দুর্গাপূজার পর দিল্লিতে কি আবার জ্ঞানেশবিরোধী আন্দোলন শুরু হচ্ছে

কারাগার থেকে বের হয়ে আসার পর ভারতের পতাকা হাতে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। ২১ অক্টোবর ২০২৬, নয়াদিল্লি
ছবি: এএনআই

দুর্গাপূজা, দশেরা ও নবরাত্রি মিটতেই আবার ‘জ্ঞানেশ হটাও, গণতন্ত্র বাঁচাও’ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। ‘পিপল এগেইনস্ট এসআইআর’ ব্যানারে আগামীকাল শুক্রবার এই বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে।

মাত্র এক সপ্তাহ আগে এই গোষ্ঠীর জন্ম। তারা জানিয়েছে, শুক্রবারের এই আন্দোলনের জন্য পুলিশের কাছে কোনো অনুমতি চাওয়া হবে না। কনট প্লেসের কাছে বাংলা সাহেব গুরুদ্বারের সামনে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হবেন। সেখান থেকে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করে তাঁরা যাবেন নির্বাচন কমিশনের সামনে।

আয়োজকেরা জানান, পুলিশ পথ রোধ করলে আন্দোলনকারীরা সংঘাতের পথে যাবেন না। যেখানে আটকাবে, সেখানে তাঁরা ‘জনতার সংসদ’ বা ‘পিপলস পার্লামেন্ট’ তৈরি করবেন। তারপর জাতীয় সংগীত গেয়ে ফিরে যাবেন।

এই গোষ্ঠীর স্লোগান এ রকম, ‘প্রতিটি গলি যন্তর মন্তর’, ‘প্রতিটি এলাকা যন্তর মন্তর’, ‘আমাদের ঘর যন্তর মন্তর’। তাঁরা জানিয়েছেন, শুধু দিল্লি নয়, দেশের সর্বত্র তাঁরা এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল ও জ্ঞানেশ অপসারণ নিয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে দেবেন।

কাল শুক্রবার দিল্লিতে যেখান থেকে মিছিল করার কথা এবং যেখানে বিক্ষোভকারীদের যাওয়ার কথা, সেখানে আগে থেকেই ভারতীয় ন্যায়সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি রয়েছে। এই ধারায় চার বা ততধিক ব্যক্তির সমাবেশ নিষিদ্ধ। নিষেধের তালিকায় আছে স্লোগান দেওয়া, প্ল্যাকার্ড বা ব্যানার নিয়ে পথচলা, ভাষণ দেওয়া ও অস্ত্র হাতে রাখা। এই পরিস্থিতিতে শুক্রবারের বিক্ষোভ সমাবেশ কতটা কার্যকর হবে, সেই সন্দেহ থাকছেই।

এই ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অভিযান’–এ শামিল হতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দিপকে, সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন ‘আইসা’ নেত্রী নেহা বোরা, সিপিএম নেত্রী ঐশী ঘোষ, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণদের আহ্বান জানানো হয়েছে।

কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার কথা দক্ষিণি অভিনেতা ও আন্দোলনকর্মী প্রকাশ রাজ, উত্তর প্রদেশের কৃষকনেতা রাকেশ টিকায়েত, মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র সমাজকর্মী তুষার গান্ধী ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ পরকলা প্রভাকরেরও। প্রভাকর এসআইআর প্রক্রিয়াকে ‘নাগরিকত্বের রক্তহীন রাজনৈতিক গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেছেন। এর বিরুদ্ধে তিনি অত্যন্ত সরব। ‘ইন্ডিয়া’ জোটকেও এই বিক্ষোভ সমাবেশের শরিক হতে বলা হয়েছে।

ইন্ডিয়া জোটের পক্ষ থেকে অবশ্য এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আগামী ১ নভেম্বর জোট নেতারা দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিক্ষোভ সমাবেশ করবেন। দিল্লি পুলিশ সেই সমাবেশের অনুমতিও দিয়েছে।

সিইসি জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে নাগপুরে সিজেপির সমর্থকদের তেরঙ্গাযাত্রা। ১৭ অক্টোবর ২০২৬, মহারাষ্ট্র

সেই সমাবেশ ও পরবর্তী আন্দোলনসূচি ঠিক করতে জোটের নেতারা শিগগিরই ভার্চ্যুয়াল মিটিং করবেন। আজ বৃহস্পতিবারই সেই মিটিং হওয়ার কথা ছিল। তবে কোনো কারণে তা বাতিল করা হয়। জোট সূত্রের খবর, দুই–চার দিনের মধ্যেই জোট নেতৃত্ব নিজেদের মধ্যে আলোচনা সারবেন।

