
ভারতের অযোধ্যার ‘শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’ তৈরি হওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই একটি হিসাব নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান ট্রাস্টের চালচলনকে ‘অত্যন্ত অপেশাদার’ বলে উল্লেখ করেছিল। তারা জানিয়েছিল, অনুদান বা দানের অর্থের কোনো ‘সঠিক হিসাব বা রেকর্ড’ রাখা হচ্ছে না।
ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও দক্ষ ব্যবস্থাপনার জন্য সেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া ‘কাজের সুনির্দিষ্ট নিয়ম’ (এসওপি) তৈরির সুপারিশটি এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। আর এরই মধ্যে রামমন্দির কমিটির বিরুদ্ধে দানের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। একটি বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) মঙ্গলবার উত্তর প্রদেশ সরকারের কাছে এ বিষয়ে তাদের প্রাথমিক তদন্তের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
২০২০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’ গঠন করা হয়। এর পর থেকে এ পর্যন্ত এই ট্রাস্ট কেবল নগদ টাকা হিসেবেই আনুমানিক ৩ হাজার ৫০০ কোটি রুপি দান পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বাইরে গয়নাগাটির মতো অন্যান্য দান তো রয়েছেই।
২০২০ সালের নভেম্বরে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ট্রাস্টের দায়িত্ব ও জবাবদিহি ঠিক করার পরামর্শ দিয়েছিল। তারা বলেছিল, ‘অর্থের লেনদেন, তথ্যের হিসাব, কর্মী ও অন্যান্য জিনিসপত্র সঠিকভাবে চালানোর জন্য প্রতিটি স্তরে একটি সুনির্দিষ্ট কাজের নিয়ম (এসওপি) তৈরি করা দরকার।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আর্থিক হিসাবের জন্য কোনো ‘সঠিক রেকর্ড’ নেই। তারা বলেছিল, কাজকর্ম চালানোর জন্য কোন কর্মকর্তার কী দায়িত্ব, তা স্পষ্ট নয় এবং পুরো বিষয়টি খুবই অপেশাদার। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেতরের তথ্য নিয়ন্ত্রণ করা এবং একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা তৈরি করা কঠিন হবে।
এ বিষয়ে কথা বলতে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ট্রাস্টের অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাইয়ের কাছেও প্রশ্ন পাঠিয়েছিল, কিন্তু তাঁরা কোনো উত্তর দেননি।
ট্রাস্টের ওয়েবসাইটে এ ধরনের কোনো নিয়মকানুনের (এসওপি) উল্লেখ নেই। ভেতরের কোনো নিরীক্ষা প্রতিবেদনও সেখানে দেওয়া নেই।
অযোধ্যায় বিতর্কিত রামমন্দির নির্মাণের জন্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ২০২০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’ গঠন করা হয়। এর পর থেকে এ পর্যন্ত এই ট্রাস্ট কেবল নগদ টাকা হিসাবেই আনুমানিক ৩ হাজার ৫০০ কোটি রুপি দান পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বাইরে গয়নাগাটির মতো অন্যান্য দান তো রয়েছেই।
ট্রাস্টের ভেতরের কিছু সূত্র দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছে, ২০২০ সালের নভেম্বরে ট্রাস্টের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ওই নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে ‘ভেতরের হিসাব পরীক্ষা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’ বিষয়ে পরামর্শ দিতে বলেছিলেন।
