ভারতের পাসপোর্ট পেতে নাগরিকত্বসহ অনেক কিছু যাচাই করা হয়। তবু পাসপোর্ট থাকার অর্থ ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
ভারতের পাসপোর্ট পেতে নাগরিকত্বসহ অনেক কিছু যাচাই করা হয়। তবু পাসপোর্ট থাকার অর্থ ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

ভারতে তাহলে নাগরিকত্বের প্রমাণ কোন নথিপত্র

একমাত্র ভারতীয় নাগরিকেরাই ভারতীয় পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকারী, অথচ পাসপোর্ট নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের এই মন্তব্য ঘিরে গোটা দেশে নাগরিকত্ব নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।

বহু মানুষের প্রশ্ন, আধার কার্ড নাগরিকত্ব প্রমাণ করে না। রেশন কার্ড নয়। ভোটার কার্ডও নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে না। এখন বলা হচ্ছে পাসপোর্টও নয়। নাগরিকত্বের প্রমাণ তাহলে কী? অথচ আধার কার্ডে বড় বড় করে দিব্যি লেখা থাকে, ‘আমার আধার আমার পরিচয়’। পাসপোর্ট দেওয়ার আগেও নানাভাবে দেখা হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক কি না।

গতকাল বুধবার ১৪তম ‘পাসপোর্ট সেবা দিবস’ উপলক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাসপোর্ট হলো একটা ট্রাভেল ডকুমেন্ট বা বিদেশ ভ্রমণের নথি। এই নথি নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নাগরিকদের চিপনির্ভর নতুন পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। ব্যাখ্যা করা হয়, নতুন এই পাসপোর্ট কতটা গ্রহণযোগ্য, এই পাসপোর্ট নকল করা কতটা কঠিন।

পাসপোর্ট নিয়ে পররাষ্ট মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের পর বিতর্ক উঠেছে

তবে সেই সঙ্গে এ কথাও বলা হয়, পাসপোর্ট হলো একটি ভ্রমণ নথি। সেটা কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্ব প্রমাণ করে না। পাসপোর্ট হলো বিদেশে যাওয়া বা থাকার ক্ষেত্রে ভারতীয়দের জাতিগত পরিচয়ের নথি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই মন্তব্য ঘিরে নতুনভাবে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কোন সরকারি নথি ব্যক্তিবিশেষের নাগরিকত্বের পরিচয় প্রমাণ করবে? বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) সময় নির্বাচন কমিশনের ওই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা রুজু হয়েছে।

কে নাগরিক কে নন, তার প্রমাণে আরও অনেক কিছুর মধ্যে পাসপোর্টকেও কমিশন মান্যতা দিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টও কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আধার কার্ডকে বৈধতা দিতে। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কেন হঠাৎ কেন্দ্রীয় সরকার বলছে পাসপোর্ট নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়?

ভারতে পাসপোর্ট দেওয়া হয় শুধু নাগরিকদের। তার আগে বহু নথি যাচাই করা হয়। পুলিশি তদন্তও হয়। ১৯৬৭ সালের পাসপোর্ট আইনে বলা হয়েছে, ভারতীয় নাগরিক না হলে কেউ ভারতীয় পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকারী হবেন না। তাহলে কেন ওই নথি নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে গ্রাহ্য হবে না?

তাহলে কি ধরে নিতে হবে, সরকার এমন লোকেদেরও পাসপোর্ট দিয়েছে বা দিচ্ছে, যাঁরা নাগরিক নন? কিংবা যাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে সরকার নিশ্চিত নয়
জাভেদ আখতার, বিশিষ্ট চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার

শিবসেনা নেতা আদিত্য ঠাকরে সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে জানতে চেয়েছেন, এত কিছু যাচাইয়ের পর শুধু নাগরিকদেরই পাসপোর্ট দেওয়া হয়। সেটাই যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতীয়দের অবস্থান ও পাসপোর্টের মর্যাদা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করবে।

বিশিষ্ট চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার জাভেদ আখতার ‘এক্স’ হ্যান্ডলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা ‘অযৌক্তিক’ জানিয়ে লিখেছেন, ‘তাহলে কি ধরে নিতে হবে, সরকার এমন লোকেদেরও পাসপোর্ট দিয়েছে বা দিচ্ছে, যাঁরা নাগরিক নন? কিংবা যাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে সরকার নিশ্চিত নয়?’

