উলফা (আই) নেতা পরেশ বড়ুয়া
উলফা (আই) নেতা পরেশ বড়ুয়া

উলফার পরেশকে আসলেই কি বিপ্লবীর স্বীকৃতি দেবেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী, দেয়ালে কেন তাঁর ছবি আঁকতে বললেন

আসামসহ গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম শক্তিশালী নিষিদ্ধ, সশস্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব অসম (উলফা)। সেই সংগঠনের প্রধান পরেশ বড়ুয়া দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় কোনো দেশে রয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। আসামের মূল স্রোতের রাজনৈতিক নেতারা তাঁকে বরাবরই একজন অপরাধী ও সন্ত্রাসী বলে চিহ্নিত করে এসেছে।

এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে আসামের বিজেপিদলীয় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা সম্প্রতি বলেছেন, আসামে কোনো প্রকাশ্য জায়গায় যদি বিপ্লবী কারও ছবি আঁকতেই হয়, তবে উলফা (আই) প্রধান পরেশ বড়ুয়ার ছবি আঁকাই ভালো। বিষয়টি নিয়ে আসামসহ গোটা ভারতে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

আসামের জনপ্রিয় গায়ক জুবিন গার্গ প্রায় ১০ মাস আগে সিঙ্গাপুরে স্কুবা ডাইভিংয়ের সময় পানিতে ডুবে মারা গেছেন। বিপ্লবী চে গুয়েভারার মতো করে আঁকা গার্গের একটি দেয়ালচিত্র গুয়াহাটির একটি উড়ালসড়কের নিচে কিছুদিন আগে এঁকেছিলেন চিত্রশিল্পী মার্শাল বড়ুয়া। সেটি সম্প্রতি মুছে ফেলা হয়েছে।

জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী গার্গের গ্রাফিতি মুছে ফেলাকে কেন্দ্র করে আসামে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সেই বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতেই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গুয়েভারার পরিবর্তে পরেশ বড়ুয়ার ছবি আঁকা ভালো।

১৯৭৯ সালে গঠিত উলফা আসামকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করেছিল। সেই আন্দোলনের জেরে আটের দশকে উত্তাল হয়ে ওঠে আসাম। বহু মানুষ হতাহত হন। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব যাঁরা দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই মূল স্রোতে মিশে যান। কিন্তু উলফার একটা অংশ এর বাইরে থেকে যায়। উলফা নেতৃত্ব আসাম ছেড়ে অন্য দেশ থেকে সংগঠন পরিচালনা করতে থাকে।

পরবর্তী সময় উলফার আলোচনাপন্থী দল ভারত ও আসাম সরকারের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করলে উলফা-আই এর বিরোধিতা করে। তারা আসামে এখনো সক্রিয়। এ অবস্থায় সেই সংগঠনের প্রধান এবং আসাম জাতীয়তাবাদের প্রধান চরিত্র পরেশ পড়ুয়ার ছবি প্রকাশ্যে আঁকতে বললেন মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বশর্মা।

বিশ্বশর্মা বলেন, যাঁরা ছবিটি মুছে দিয়েছিলেন, তাঁরা খাঁটি অহমিয়া ও জুবিনের ভক্ত। তাঁরা পুলিশকে জানিয়েছে, ‘চে গুয়েভারা স্টাইলে’ আঁকার কারণে তাঁরা জুবিনকে চিনতে পারেনি। তবে বিপ্লবী হিসেবে যদি কাউকে আঁকতেই হয়, তবে আসামেরই পরেশ বড়ুয়া বা নিহত সমাজকর্মী পরাগ দাসের ছবি আঁকা উচিত।

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, ‘আমি হয়তো পরেশ বড়ুয়ার আদর্শ মেনে নেব না বা তাঁর নিন্দা করব। কিন্তু কেউ যদি বিপ্লবীর ছবি আঁকতে চান, তবে অহমিয়া বিপ্লবীদের ছবিই আঁকা উচিত হবে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ৭০ বছর বয়সী পরেশ বড়ুয়া পাশের শক্তিশালী একটি দেশ থেকে থেকে ভারতের বিরুদ্ধে এখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চালাচ্ছেন।

এ রকম একজন স্বাধীনতাকামী ও বিদ্রোহী নেতা ভারতের জন্য বিপজ্জনক। তা সত্ত্বেও কেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা তাঁকে নতুন করে জনসমক্ষে আনার আবেদন জানালেন, তা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও এর কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

তবে পর্যবেক্ষকেরা হিমন্তের বক্তব্যের নানা ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আসামের এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ধারণা হিমন্ত বিশ্বশর্মা আসামি জাতীয়তাবাদের নায়কদের সামনে আনার চেষ্টা করছেন। ভারতে নানা ধরনের জাতীয়তাবাদ রয়েছে—যেমন তামিল জাতীয়তাবাদ। আগামী দিনে আসামের জাতীয়তাবাদকে আলাদাভাবে ভারতের মধ্যে তুলে ধরার কোনো পরিকল্পনা তাঁর থাকলেও থাকতে পারে।’

ওই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, পরেশ বড়ুয়া অবশ্যই আসামি জাতীয়তাবাদের প্রতীক। আবার তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদীও বটে। এখন এই দুটির মধ্যে হিমন্ত কীভাবে ‘ভারসাম্য’ বজায় রাখেন, সেটা দেখার বিষয়। কারণ, বিষয়টি স্পর্শকাতর। একটু এদিক–ওদিক হলেই বিপদের আশঙ্কা বাড়বে। এটাকে আসামের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে তিনি কীভাবে কাজে লাগান, সেটাও দেখার বিষয়।

বিশ্বশর্মা আরও অভিযোগ করেন, চিত্রশিল্পী মার্শাল বড়ুয়া সিপিআইএমের ছাত্রসংগঠন এসএফআইয়ের (স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া) সদস্য, যে কারণে তাঁর আঁকা জুবিন গার্গের ছবি অনেকটাই চে গুয়েভারার মতো দেখতে। মার্শাল বড়ুয়া এই বক্তব্য অস্বীকার করে বলেছেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নেই।

মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বশর্মা আরও বলেন, ভবিষ্যতে শিল্পীদের জন্য জুবিন গার্গের কেবল একটি অনুমোদিত প্রতিকৃতি ব্যবহারের নিয়ম করা প্রয়োজন। এই প্রতিকৃতিটি জুবিনের স্ত্রী গরিমা শইকিয়া গার্গ নির্ধারণ করবেন। গত জুন মাসে গুয়াহাটির গণেশগুড়ির উড়ালপুলে জুবিন গার্গের মূল ছবিটি রাজধানীর সৌন্দর্যবর্ধন অভিযানের অংশ হিসেবে মুছে ফেলা হয়েছিল। কারণ, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আসাম সফরের কথা ছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত সেই সফর হয়নি। এই ছবি মুছে ফেলা নিয়ে আসামে প্রবল ক্ষোভ তৈরি হয় এবং পরবর্তী সময়ে মূল শিল্পী মার্শাল বড়ুয়া সেখানে জুবিনের আরেকটি নতুন ছবি আঁকেন।