
ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তিন সদস্য নিয়োগসংক্রান্ত আইনের সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নটি বিবেচনার জন্য পাঠানো হলো সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে। কারণ, এই মামলার রায় নিয়ে দুই বিচারপতি একমত হতে পারেননি। ফলে বিষয়টি বিবেচনার জন্য সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠনের সিদ্ধান্তের ভার বিচারপতি দীপংকর দত্ত ও বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মা প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।
এই সিদ্ধান্তটি এসেছে গত বুধবার। ওই দিন সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি গত ১০ মাসে ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন। এই প্রতিবেদন নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় হচ্ছে। বিরোধীরা একযোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা দাবি করেছে। ককরোচ জনতা পার্টি আজ বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে ৪৮ ঘণ্টা সময় দেওয়া হচ্ছে। পদত্যাগ না করলে তারা দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু করবে। দাবি উঠেছে, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে বিভিন্ন রাজ্যে যে অনাচার সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য জ্ঞানেশ কুমারকে শাস্তি দেওয়ারও। সাম্প্রতিক অতীতে যে রাজ্যগুলোতে ভোট হয়েছে তা বাতিল করার দাবিও জোরালো হয়ে উঠছে।
এই খবর নিয়ে দেশ জোড়া আলোড়নের মাঝেই বুধবার সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও দুই নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগসংক্রান্ত মামলা প্রধান বিচারপতির বিবেচনার জন্য পাঠিয়ে দেন। কিন্তু তার আগে বিচারপতি দীপংকর দত্ত ক্রিকেটের তুলনা টেনে বুঝিয়ে দেন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন হওয়াই যথেষ্ট নয়, কমিশন যে বাস্তবিকই নিরপেক্ষ তা দেখানোটাও জরুরি।
বিচারপতি দীপংকর দত্ত বলেন, ধরুন, ক্রিকেট খেলায় যারা ব্যাট করবে তারাই যদি আম্পায়ার ঠিক করে, তাহলে সন্দেহ তো থাকবেই। আম্পায়ার ঠিক সিদ্ধান্ত নিলেও তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহের মেঘ কাটবে না। সব সময়েই ধরে নেওয়া হবে, আম্পায়ার ওই টিমের প্রতিই ঝুঁকে থাকবেন। কেননা ব্যাটিং দল তাঁকে পছন্দ করেছে।
নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্যের নিয়োগসংক্রান্ত বিতর্কের জন্ম ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। তার আগে নির্বাচন কমিশনারদের নিযুক্ত করত কেন্দ্রীয় সরকার। যে কমিটি সেই দায়িত্ব পালন করত তাতে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দল নেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের ৫ সদস্যের কনস্টিটিউশন বেঞ্চ রায় দেন, কমিশনার নিয়োগ নিয়ে পার্লামেন্টে আইন তৈরি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনারদের নিযুক্ত করবে ওই তিন সদস্যের কমিটিই। সেই বছরেই নরেন্দ্র মোদি সরকার আইন পাস করে। তাতে প্রধান বিচারপতিকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়। সে জায়গায় আনা হয় প্রধানমন্ত্রী মনোনীত এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে। সরকার মনোনীত প্রার্থীর নিযুক্তি এর মধ্য দিয়ে নিশ্চিত করা হয়।
বর্তমানে যে তিনজন নির্বাচন কমিশনার রয়েছেন, জ্ঞানেশ কুমার, সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি, কিংবা তার আগের কমিশনাররা সবাই মোদি সরকারের মনোনীত। তাঁদের নিযুক্তির সময় বিরোধী নেতা হিসেবে প্রথমে কংগ্রেসের অধীর চৌধুরী, পরে রাহুল গান্ধী আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তা উপেক্ষিত হয়েছিল।
এই আইনের সাংবিধানিক বৈধতা ও নিয়োগপদ্ধতি নিয়েই সুপ্রিম কোর্টে মামলা করা হয়। সেই মামলা গত বুধবার পাঠানো হয় প্রধান বিচারপতির কাছে। বিচারপতি দীপংকর দত্ত ক্রিকেটের আম্পায়ার নিযুক্তির উদাহরণ দেখিয়ে এই পদ্ধতিরই বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেছেন, মামলার আবেদনকারীদের অভিযোগের ভিত্তি রয়েছে। কারণ, জ্ঞানেশ কুমারের আচরণ নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছেন অন্য দুই কমিশনার।
এই বিতর্কে মুখ খুলেছেন ভারতের তিন সাবেক মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি, অশোক লাভাসা ও ও পি রাওয়াত। তিনজনই গণমাধ্যমে নিজেদের মত প্রকাশ করে বলেছেন, কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার যেসব প্রশ্ন তুলেছেন তা গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেলে চলবে না। মুখ্য নির্বচন কমিশনারের উচিত প্রতিটি প্রশ্নের জবাব দেওয়া। তাঁরা বলেছেন, তিন কমিশনারের মধ্যে মতবিরোধ হয়ে থাকলে এবং তাতে নির্বাচনী ব্যবস্থা ক্ষুণ্ন হয়ে থাকলে বিষয়টি গুরুতর। এমন অবস্থা মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়। কমিশনকে প্রকাশ্যে এই সব বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। কারণ স্বচ্ছতাই নির্বাচন কমিশনের শক্তি ও সম্পদ।
কুরেশির প্রস্তাব, তিনজনেই সংবাদ সম্মেলন ডেকে প্রতিটি অভিযোগ খণ্ডন করুন। দুই কমিশনার সান্ধু ও যোশির উচিত সেখানে তাঁদের ভূমিকা ও অভিমত স্পষ্ট করা। এসআইআর নিয়ে ভুলভ্রান্তি ঘটে থাকলে তা শুধরে নেওয়া হোক। অশোক লাভাসা বলেন, এসআইআর নিয়ে কমিশন যা করেছে তাতে তাদের প্রতি জনগণের আস্থা নড়ে গেছে। সেই আস্থা ফিরে পাওয়া কঠিন। ও পি রাওয়াত বলেন, কমিশনের কাজ নিঃসন্দেহে বিতর্কিত। সিইসি নিজের ইচ্ছায় নিয়মনীতি বদলাতে পারেন না। ২০২৩ সালের কেন্দ্রীয় আইন অনুযায়ী মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় করা কোনো কাজ বা বক্তব্যের জন্য কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা করা যায় না। এই রক্ষাকবচ তাঁদের বেপরোয়া করে তুলেছে বলে বিরোধীদের ধারণা। কিন্তু তা সত্ত্বেও মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র বৃহস্পতিবার দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে এক অভিযোগপত্র জমা দেন। তাঁর দাবি, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তিনি যেসব কাজ করেছেন তাতে আইনি সুরক্ষা পেতে পারেন না।
ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছে ককরোচ জনতা পার্টিও। বৃহস্পতিবার দলের পক্ষে তিনটি দাবি জানানো হয়েছে। জ্ঞানেশের পদত্যাগ ও শাস্তি, এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল করে ২০২৫–এর পুরোনো ভোটার তালিকা অনুযায়ী নির্বাচন করা এবং ২০২৩ সালের আইন সংশোধন করে নিরপেক্ষ নিযুক্তি কমিটি গঠন। এই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে দেশব্যাপী গণ–আন্দোলন শুরু করা হবে।