
ভারতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর নরওয়ের এক সংবাদপত্রের কার্টুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সাপুড়ে হিসেবে দেখানো হলো। এই কার্টুন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ওই পত্রিকার বিরুদ্ধে জাতিবিদ্বেষ ও ঔপনিবেশিক মানসিকতা প্রকাশের অভিযোগ আনা হয়েছে। এমন কথাও বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মোদির সফর ঘিরে এই কার্টুন প্রকাশ ‘কুরুচিপূর্ণ ও অবমাননাকর’।
প্রধানমন্ত্রী মোদির নরওয়ে সফর শুরু থেকেই বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ৪৩ বছর আগে, ১৯৮৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নরওয়ে সফরে গিয়েছিলেন। তার পর এবার গেলেন নরেন্দ্র মোদি। সফর চলাকালে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হলেও মোদি কারও কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকা হেলে লিং নামের এক নারী সাংবাদিক মোদির উদ্দেশে বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রশ্ন কি আপনি নেবেন না? মোদি কোনো জবাব না দিয়ে সম্মেলনকক্ষ ত্যাগ করেন।
এরপরই ওই সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে লেখেন, ‘নরেন্দ্র মোদি আমার প্রশ্ন শুনতে চাননি। আমি আশাও করিনি। বিশ্বের স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সূচকে নরওয়ের অবস্থান প্রথম, ভারতের ১৫৭তম।’
এই বিতর্কের মধ্যেই ওই কার্টুন। সেটি প্রকাশিত হয় আফটেনপোস্টেন নামের এক সংবাদপত্রে, মতামত বিভাগে লেখা এক নিবন্ধের সঙ্গে। নিবন্ধের শিরোনামে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ‘একজন ধূর্ত ও ঈষৎ বিরক্তিকর মানুষ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
কার্টুনে দেখানো হয়েছে, মোদি একজন সাপুড়ে। মেঝেতে চাদর পেতে সাপের বাঁশিতে (বিন) ফুঁ দিচ্ছেন। সামনে রাখা ঝাঁপির মধ্য থেকে একটি সাপ হিলহিলিয়ে উঠেছে। সাপের মুখটি অবশ্য গাড়ির ট্যাংকে পেট্রল বা ডিজেল ভরার নজলের মতো। মোদির সফর চলাকালে ভারতে সব ধরনের জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, ওই কার্টুনের মধ্য দিয়ে সেই মূল্যবৃদ্ধির জন্য তাঁকে কটাক্ষ করা হয়েছে।
ওই কার্টুন প্রসঙ্গে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য এখনো করা হয়নি। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অধিকাংশই মনে করছেন, মোদিই শুধু নন, ওই কার্টুনে ভারত দেশকে অসম্মান করা হয়েছে। বিজ্ঞান থেকে প্রযুক্তি—সর্বক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্ত্বেও ভারতকে এখনো তারা ‘সাপুড়ের দেশ’ হিসেবে দেখতে ভালবাসে।
পাশ্চাত্যের বহু দেশ ভারতকে ‘স্নেক চার্মার’ বা সাপুড়েদের দেশ মনে করত। পশ্চিমা দুনিয়াও অনেক দিন ভারতকে বিজ্ঞান–উন্নত দেশ বলে মানতে চায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বলেছেন, এই কার্টুনে সেই ঔপনিবেশিক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
একজন লিখেছেন, কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে এ ধরনের কার্টুন মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাক্স্বাধীনতার অর্থ কাউকে অপমান করা নয়।
আরেকজন এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, নরওয়ের স্বাধীন গণমাধ্যম কি এখনো উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক কার্টুনে আটকে রয়েছে? মোদিই সেই ব্যক্তি, যিনি সারা বিশ্বকে ভারতের সুরে নাচিয়েছেন। ভারতের এই উত্থান ওরা হজম করতে পারছে না।
ভারতের বিভিন্ন উত্থান, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের অগ্রগতি দেখাতে গিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ার গণমাধ্যম অনেক সময় ‘সাপুড়ে’–কে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছে।
২০২২ সালে স্পেনের সংবাদপত্র লা ভ্যানগার্ডিয়া অর্থনৈতিক উত্থান প্রসঙ্গে ‘সাপুড়ে’ প্রতীক ব্যবহার করেছিল। প্রধানমন্ত্রী মোদিও বহুবার বিদেশে ভাষণ দিতে গিয়ে ওই প্রতীক প্রসঙ্গে বলেছেন, যে দেশকে একসময় ‘স্নেক চার্মারদের’ সঙ্গে তুলনা করা হতো, সেই দেশ এখন ‘মাউস (কম্পিউটারের) চার্মার’। ভারত এখন প্রযুক্তিনির্ভর দেশ।
দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার দশক পর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নরওয়ে সফর আক্ষরিক অর্থেই বিতর্কিত হয়ে রইল। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদি নরওয়ের সাংবাদিক হেলে লিংয়ের প্রশ্ন উপেক্ষা করলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে ওই সাংবাদিক মানবাধিকার ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ নিয়ে জানতে চান, কেন ভারতের বক্তব্য মানুষ বিশ্বাস করবে।
ওই প্রশ্নের জবাবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্তা সিবি জর্জ দীর্ঘ সময় ধরে ভারতীয় গণতন্ত্র, তার চরিত্র ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করেন। এ নিয়ে প্রশ্নকর্তার সঙ্গে তাঁর কিছু বাগ্বিতণ্ডাও হয়। একসময় সিবি জর্জকে বলতে শোনা যায়, প্রশ্ন তাঁকে করা হয়েছে, উত্তর শোনার জন্য ধৈর্য রাখতে হবে।
জর্জ এ কথাও বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে ভারতে যে কেউ বিচারালয়ে যেতে পারেন। ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশের গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডলকে কয়েকটি অজ্ঞ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিচার করা যায় না।