অমিত শাহ ও রাহুল গান্ধী
অমিত শাহ ও রাহুল গান্ধী

বিরোধী আন্দোলনে দিশাহারা অমিত শাহ গেলেন পুলিশ সদর দপ্তরে

চার বছর পর দিল্লি পুলিশের সদর দপ্তরে গিয়ে তিন ঘণ্টা ধরে মিটিং করে কী বোঝালেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ? এটাই কি যে জ্ঞানেশ কুমার ও এসআইআরবিরোধী লাগাতার আন্দোলনে কেন্দ্রীয় সরকার, দিল্লি পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন ভীত? বিরোধীদের এই নতুন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা তাদের কাছে প্রকৃত পরীক্ষা?

গতকাল শনিবার অমিত শাহ যখন কনট প্লেসের কাছে জয় সিং মার্গে দিল্লি পুলিশের সদর দপ্তরে বৈঠক করতে যান, তখনো বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ তাদের ৩০ অক্টোবরের ‘জনতার ইমপিচমেন্ট’ কর্মসূচির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। যদিও এটা জানা ছিল, ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানের জনসভা তারা করছে। সেখানে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হবে, পুলিশি গোয়েন্দাদের এই অনুমানের কথাও জানা ছিল। কীভাবে তার মোকাবিলা করা হবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা যাবে, সমাবেশের জেরে আশপাশের জনজীবন যাতে স্তব্ধ না হয়, তা নিশ্চিত করা যাবে, ব্যারিকেড না লাগিয়ে যান চলাচল চালু রাখা এবং সন্দেহভাজন দুষ্কৃতকারীদের আগে থেকে আটক করা হবে কি না—এসব আলোচনা করাই ছিল ওই বৈঠকের উদ্দেশ্য। কিন্তু যা নিছকই পুলিশের দায়, সেখানে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতি কী বোঝায়? শুধু অমিত শাহই নন, শনিবারের ওই বৈঠকে বিজেপিশাসিত দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তও হাজির ছিলেন। অতীতে যা কখনো দেখা যায়নি। এই তৎপরতা কী বোঝায়, সেটাই ছিল শনিবারের সন্ধ্যার রাজনৈতিক আলোচ্য বিষয়। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘জেন–জি’ ও বিরোধীদের আন্দোলন এবং ইন্ডিয়া জোটের রামলীলা ময়দানের প্রস্তাবিত জনসভা কেন্দ্রীয় সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভের সময় আটক করা হচ্ছে আন্দোলনকারীদের। নয়াদিল্লি, ১০ অক্টোবর ২০২৬

শেষবার অমিত শাহ পুলিশ সদর দপ্তরে গিয়েছিলেন ২০২২ সালের আগস্ট মাসে জি–২০ সম্মেলন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে। আর এরপর গেলেন গতকাল শনিবার।

শুধু সরকারই নয়, রামলীলা ময়দানের জনসভা বিজেপিকেও বিচলিত করে তুলেছে। তারাও জোর কদমে নেমেছে ওই জনসভার বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে। তা করতে গিয়ে বিজেপি নেতৃত্ব চারটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছে।