সিজেপি নেতারাও তাঁদের আগামী দিনের আন্দোলন কর্মসূচি ঠিক করতে বৈঠকে বসবেন। গত বুধবার রাতে দুই নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাস তিহার জেল থেকে মুক্তি পান। কারাগারের বাইরে আসামাত্র দিল্লি পুলিশ তাঁদের জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় রাজৌরি গার্ডেনে দিল্লি পুলিশের অপরাধ দমন শাখায় তাঁদের হাজিরা দিতে হবে।

সৌরভদের সঙ্গে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে সিজেপি নেতা অজিঙ্ক শিন্ডেকেও। দিপকে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে এই অজিঙ্কের হাতেই আন্দোলনের নেতৃত্ব তুলে দিয়েছিলেন।

আশুতোষ, সৌরভ ও অজিঙ্ক—তিনজনই ১৩ অক্টোবর আন্দোলনের জন্য নিষিদ্ধ যন্তর মন্তরে ঢুকে পড়েছিলেন। জাতীয় পতাকা উড়িয়ে জ্ঞানেশবিরোধী স্লোগান দিয়েছিলেন। এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি জানিয়েছিলেন। তিন নেতার বিরুদ্ধে দুটি এফআইআর করা হয়েছে। একটা হলো, নিষিদ্ধঘোষিত স্থানে জবরদস্তি প্রবেশ, অন্যটি হলো পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া। তাঁদের মামলার তদন্তের ভার তুলে দেওয়া হয়েছে ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে।

সিজেপি নেতারা বৃহস্পতিবার রাজৌরি গার্ডেনে অপরাধ দমন শাখায় হাজিরা দেননি। তাঁরা পুলিশের কাছে আরও সময় চেয়ে চিঠি দিয়েছেন। পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, সিজেপি নেতাদের হাজিরার জন্য নতুন নোটিশ পাঠানো হবে।

অমিত শাহর মুখে আবার ‘ঘুসপেটিয়া’ তত্ত্ব

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আজ বৃহস্পতিবার আবার সেই পুরোনো ‘ঘুসপেটিয়া’ তত্ত্ব সামনে টেনে আনলেন। দিল্লিতে এক সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধন উপলক্ষে তিনি বলেন, কংগ্রেস ও বিরোধীরা এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে এত কথা বলছেন একটাই কারণে। তাঁরা চান না, ভোটার তালিকা থেকে ঘুসপেটিয়া বা অনুপ্রবেশকারীদের নাম কাটা যাক। সেই কারণেই ভোটচুরির মনগড়া অভিযোগ এনে আসর জমাতে চাইছেন।

এই প্রসঙ্গে কংগ্রেসকে একহাত নিয়ে অমিত শাহ বলেন, কংগ্রেস যত যা–ই করুক, আগামী ৩০ বছর তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর প্রতি কটাক্ষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমার কথা এখন আপনি শুনতে পাবেন না। কারণ, এই মুহূর্তে বিদেশে বসে আছেন। কিন্তু দিল্লি ফিরে শুনবেন, আমি বলেছি, আগামী ৩০ বছরেও আপনি ক্ষমতায় আসতে পারবেন না।’

রাহুলের উদ্দেশে অমিত শাহ বলেন, ‘আপনি সারাক্ষণ ভোটচুরি ভোটচুরি বলে চেঁচান। কারণ, আপনি অনুপ্রবেশকারীদের ভোটাধিকার দিতে চান।’

এযাবৎ যত রাজ্যে এসআইআর হয়েছে, যত ভোটারের নাম কাটা গেছে, তাঁদের মধ্যে কতজন ঘুসপেটিয়া, সেই হিসাব নির্বাচন কমিশন আজও দেয়নি। বিরোধীদের বারবার দাবি সত্ত্বেও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার জানাননি বাদ যাওয়া ভোটারদের মধ্যে কতজন বিদেশি।

অথচ বিজেপির কাছে বিহার, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের ভোটের সবচেয়ে বড় ইস্যুই ছিল ‘বাংলাদেশি ভোটার’। বিজেপির অভিযোগ ছিল, লাখ লাখ বাংলাদেশি এই রাজ্যগুলোর ভোটার তালিকায় ছেয়ে রয়েছেন। তাঁদের তাড়ানোই এসআইআরের মূল লক্ষ্য।