
জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটিতে উজ্জ্বল লাল ও নীল রঙের সিল্কের শাড়ি পরেছিলেন ভারতীয় বিজ্ঞানী নন্দিনী হরিনাথ। এখন সে শাড়ি যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস জাদুঘরে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে সংরক্ষিত আছে।
নন্দিনী ভারতের প্রথম মঙ্গল অভিযান মঙ্গলযানের কার্যক্রম পরিচালনাবিষয়ক পরিচালক ছিলেন। অভিযান চলাকালে ২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি সেই পোশাক পরে ভারতের মহাকাশ সংস্থা ইসরোর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে উপস্থিত ছিলেন।
নন্দিনী তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময়গুলোতে বা ভারতের মহাকাশ সংস্থাকে প্রতিনিধিত্ব করার সময় শাড়ি পরতে পছন্দ করেন। বিশেষ করে তিনি এ ধরনের সময়গুলোতে তাঁর বাবার দেওয়া শাড়ি পরে থাকেন। তাই ওই দিনেও তিনি পোশাক হিসেবে শাড়িকেই বেছে নিয়েছিলেন। কারণ, তাঁর কাছে দিনটি প্রকল্পের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ মুহূর্ত ছিল।
ম্যাট শিন্ডেল ২০২০ সালে ই–মেইলের মাধ্যমে নন্দিনী হরিনাথের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কোন বস্তুটি দিয়ে ভারতের মঙ্গল অভিযানকে এবং সে অভিযানে নন্দিনীর ভূমিকাকে সবচেয়ে ভালোভাবে উপস্থাপন করা যাবে, তা নিয়ে দুজন আলোচনা শুরু করেন।
ওই দিন ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (ইসরো) বিজ্ঞানীরা নিয়ন্ত্রণকক্ষে উপস্থিত ছিলেন এবং মহাকাশযানটিকে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বের করে মঙ্গলের দিকে প্রায় ৩০০ দিনের যাত্রায় পাঠিয়েছিলেন।
নন্দিনী বলেন, ‘এটি ছিল একটি শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্ত, অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, মহাকাশযান কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে এবং কখন যাবে। সেই দিনের কাজের ওপরই অভিযানের সাফল্য নির্ভর করছিল।’
২০১৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর মহাকাশযানটি সফলভাবে মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছায়। বিশ্বের চতুর্থ দেশ হিসেবে এমন সাফল্য অর্জন করে ভারত। সেদিন তোলা একটি ছবিকে কেন্দ্র করে নন্দিনী ও এ অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য নারী মহাকাশবিজ্ঞানীরা বিশ্বজুড়ে আলোচনায় চলে এসেছিলেন।
সেই ছবিতে দেখা যায়, শাড়ি পরা কয়েকজন নারী ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় (ইসরো) মঙ্গলযানের সাফল্য উদ্যাপন করছেন। এটি তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। ভারতের মহাকাশ গবেষণাকে শুধুই পুরুষদের ক্ষেত্র হিসেবে দেখার গৎবাঁধা ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেছিল ছবিটি।
পরে ইসরো সে ছবির ব্যাখ্যা দিয়েছে। তারা বলেছে, ভাইরাল হওয়া ছবির নারীরা মূলত প্রশাসনিক বিভাগের কর্মী ছিলেন। তবে সংস্থাটি এটিও উল্লেখ করেছিল, অভিযানটি পরিচালনায় অনেক নারী বিজ্ঞানী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং সাফল্যের মুহূর্তে তাঁরা নিয়ন্ত্রণকক্ষে উপস্থিত ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ান জাদুঘরের মহাকাশ ইতিহাসবিষয়ক কিউরেটর ম্যাট শিন্ডেল ফোনে বিবিসিকে বলেছেন, ছবিটি তাঁর কাছে ‘অত্যন্ত আকর্ষণীয়’ মনে হয়েছিল।
শিন্ডেল বলেন, ‘আমি মনে করেছি, এই দারুণ গল্পটা সবার জানা উচিত। এটা সেই রকেট নারীদের গল্প, যাঁরা এই গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ অভিযানের একেবারে সামনের সারিতে ও কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।’
এরপর শিন্ডেল উদ্যোগ নিতে শুরু করেন।
ম্যাট শিন্ডেল ২০২০ সালে ই–মেইলের মাধ্যমে নন্দিনী হরিনাথের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কোন বস্তুটি দিয়ে ভারতের মঙ্গল অভিযানকে এবং সে অভিযানে নন্দিনীর ভূমিকাকে সবচেয়ে ভালোভাবে উপস্থাপন করা যাবে, তা নিয়ে দুজন আলোচনা শুরু করেন।
স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামে নন্দিনীর শাড়িটি এখন প্রদর্শন করা হচ্ছে। সেখানে খেলনা, গেমস, চলচ্চিত্রের পোস্টার, মহাকাশে যাওয়া প্রথম মার্কিন নারীর পরা নীল টি-শার্টসহ নানা ঐতিহাসিক জিনিসপত্র সাজানো আছে।