প্রথমত, বিজেপি বলছে, উৎসবের মৌসুমে এমন আন্দোলন করে জনজীবন ব্যাহত করার কোনো অধিকারই বিরোধীদের নেই। এই যুক্তি জাহিরের সময় তারা দিল্লির ব্যবসায়ীদের এক সংগঠনের আবেদনকে হাতিয়ার করেছে। গত শনিবার দিল্লির ব্যবসায়ীদের এক সংগঠন ‘চেম্বার অব ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ (সিটিআই) কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে এক চিঠি লেখে। সেই চিঠিতে সিটিআইয়ের চেয়ারম্যান ব্রিজেশ গোয়েলের আবেদন—১ নভেম্বরের আন্দোলন কর্মসূচি যেন বাতিল করা হয়। ১০ নভেম্বরের পর বিরোধীরা যেন আন্দোলন কর্মসূচিগুলো গ্রহণ করেন। গোয়েলদের আরজি, দিল্লিতে এখন উৎসবের মৌসুম চলছে। এটা বিপুলভাবে কেনাবেচার সময়। দুর্গাপূজা ও দশেরার কেনাকাটা খুব বাজেভাবে ব্যাহত হয়েছে। ৬ নভেম্বর ধনতেরাস। দুই দিন পর ৮ নভেম্বর দীপাবলি। ১০ নভেম্বর ভাইফোঁটা। আন্দোলনের ফলে এই তিন উৎসবের কেনাকাটার ওপরেও কোপ পড়বে। রামলীলা ময়দানের পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে যেসব পাইকারি ও খুচরা বাজার রয়েছে, আন্দোলনের জন্য তাদের মালিকেরা উদ্বিগ্ন। গোয়েলের দাবি, সেপ্টেম্বর মাসের আন্দোলনে ফলে ইতিমধ্যেই ৩ হাজার কোটি রুপির ব্যবসা জলে গেছে। রামলীলা ময়দানে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলে ক্ষতির পরিমাণ ১০ হাজার কোটিতে দাঁড়াবে।

সিটিআইয়ের চিঠি রাহুল গান্ধীর হাতে পৌঁছনোর আগেই বিজেপির মুখপাত্র রবিশংকর প্রসাদ বিরোধীদের সমালোচনা করে আন্দোলন বন্ধের দাবি জানান। যে যে কারণে কংগ্রেসসহ বিরোধীদের ‘অবিবেচক’ বলে তিনি আখ্যায়িত করেন, তার একটি হলো সিটিআইয়ের চেয়ারম্যানের লেখা ওই চিঠি। রবিশংকর বলেন, উৎসব মৌসুমে এভাবে আন্দোলন চালানো জনবিরোধী। ব্যবসায়ীদের জন্য বিরোধীরা বিন্দুমাত্র চিন্তিত নন। এভাবে ব্যবসায়ী সমাজ এবং ব্যবসার সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ মানুষের রুজি–রোজগার ছিনিয়ে নেওয়ার কোনো অধিকার বিরোধীদের নেই। রাহুল গান্ধীর সমালোচনা করে রবিশংকর বলেন, জনগণের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বলেই জনতার ভালোমন্দ নিয়ে রাহুল ভাবিত নন। তাঁর ‘এলিটিস্ট’ মনোভাবই বুঝিয়ে দেয় জনগণের ভালোমন্দ নিয়ে তিনি কতটা উদাসীন।

দ্বিতীয়ত, বিজেপি ১ নভেম্বর দিনটিকে হাতিয়ার করতে চেয়েছে কংগ্রেসকে বিদ্ধ করতে। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর দিন ১ নভেম্বর সারা দিল্লিতে শিখদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা শুরু হয়। রবিশংকর প্রসাদ বলেন, ১ নভেম্বর দিনটি শিখদের কাছে শোক দিবস। হাজার হাজার শিখ সেদিন নিহত হয়েছিলেন। সেই ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে বিক্ষোভ সমাবেশ ডেকে কংগ্রেস ও বিরোধীরা শিখ মানসিকতায় গুরুতর আঘাত হানতে চাইছে। শিখ–সমাজ এ জন্য তাদের ক্ষমা করবে না।

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদ ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে মুম্বাইয়ের দাদার এলাকার ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ পার্কে বিক্ষোভ করে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। ২ অক্টোবর ২০২৬

তৃতীয়ত, বিজেপি বলতে শুরু করেছে, রামলীলা ময়দানের কর্মসূচি প্রমাণ করে দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি বিরোধীদের বিন্দুমাত্র ভরসা নেই। রবিশংকর প্রসাদ বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম ও এসআইআর প্রক্রিয়া সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। সেই বিচার শেষ হওয়ার আগে আন্দোলন কর্মসূচি গ্রহণের মধ্য দিয়ে কংগ্রেসসহ বিরোধীরা বুঝিয়ে দিচ্ছে বিচারব্যবস্থার প্রতি তাদের কোনো আস্থা নেই। ভরসাও নেই।

