
নির্বাচন কমিশনের ‘স্বেচ্ছাচারী’ কর্তার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি জানানো সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা নেননি মুখ্য নির্বচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার। তথ্য জানার অধিকার আইন (আরটিআই) অনুযায়ী এই তথ্য জানা গেছে। ওই আইন অনুযায়ী প্রকাশিত খবরের সত্যতা জানতে চেয়েছিলেন এক সমাজকর্মী কমোডর লোকেশ কে বাত্রা।
গত সেপ্টেম্বর মাসে সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা গিয়েছিল, নির্বাচন কমিশনের একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি। জ্যেষ্ঠ উপনির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গের কাজকর্মের ধরন–ধারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁরা ক্যাবিনেট সচিবালয়কে চিঠিও লিখেছিলেন। তথ্য কমিশনার সেই চিঠি লেখার কথা স্বীকার করেছেন।
আরটিআই অনুযায়ী, ক্যাবিনেট সচিব টিভি সোমনাথন চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি চিঠির প্রতিলিপি জ্ঞানেশ কুমারকেও পাঠিয়েছিলেন।
কিন্তু ক্যাবিনেট সচিবালয় বা সিইসি, কেউ মণীশ গর্গের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি।
আরটিআইয়ে করা প্রশ্ন ও তার জবাব বিস্তারিতভাবে জানিয়ে পিটিআইয়ের খবরে বলা হয়েছে, ক্যাবিনেট সচিব টিভি সোমনাথনকে দুই কমিশনার চিঠি লিখেছিলেন আলাদাভাবে, গত ২৯ জুলাই। কমোডর লোকেশ কে বাত্রার প্রশ্নের জবাবে সে কথা জানিয়ে বলা হয়, ক্যাবিনেট সচিব সেই দুই চিঠিকে পৃথকভাবে গণ্য করেছিলেন।
সচিবের অভিমত ছিল, নির্বাচন কমিশনের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই চিঠি লেখা হয়নি। দুই কমিশনার আলাদাভাবে তাঁদের অভিযোগ দাখিল করেছিলেন। তাই সেই অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হলেও ক্যাবিনেট সচিবালয় নির্বাচন কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপ করা যথাযথ মনে করেনি, যেহেতু আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশনের পক্ষে অভিযোগ করা হয়নি।
তবে ওই চিঠি প্রাপ্তির কথা ক্যাবিনেট সচিবালয় নিশ্চিত করেছে। তাদের তরফ থেকে সিইসির প্রধান ব্যক্তিগত সচিবের কাছে ওই দুই চিঠির প্রতিলিপিও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
দুই নির্বাচন কমিশনার সান্ধু ও যোশি অভিযোগে লিখেছিলেন, জ্যেষ্ঠ উপনির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গ শীর্ষ কর্মকর্তাদের কিছু না জানিয়ে কাজ করছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন। তাঁদের দৃষ্টিতে সেটা ছিল ‘স্বেচ্ছাচারিতা’। তাঁদের না জানিয়ে মণীশ গর্গ ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার, ডিরেক্টর জেনারেল ও অন্যান্য কর্মকর্তাকে কাজ বণ্টন করে দিয়েছিলেন।
যোশি তাঁর চিঠিতে এমন অভিযোগও করেছিলেন, জরুরি ফাইল চেয়ে পাঠালেও কমিশনের প্রশাসনিক বিভাগ তা তাঁকে দেয়নি।
এই চিঠি ও ক্যাবিনেট সচিবালয় থেকে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়াকে কেন্দ্র করে অনেক প্রশ্ন উঠছে। যেমন, দুই নির্বাচন কমিশনার আলাদা চিঠি লিখলেও তা তাঁরা লিখেছিলেন পদমর্যাদার অপব্যবহার না করে। দুজনের অভিযোগের চরিত্রও ছিল একই ধরনের।
এরপরও ক্যাবিনেট সচিব সোমনাথন কেন ওই অভিযোগকে আনুষ্ঠানিক মানলেন না? কেন মনে করলেন তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ করেছেন? নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের। দুজন যখন একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন, তখন তা গ্রাহ্য না করে কেন ঝুলিয়ে রাখা হলো?
দ্বিতীয় প্রশ্ন, দুই নির্বাচন কমিশনার অধস্তন কর্মচারীর বিরুদ্ধে কেন ক্যাবিনেট সচিবকে চিঠি লিখলেন? মণীশ গর্গের নিয়োগকর্তা ক্যাবিনেট সচিবালয় বলে? তাঁরা কেন অভ্যন্তরীণভাবে ওই বিচ্যুতির মীমাংসা করলেন না? এখানেই উঠে আসছে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের ওপর দুই নির্বাচন কমিশনারের আস্থার অভাবের প্রশ্নটি।
দাবি উঠেছে, ক্যাবিনেট সচিব গোটা বিষয়টি জ্ঞানেশ কুমারের দৃষ্টিগোচর করা সত্ত্বেও এ নিয়ে কমিশনে আলোচনা হয়েছিল কি না, না হয়ে থাকলে কেন হয়নি, তা খতিয়ে দেখা দরকার। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ অন্যদের আবেদন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছে। সেই মামলায় জ্ঞানেশ, সান্ধু ও যোশিকে নোটিশও দেওয়া হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, মামলার শুনানিতে বিষয়গুলোর অবতারণা হবে।
নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং তার ভিত্তিতে ‘জ্ঞানেশ হটাও’ ও ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া বাতিলের আন্দোলনকে দেশের প্রধান শাসক দল বিজেপি বিদেশি মদদে দেশবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র মনে করছে।
প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিজেপির সর্বস্তরের নেতারা এই ‘চক্রান্তের’ বিরুদ্ধে স্বর উঠিয়েছেন। অথচ আজও নির্বাচন কমিশন বলেনি, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অসত্য। একটি অভিযোগও আজ পর্যন্ত কমিশন খণ্ডন করতে পারেনি। বরং তাদের আচরণ ও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বুঝিয়ে দিচ্ছে, প্রতিটি অভিযোগই সত্য।
সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশিকে অন্ধকারে রেখে জ্ঞানেশ কুমার একাই বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তা করতে গিয়ে সময়–সময় তিনি আইনবিরুদ্ধ কাজও করেছেন। যেমন, ফর্ম ৬–এ (নতুন ভোটারদের অন্তর্ভুক্তির জন্য) বদল ঘটানো। কিংবা ফর্ম ৭–এর (ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অধিকার) ব্যাপক অপব্যবহারে মদদ দেওয়া।
এসব অসংগতি দূর করার দাবি বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তারা জানিয়েছেনও। তবে এখনো প্রতিকার হয়নি। কমিশনের সিদ্ধান্ত ঝুলে রয়েছে।