
ভারতের অরুণাচল প্রদেশের চীন সীমান্তে অস্থিরতা আছে, এই প্রথম তা স্বীকার করেছে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার। গতকাল শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছেন, ভারত ও চীন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান এবং যেকোনো ভুল-বোঝাবুঝি এড়াতে কূটনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে।
জয়সোয়াল উল্লেখ করেছেন, ভারত-চীন সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি ‘চীনের বাহিনী নির্ধারিত টহল ব্যবস্থা বা প্যাটার্ন থেকে সরে আসলে সময়ে সময়ে পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠে।’
তবে শুক্রবার রাত পর্যন্ত এই বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো বক্তব্য জানা যায়নি।
চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘সীমান্তের উন্নত ব্যবস্থাপনার জন্য উভয় পক্ষই উপযুক্ত এলাকাগুলোতে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসসি) সম্পর্কিত পারস্পরিক ধারণা ও বোঝাপড়া বৃদ্ধি করতে আলোচনা করতে সম্মত হয়েছে। আমি এটিও জোর দিয়ে বলতে চাই, সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।’
ভারতের আধা সামরিক বাহিনী ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) মহাপরিচালক শত্রুজিৎ সিং কাপুরের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্য এসেছে। শত্রুজিৎ কাপুর গত বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে বলেন, আইটিবিপির সদ্য গঠিত ‘শৌর্য কমান্ডো ইউনিট’ অরুণাচল প্রদেশের একাধিক স্থানে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষের সময় নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
কাপুরের বক্তব্য নিয়ে ভারতে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, তিনি এও বলেছেন, আইটিবিপির হাতে সীমান্ত সুরক্ষার জন্য যে সব অস্ত্র রয়েছে, তা পুরোনো। ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস তাঁর এই বক্তব্যের পর কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা শুরু করেছে।
তবে চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ অব্যাহত থাকলেও দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেশ ভালোভাবেই বাড়ছে। সাংহাইভিত্তিক ভারতীয় কনস্যুলেট জেনারেলের কয়েক মাস আগের এক বিবৃতি অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৮ দশমিক ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৫১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম অর্ধে (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর ২০২৬) বার্ষিক ভিত্তিতে প্রায় ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯ হাজার ১৭৬ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে।
১১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং যোগ দিয়েছিলেন। জুলাই থেকে দুই দেশের মধ্যে তিনটি উচ্চপর্যায়ের সীমান্ত আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু অচলাবস্থা কাটেনি।
ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) মহাপরিচালক শত্রুজিৎ কাপুরের মতে, অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত বরাবর একাধিক স্থানে চীনা সৈন্যদের সঙ্গে ভারতীয় বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
রাজস্থানের আলোয়ারের সেন্ট্রাল ট্রেনিং কলেজে (সিটিসি) অনুষ্ঠিত আইটিবিপি কর্মীদের বার্ষিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কাপুর বলেন, অরুণাচল সীমান্তে চলমান সংঘাতের সময় আইটিবিপি কমান্ডোরা অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
শত্রুজিৎ কাপুর বলেন, ‘আমাদের সদ্য গঠিত শৌর্য কমান্ডোরা দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রাখছে। আইটিবিপিকে মূলত একটি পার্বত্য গেরিলা বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। ২০০৪ সালে আমাদের চীন সীমান্তে সুরক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।’
আইটিবিপি মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে আলাদা একটি বিশেষ বাহিনী তৈরি করা হচ্ছে, যা অতি উচ্চতার পার্বত্য যুদ্ধ করতে সক্ষম। শিগগিরই আমাদের কাছে শৌর্য কমান্ডোদের একটি পুরো ব্যাটালিয়ন থাকবে। অত্যধিক উচ্চতায় মোতায়েন হয়ে লড়াই করাই আমাদের শক্তি।’
চলতি অক্টোবর মাসের শেষে অবসরে যাচ্ছেন শত্রুজিৎ কাপুর।