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটি মন্দিরের তহবিল বা অর্থ-কড়ির হিসাব এবং তথ্য রাখার পদ্ধতিগুলো পরীক্ষা করে বেশ কিছু ত্রুটি খুঁজে পায়। তারা সম্ভাব্য বিপদের কথা তুলে ধরে তা সংশোধনের উপায় বাতলে দেয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, কাজকর্ম চালানোর জন্য কোন কর্মকর্তার কী দায়িত্ব, তা স্পষ্ট নয়। ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা খুবই অপেশাদার। আর্থিক প্রতিবেদনের জন্য (দানের) কোনো সঠিক রেকর্ড বা খাতা নেই। অর্থ লেনদেন বা কম্পিউটারে তথ্য তোলার পর তা দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার যাচাই করার কোনো ব্যবস্থা নেই।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছিল, একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম (এসওপি) থাকলে ‘সব স্তরে একটি গোছানো পরিবেশ তৈরি হবে, যা সব কর্মকর্তা মেনে চলতে বাধ্য থাকবেন।’ একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছিল, অপেশাদার কর্মী ও তথ্যের অব্যবস্থাপনার কারণে ভুলভাল প্রতিবেদন তৈরি হবে, যা বাকি কর্মী ও পরিচালকদের বিভ্রান্ত করবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, কাজকর্ম চালানোর জন্য কোন কর্মকর্তার কী দায়িত্ব, তা স্পষ্ট নয়। ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা খুবই অপেশাদার। আর্থিক প্রতিবেদনের জন্য (দানের) কোনো সঠিক রেকর্ড বা খাতা নেই। অর্থ লেনদেন বা কম্পিউটারে তথ্য তোলার পর তা দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার যাচাই করার কোনো ব্যবস্থা নেই। নির্দিষ্ট একটি কাঠামোর মাধ্যমে কার কী জবাবদিহি, তা ঠিক করতে হবে। কাজের সঠিক হিসাব ও ভালো ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিটি কাজের মধ্যে সমন্বয় থাকা খুবই জরুরি।
সম্প্রতি রামমন্দিরে দান করা গয়না এবং নগদ অর্থের হিসাব না মেলার অভিযোগ ওঠায় ট্রাস্টের কর্তারা বেশ চাপে পড়েছেন। ট্রাস্টের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি বলেন, ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষ যদি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটির সতর্কবার্তা আগেভাগে শুনত, তবে আজকের এই বিশৃঙ্খলা এড়ানো যেত।
প্রকৃতপক্ষে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গয়নার মতো অন্যান্য দানের অব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তারা পরামর্শ দিয়েছিল, একটি নির্দিষ্ট খাতা বা রেজিস্টার মেইনটেইন করে জিনিসপত্রের দানের হিসাব রাখা উচিত।
প্রকৃতপক্ষে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গয়নার মতো অন্যান্য দানের অব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তারা পরামর্শ দিয়েছিল, একটি নির্দিষ্ট খাতা বা রেজিস্টার মেইনটেইন করে জিনিসপত্রের দানের হিসাব রাখা উচিত।
‘তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের’ অধীন হাজার হাজার কর্মী কাজ করা সত্ত্বেও সেখানে কোনো সঠিক মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগ বা কর্মী উন্নয়ন শাখা না থাকায় নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বিস্ময় প্রকাশ করেছিল। সেই সঙ্গে ‘ব্যাংকের হিসাব মেলানো, হিসাবের তথ্য কম্পিউটারে তোলা এবং নিয়মিত প্রতিবেদনের জন্য যোগ্য কর্মী নিয়োগের’ তাগিদ দেওয়া হয়েছিল।
কম্পিউটারের তথ্য ব্যবস্থাপনা (ডেটা ম্যানেজমেন্ট) নিয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ‘যে আইটি কোম্পানি এই কাজ করছে, তাদের তথ্য সুরক্ষা, সার্ভার কিংবা তথ্য চুরির ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা কেমন, তার কোনো সঠিক রেকর্ড পাওয়া যায়নি...আইটি কোম্পানির ডেটা এন্ট্রি ও ডেটাবেজ এবং তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা তদারক করার মতো ট্রাস্টের নিজস্ব কোনো অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই নেই।’
আইটি প্রতিষ্ঠান ও ট্রাস্টের মধ্যে যোগাযোগ রাখতে ‘একজন যোগ্যকর্মী’ রাখার পরামর্শ দিয়ে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান বলেছিল, এতে সব স্তরে তথ্যের আদান-প্রদান নিয়মের মধ্যে থাকবে। তারা সতর্ক করে বলেছিল, কম্পিউটার ও তথ্য সুরক্ষার এই নিয়ম বা নিয়ন্ত্রণ না থাকলে, তথ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে এবং তথ্য চুরি বা ভুল তথ্য এন্ট্রির বড় ঝুঁকি থেকে যায়।