শিন্ডেল বলেন, ‘আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এমন কোনো জিনিস আছে কি না, যা তিনি আমাদের দিতে রাজি হবেন। পরে আমরা ঠিক করি, মঙ্গলযান পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে মঙ্গলের পথে রওনা হওয়ার দিনে তিনি যে শাড়ি পরেছিলেন, সেটিই জাদুঘরে রাখা হবে।’
অবশেষে শাড়ি ও এর সঙ্গে থাকা নীল ব্লাউজটি জাদুঘরে পাঠানো হয়। জাদুঘরের টেক্সটাইল সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ বেথ নাইট বুঝতে পারছিলেন না, ম্যানিকুইনকে কীভাবে শাড়িটি পরাতে হবে। এর জন্য তিনি ইউটিউবের সাহায্য নেন। ইউটিউব ভিডিও দেখে তিনি শাড়ি পরানোটা রপ্ত করে ফেলেন।
শিন্ডেলের মতে, শাড়িটির সঙ্গে জাদুঘরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ মিশনের স্মৃতিচিহ্নের একধরনের মিল আছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো-১৩ মহাকাশচারীদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার সময় নাসার ফ্লাইট কন্ট্রোল প্রধান জিন ক্রানজের পরা ভেস্টও এমনই একটি প্রতীকী বস্তু।
স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামে নন্দিনীর শাড়িটি এখন প্রদর্শন করা হচ্ছে। সেখানে খেলনা, গেমস, চলচ্চিত্রের পোস্টার, মহাকাশে যাওয়া প্রথম মার্কিন নারীর পরা নীল টি-শার্টসহ নানা ঐতিহাসিক জিনিসপত্র সাজানো আছে।
স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনে প্রতি সপ্তাহে ১০ হাজারের বেশি দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। তাদের সংগ্রহে ভারতের আরও কিছু বস্তু আছে। তবে সেগুলোর বেশির ভাগই বিমানবাহিনী ও বিভিন্ন উড়োজাহাজ কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ছাড়া সেখানে একটি স্মারক রুপার ট্রে আছে। এটি ২০০৭ সালে বিজ্ঞানবিষয়ক কল্পকাহিনি লেখক আর্থার সি ক্লার্কের ৯০তম জন্মদিনে তাঁকে উপহার দিয়েছিল ইসরো।
শিন্ডেল বলেন, নন্দিনীর শাড়িটিই প্রথম বস্তু, যেটি তিনি আন্তগ্রহীয় বিজ্ঞান সংগ্রহ হিসেবে ভারত থেকে সংগ্রহ করেছেন। এটি ওই জাদুঘরে রাখা প্রথম শাড়ি।
শাড়িটি এখন জাদুঘরের ‘ফিউচারস ইন স্পেস’ গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে। সেখানে খেলনা, গেমস, চলচ্চিত্রের পোস্টারসহ নানা ধরনের বস্তু রাখা আছে।
মহাকাশে যাওয়া প্রথম মার্কিন নারী স্যালি রাইডের পরা আইকনিক নীল টি-শার্টের পাশে এটিকে রাখা হয়েছে। ১৯৮৩ সালের স্পেস শাটল অভিযানের অংশ হিসেবে ওই নারী মহাকাশে গিয়েছিলেন।
শিন্ডেল বলেন, এ প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য হলো দর্শনার্থীদের সাম্প্রতিক মহাকাশ অভিযানের সঙ্গে যুক্ত করা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করা।
যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ান জাদুঘরের মহাকাশ ইতিহাসবিষয়ক কিউরেটর বলেন, ‘মহাকাশ নিয়ে আমাদের অনেক প্রশ্ন আছে। যেমন কারা মহাকাশে যাবে, তা কে ঠিক করে? আমরা কেন যাই? আর সেখানে গিয়ে আমরা কী করব? এ প্রদর্শনী দর্শনার্থীদের সেই প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবতে উৎসাহ দেয়।’
শিন্ডেলের ভাষ্যমতে, ‘প্রদর্শনীটি মূলত কেন আমরা মহাকাশে যাই—এ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে। এখানে রাখা প্রতিটি বস্তুই মহাকাশে যাওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য ও প্রেরণাকে তুলে ধরে।’
শিন্ডেল বলেন, নন্দিনীর শাড়িটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণার প্রতীক। প্রথমত, এটি ভারতের প্রথম মঙ্গল অভিযান এবং দেশের সফল মহাকাশ কর্মসূচিকে নিয়ে জাতীয় গর্বের প্রতীক। দ্বিতীয়ত, এটি তাঁর ব্যক্তিগত গল্পকে তুলে ধরে, যা অনুপ্রেরণাদায়ক। কারণ, তাঁর সাফল্য আরও অনেক নারীকে বিজ্ঞানক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়তে উৎসাহিত করতে পারে।
শিন্ডেল শাড়িটি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। সেটি হলো এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এবং সহজে চেনা যাওয়ার মতো দৃশ্যমান পরিচিতি। দর্শনার্থীরা প্রদর্শনীতে রাখা বস্তুগুলো সম্পর্কে আরও জানতে টাচস্ক্রিন ব্যবহার করতে পারেন।
শিন্ডেল বলেন, ‘দর্শনার্থীরা শাড়িটি দেখে এর সম্পর্কে আরও জানতে চাইছেন। এটা দেখে আমি খুবই আনন্দিত। এটি আমাদের সংগ্রহগুলোর মধ্যে এক অসাধারণ সংযোজন।’