
‘একটু ঘুমাতে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর আবার সবার সঙ্গে দেখা হবে’—ভারতীয় সময় গতকাল শনিবার বিকেল ৪টা ৩২ মিনিটে অভিজিৎ দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এমন দুটি লাইন পোস্ট করেন, যা অন্য যেকোনো দিন খুবই সাধারণ বা গুরুত্বহীন মনে হতে পারত। কিন্তু দিনটি ছিল ব্যতিক্রম। কারণ, এর ঠিক ২ ঘণ্টা আগে, বেলা ২টা ১৮ মিনিটে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
এর মধ্য দিয়ে এমন এক অধ্যায়ের আপাত সমাপ্তি ঘটেছে, যার সূচনা হয়েছিল গত ১৬ মে, যেদিন দিপকে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) গঠন করেছিলেন।
অভিজিৎ দিপকে তখন যুক্তরাষ্ট্রে, বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছেন। ১৫ মে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি মন্তব্য করেছিলেন। অনেকের কাছে যা শুনে মনে হয়েছিল, তিনি বেকার তরুণদের তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ঠিক এর পরদিন সিজেপির জন্ম হয়। দিপকে এক্সে এক পোস্টে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘যদি সব তেলাপোকা একসঙ্গে আসে, তবে কী হবে?’ এ একটি পোস্ট থেকেই যাত্রা শুরু।
এক সপ্তাহের কম সময়ে সিজেপি অনলাইনে কোটি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, বিশেষ করে ইনস্টাগ্রামে। পরে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষা বাতিলের প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরের আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
অভিজিৎ দিপকে চাননি সিজেপি শুধু অনলাইন আন্দোলনে সীমাবদ্ধ থাকুক। তাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগ দিতে গত ৬ জুন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে ফিরে আসেন। বিমানবন্দর থেকেই তিনি যন্তর মন্তরে চলে যান।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গতকাল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগের ঘোষণা দেন। সেদিনই সিজেপি তাদের আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষণা করে।
এটা জয়। অভিজিৎ ধৈর্য ধরে লড়াই করেছে। তাকে চড় মারা হয়েছে, নানা অপবাদ দেওয়া হয়েছে। এত অল্প বয়সেই সে এত বড় অর্জন করেছে।অনিতা, অভিজিৎ দিপকের মা
ভগবান শঙ্কর ও তাঁর স্ত্রী অনিতা আন্দোলন প্রত্যাহারের খবরে স্বস্তি অনুভব করেন। এ দুজন অভিজিৎ দিপকের বাবা-মা।
গতকাল দিপকের বাবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘আমি কখনো কল্পনাও করিনি, সে এতটা বড় হয়ে উঠবে।’
অনিতা বলেন, ‘এটা জয়। অভিজিৎ ধৈর্য ধরে লড়াই করেছে। তাকে চড় মারা হয়েছে, নানা অপবাদ দেওয়া হয়েছে। এত অল্প বয়সেই সে এত বড় অর্জন করেছে।’
দিপকের পরিবার মহারাষ্ট্রের আওরাঙ্গাবাদে বসবাস করেন, যার বর্তমান নাম ছত্রপতি সম্ভাজিনগর।
আজ রোববার সকালে ভগবান শঙ্কর কাছের গ্রামের একটি মন্দিরে গিয়ে দেশের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন। তিনি মহারাষ্ট্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের অবসরপ্রাপ্ত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার।
অনিতা বলেন, গত শুক্রবার ছেলের সঙ্গে সর্বশেষ তাঁর কথা হয়েছে, তা-ও ভিডিও কলে। ছেলে তাঁকে বলেছে, ‘মা, একটু ভাইরাল হয়ে গেছি।’
অনিতা আরও বলেন, ‘শুরুর দিকে অভিজিৎ যা করছিল, আমি তা সমর্থন করিনি। পরে দেখলাম, সে শিক্ষার্থীদের জন্য লড়াই করছে।’
এ সময় অভিজিতের বাবা বলেন, ‘অভিজিৎ কখনোই রাজনীতিতে যাবে না।’ তাঁর পরিবারের কেউ কোনোদিন রাজনীতি করেননি বলে জানান তিনি। বলেন, ‘এমনকি কেউ সরপঞ্জও (গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান) ছিলেন না।’
ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই বাবা বলেন, ‘ওকে নিয়ে আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, সে যেন সিভিল সার্ভিসে যোগ দেয়। আমি তাঁকে সব সময় বলতাম, ইউপিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে তাঁর একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল কর্মজীবন হবে।’
দিপকের বড় বোন চাইতেন, তিনি যেন বাবার মতো ইঞ্জিনিয়ার হন। দিপকে চেয়েছেন সাংবাদিক হতে। আর ছিল ক্রিকেট খেলার নেশা।
২০২১ সালে পুনের তিলক মহারাষ্ট্র বিদ্যাপীঠে সাংবাদিকতা বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন দিপকে। পরে জনসংযোগ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব কমিউনিকেশনে ভর্তি হন। তাঁর বাবা তখন অবসরের দ্বারপ্রান্তে। শিক্ষাঋণ নিয়ে ছেলেকে বিদেশে পড়তে পাঠান তিনি।
ভগবান শঙ্কর বলেন, ‘আমি এখনো তাঁর শিক্ষাঋণ পরিশোধ করছি।’