সরকারি সূত্র উদ্ধৃত করে ভারতের সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, জুলাই মাসের শেষ থেকে অরুণাচল প্রদেশের টাকসিংয়ের কাছে আসাফিলায় ভারত ও চীন মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।
ভারতীয় গণমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’ সূত্রের বরাতে দাবি করেছে, চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) উচ্চতর স্থানে, ভারতের ধারণা করা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার (এলএসি) ৬ থেকে ৭ কিলোমিটারের মধ্যে তাদের অবস্থান। উচ্চ সুবানসিরি জেলার টাকসিং সার্কেলের মাঞ্জা কোম্পানি অপারেটিং বেসের কাছে তাঁবু গেঁড়েছে।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, ‘জুলাই মাসের কোনো এক সময়ে নিয়মিত টহলের সময় মাঞ্জার কাছে (টাকসিং গ্রাম সদরের কাছাকাছি) ভারতীয় ও চীনা সেনারা মুখোমুখি হয়। সংক্ষিপ্ত বিরোধের পর উভয় পক্ষই ফিরে যায়, কিন্তু কয়েকদিন পর চীনা পিএলএ বিপুল সংখ্যায় ফিরে আসে এবং ভারতের ধারণা করা এলএসির প্রায় ৬-৭ কিলোমিটার ভেতরের এলাকায় তাঁবু স্থাপন করে।’
ওই সময় স্থানীয় বাসিন্দারা এই একই কথা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছিলেন। টাকসিং-এর এক সাংবাদিক সে সময় জানিয়েছিলেন, চীনা সেনাবাহিনী অনেকটাই ভারতের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
তবে সেসময় ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরণ রিজিজু বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেননি। আগস্ট মাসের শেষের দিকে কিরণ রিজিজু বলেছিলেন, চীন ভারতের ভেতরে ৬০ কিলোমিটার ঢুকে এসেছে বলে যে প্রচার চালানো হচ্ছে, তা মিথ্যা। তবে সীমান্ত অঞ্চলে কিছু সমস্যা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন।
শত্রুজিৎ কাপুর বৃহস্পতিবারের তাঁর বক্তৃতায় বলেন, আইটিবিপি যে অস্ত্র ব্যবহার করে তা ৫০ বছরের পুরোনো। এসব অস্ত্রের আধুনিকায়ন প্রয়োজন। ড্রোনের মতো প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, প্রথাগত পদ্ধতিতে চীনের মুখোমুখি হওয়া সম্ভব না–ও হতে পারে। কারণ তারা তাদের অস্ত্র ও অবকাঠামোর আধুনিকায়নে বিপুল বিনিয়োগ করেছে।
কাপুর বলেন, একটি ছোট দেশও ড্রোনের মাধ্যমে কীভাবে কোনো বড় দেশকে বিপদে ফেলতে পারে, তা ইউক্রেন ও ইরানের উদাহরণ থেকে দেখা গেছে। তিনি জানান, আধুনিকায়ন তহবিলের একটি বড় অংশ ড্রোনের পেছনে ব্যয় করা হচ্ছে। আগামী তিন বছরে চীন সীমান্ত বরাবর ভূমির ওপরের মতো সমপরিমাণ ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র (বাঙ্কার) গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা আধুনিক যুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সীমান্ত সংঘর্ষের সঙ্গে সঙ্গে ভারত-চীন সীমান্ত বিষয়ক ‘ওয়ার্কিং মেকানিজম ফর কনসালটেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন’ (ডব্লিউএমসিসি)-এর ৩৬তম বৈঠক ৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর ২৬ আগস্ট সীমানাসংক্রান্ত বিশেষ প্রতিনিধিদের ২৫তম দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় বেইজিংয়ে।
ওই বৈঠকে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) অজিত ডোভাল। গত ৬ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরে দুই দেশের সেনাবাহিনীর কোর কমান্ডার স্তরের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
কংগ্রেসদলীয় সংসদ সদস্য জয়রাম রমেশ কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে চীনের কাছে নতিস্বীকার এবং অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তে উত্তেজনার বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে না পারার অভিযোগ তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের (টুইটার) এক পোস্টে তিনি আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে সরকারের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
জয়রাম রমেশ অভিযোগ করেন, লাদাখের মতো অরুণাচল প্রদেশেরও কয়েকটি টহল-বিন্দু থেকে ভারতের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে এবং চীন নির্বিচারে অরুণাচলের শহরগুলোর নাম পরিবর্তন করছে। চীন ৬০ হাজার মেগাওয়াটের একটি বাঁধ তৈরি করছে, যা অঞ্চলের পরিবেশ ও জল নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি তৈরি করেছে।
ভারত অরুণাচল প্রদেশের উত্তর অংশে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এই বাঁধ নির্মাণ নিয়ে প্রবল বিরোধিতা শুরু হয়েছে।