চতুর্থত, যে কথা বিজেপি নেতারা ইদানীং জোরের সঙ্গে বলছেন, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আরএসএস–প্রধান বারবার যেভাবে সাম্প্রতিক আন্দোলনকে চিহ্নিত করছেন, রবিশংকর প্রসাদও সে কথাই নতুনভাবে জানিয়ে বলেছেন, আন্দোলনের নামে বিরোধীরা সারা দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চাইছে। বিদেশি মদদে দেশের ক্ষতি করতে চাইছে। এরা দেশদ্রোহী।

চেনা ছকের এই আক্রমণ অবশ্য বিরোধীদের দমাতে ব্যর্থ। রামলীলা ময়দানের সমাবেশের আয়োজন থেকে পেছানোর কোনো কারণই তারা দেখছে না। কেননা ওই সমাবেশ এক দিনের। ওটা লাগাতার আন্দোলনের সূচনা নয়। বরং ১ নভেম্বরের সমাবেশের দুই দিন আগের নতুন কর্মসূচির কথাও গত শনিবার রাতে ঘোষিত হয়েছে। কংগ্রেস নেতা কে সি বেণুগোপাল শনিবার রাতে ‘এক্স’ হ্যান্ডলে সেই কর্মসূচির কথা জানিয়ে বলেন, ৩০ অক্টোবর নয়াদিল্লির অশোক হোটেলের প্রশস্ত লনে জনতার দরবারে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ইমপিচ’ করা হবে। বেণুগোপাল জানিয়েছেন, ওই গণ–ইমপিচমেন্টের এক দিন পর ১ নভেম্বর হবে ভোট চুরির বিরুদ্ধে ‘দিল্লি চলো অভিযান’। সেই অভিযান শেষ হবে পুরোনো দিল্লির রামলীলা ময়দানে। যন্তর মন্তরের বদলে যে তিনটি জায়গাকে দিল্লি পুলিশ আন্দোলনের জন্য চিহ্নিত করেছে, রামলীলা ময়দান তার অন্যতম। বেণুগোপাল জানিয়েছেন, রামলীলা ময়দানে ওই দিন ১০ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটবে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ইন্ডিয়া জোটের শরিক নেতাদের অনুরোধ করেছেন ওই জনসভায় উপস্থিত থাকতে।

বিরোধী নেতারা জ্ঞানেশ কুমারের ‘গণ–ইমপিচমেন্ট’ অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলেন ২৮ অক্টোবর, দিল্লির তালকাটোরা স্টেডিয়ামে। কিন্তু সেই দিন ওই স্টেডিয়াম পাওয়া যায়নি। ফলে ঠিক হয়েছে, অশোকা হোটেলের প্রশস্ত লনে গড়ে তোলা হবে প্রতীকী সংসদ। সিপিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা জানিয়েছেন, গণ–ইমপিচমেন্ট অনুষ্ঠানে বিচারপতি, আইনজীবী, ছাত্র, যুব, নাগরিক সমাজসহ সর্বস্তরের ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্যকে সরাতে হলে তাঁদের ‘ইমপিচ’ বা অভিশংসন করতে হয়। জ্ঞানেশ কুমারের অভিশংসনের প্রথম নোটিশ লোকসভা ও রাজ্যসভার অধ্যক্ষরা খারিজ করে দেন। দ্বিতীয় নোটিশটি এখনো রাজ্যসভার অধ্যক্ষের বিবেচনাধীন। বিরোধীরা তবু তৃতীয়বারের জন্য নোটিশ দেওয়ার কথা ভাবছেন। সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শুরু হলে সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ইন্ডিয়া জোটের তরফে জ্ঞানেশ কুমারের প্রতীকী বিচার বা গণ–ইমপিচমেন্ট অনুষ্ঠানের সমালোচনা করে বিজেপি মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বলেছেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করার এক চক্রান্ত চলছে। নির্বাচনে ব্যর্থ ইন্ডিয়া জোট ও রাহুল গান্ধী মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও মিথ্যা প্রচার ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছেন।