কীভাবে সচল হবে, সেই সমাধানের পথ সরকারপক্ষ এখনো খুঁজে পায়নি। সংসদীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু লোকসভার বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেখা করলেও বিরোধীরা দাবি থেকে সরতে চায়নি।