ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদি
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদি

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি পণ্য কেনার শর্তেই কি ভারতের সঙ্গে চুক্তি

ভারত আগামী পাঁচ বছরে প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন (১০ হাজার কোটি) মার্কিন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে মূলত উড়োজাহাজ, প্রযুক্তিপণ্য, মূল্যবান ধাতু, তেল, পারমাণবিক পণ্য এবং কৃষিজাত পণ্য থাকবে। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’–এর এক প্রতিবেদনে এমনটা বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের এই আমদানির পরিমাণ গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। ২০২৫ অর্থবছরে ভারত ৪৫ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারের (৪ হাজার ৫৬২ কোটি ডলার) মার্কিন পণ্য আমদানি করেছিল। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি ছিল ৮৬ দশমিক ৫১ বিলিয়ন (৮ হাজার ৬৫১ কোটি) মার্কিন ডলার।

গত সোমবার ঘোষিত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ওয়াশিংটন ভারতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে এই শুল্কের পরিমাণ ছিল ৫০ শতাংশ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভারত জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য এবং কয়লাসহ অন্যান্য খাতে ৫০০ বিলিয়ন (৫০ হাজার কোটি) ডলারের বেশি মূল্যের মার্কিন পণ্য কিনবে।

সূত্রমতে, ভারত কৃষি খাতের অনেক পণ্য আমদানির সুযোগ দিলেও জেনেটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) পণ্য, সয়াবিন মিল, পোলট্রি, ভুট্টা ও শস্য–জাতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে সুরক্ষা বজায় রেখেছে। অর্থাৎ এসব পণ্য অবাধে আসতে দেবে না।

নির্দিষ্ট কিছু পণ্য যেমন তুলা, ডাল, কাঠবাদাম ও পেঁয়াজের ক্ষেত্রে কোটা–সুবিধা (নির্দিষ্ট পরিমাণ আমদানির সুযোগ) দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভারত আপেলের মতো কিছু পণ্যের বাজার উন্মুক্ত করেছে, যা আগে থেকেই অন্যান্য দেশের জন্য খোলা রয়েছে।

এর আগে নিউজিল্যান্ড থেকে আপেল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে কিউই ও নাশপাতি আমদানির সুযোগ দিয়েছিল ভারত। এ ছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে মদ ও স্পিরিটের বাজার উন্মুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল।

বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল গত মঙ্গলবার দাবি করেছেন, ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিতে কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের মতো সংবেদনশীল খাতগুলোকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনের কাছ থেকে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো যা পেয়েছে, ভারতের এই চুক্তি তার চেয়ে অনেক ভালো।

গোয়েল আরও দাবি করেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের কৃষক, পশুপালক ও দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন খাতের ব্যাপারে সব সময় উদ্বিগ্ন। তিনি কখনোই তাদের স্বার্থের সঙ্গে আপস করতে দেননি। এই মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিতেও কৃষি ও দুগ্ধ খাতকে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে।’

এর আগে মার্কিন কৃষিমন্ত্রী ব্রুক রলিন্স বলেন, এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশি কৃষিপণ্য ভারতের বিশাল বাজারে রপ্তানি হবে, যা পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করতে এবং মার্কিন গ্রামীণ অঞ্চলে অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে।

মার্কিন কৃষিমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বাণিজ্যের ঘাটতি ছিল ১৩০ কোটি ডলার। ভারতের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা মার্কিন পণ্যের জন্য একটি বড় বাজার। এই বাণিজ্য চুক্তি সেই ঘাটতি কমাতে অনেক দূর এগিয়ে নেবে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তারা এমন কোনো বাণিজ্য চুক্তি করবে না, যাতে ভারতীয় কৃষকদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।

গত বছরের ৭ আগস্ট ট্রাম্প যখন ভারতের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করেছিলেন, তখন মোদি বলেছিলেন, তিনি কোনো আপস করবেন না। এমনকি এর জন্য যদি ব্যক্তিগতভাবে বড় মূল্যও দিতে হয়।

ভারতের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে মোদি বলেছিলেন, ‘ভারতীয় কৃষক, মৎস্যজীবী ও পশুপালকদের কল্যাণ আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। ভারত কখনোই তাদের স্বার্থের সঙ্গে আপস করবে না।’

গত বছর ভারতীয় কৃষক আন্দোলনের সমন্বয় কমিটি (আইসিসিএফএম) কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি থেকে কৃষির সব দিক বাদ দিতে সরকারকে অনুরোধ করেছিল।

পীযূষ গোয়েলকে লেখা এক চিঠিতে আইসিসিএফএম সতর্ক করেছিল, চুক্তির আওতায় মার্কিন কৃষিপণ্যকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলে তার ফল ভয়াবহ হতে পারে। ২০১৮ সাল থেকে চীন, মেক্সিকো ও কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে মার্কিন কৃষি রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাতে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, তাদের কাছে অতিরিক্ত পণ্য জমে আছে, যা তারা ভারতের মতো বাজারে খালাস করতে চায়।’

চিঠিতে উদাহরণ দিয়ে উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন রপ্তানি ছিল ৩৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন (৩ হাজার ৪৪০ কোটি) ডলার, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন (২ হাজার ৪৫০ কোটি) ডলারে। একই সময়ে ভুট্টা রপ্তানি ১৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন (১ হাজার ৮৬০ কোটি) ডলার থেকে কমে ১৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন (১ হাজার ৩৯০ কোটি) ডলারে নেমে এসেছে।