পাসপোর্টের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সূক্ষ্ম পার্থক্য তুলে ধরছে। বলা হচ্ছে, একমাত্র নাগরিকদের পাসপোর্ট দেওয়া হলেও যদি জানা যায় কেউ ভুয়া তথ্য দাখিল করে তা পেয়েছেন, তাহলে সরকার তা বাতিল করতে পারে। সেই অধিকার সরকারের হাতে রয়েছে। সেই কারণে প্রতিটি পাসপোর্টে লেখা থাকে, ‘ভারত সরকারের সম্পত্তি। সরকার নির্দেশ দিলে ফেরত দিতে হবে।’

অর্থাৎ সরকার বোঝাতে চাইছে, একমাত্র নাগরিকেরাই পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু পাসপোর্ট থাকার অর্থ নাগরিকত্ব নয়।

এসআইআর মামলার সময় সুপ্রিম কোর্টেও এসব বিষয় উঠেছিল। নির্বাচন কমিশন বলেছিল, ভুয়া তথ্য দিয়ে আধার কার্ড পাওয়া যায়। ভোটার কার্ড তৈরি করা যায়। রেশন কার্ডও পাওয়া যায়। কমিশনের তালিকায় গ্রহণযোগ্য প্রমাণের মধ্যে পাসপোর্টও ছিল। জমির বাড়ির দলিল ছিল। জন্মের সার্টিফিকেট ছিল।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা কমিশনকে পাল্টা বলেছিলেন, এ দেশে সব নথিই জাল করা যায়। সেই মামলায় ভোটারদের ক্ষেত্রে আধার কার্ডকে মান্যতা দিতে সুপ্রিম কোর্ট কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

প্রশ্ন হলো, তাহলে নাগরিকত্বের প্রমাণ কী কী? অন্য অনেক দেশের মতো এ দেশে শিশুর জন্মের সময় ‘নাগরিকত্ব কার্ড’ দেওয়া হয় না। ২০২০ সালে এই বিষয়টি সংসদে উঠেছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আধার, পাসপোর্ট, রেশন কার্ড, প্যান কার্ড, জন্মসনদের মধ্যে কোনটি নাগরিকত্বের প্রমাণ? উত্তরে সরকার জানিয়েছিল, নাগরিকত্ব নির্ধারিত হয় ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী।

যাঁরা জন্মসূত্রে নাগরিক, তাঁদের ক্ষেত্রেও অনেক ভিন্ন ভিন্ন প্রমাণ দাখিল করতে হয়। যেমন, যাঁরা ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে জন্মেছেন তাঁরা জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক গণ্য হবেন। সে ক্ষেত্রে তাঁদের জন্মসনদ জরুরি।

১৯৮৭ সালের ২ জুলাই ও ২০০৪ সালের ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে যাঁরা জন্মেছেন, তাঁদের নিজেদের জন্মসনদ ছাড়াও মা–বাবার যেকোনো একজনকে ভারতীয় নাগরিক হতে হবে। সেই সনদ দাখিল করতে হবে।

মোদি সরকার বলে দিয়েছে, আধার কার্ড ভারতীয় নাগরিত্বের প্রমাণ নয়

২০০৪ সালের ৩ ডিসেম্বরের পরে যাঁরা জন্মেছেন তাঁদের মা–বাবা দুজনই ভারতীয় নাগরিক হলে সদ্যোজাতকে জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক বলে গণ্য করা হবে। এসব ক্ষেত্রে মা–বাবা দুজনের জন্মসনদ জরুরি।

যাঁদের জন্মসনদ নেই তাঁদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব প্রমাণে অন্য অনেক নথি রাখা হয়েছে। যেমন মা–বাবার জন্মসনদ, স্কুলে পড়ার নথি, জমি–বাড়ির দলিল, সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির নথি ইত্যাদি। মুশকিল হলো, যা কিছু নথি চাওয়া হয়েছে প্রতিটিই কোনো না কোনোভাবে নকল করা যায়। সুপ্রিম কোর্টও মামলা চলাকালে নথি নকলের বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন।

কেন্দ্রীয় সরকারে বিজেপি আসার আগপর্যন্ত ভারতীয় নাগরিকত্বের বিষয়টি একটি ধারণা ও পাসপোর্ট, আধার কার্ড, রেশন কার্ড, ভোটার কার্ডের মতো কিছু প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়েছিল। ধারণাটি ছিল, বিতর্ক তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ওইসব মানুষ নাগরিক হিসেবে পরিগণিত। আসামে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি তৈরির উদ্যোগ থেকে যে বিতর্কের শুরু, ক্রমেই তা জটিল হয়ে ওঠে নির্বাচন কমিশনের এসআইআরকে ঘিরে। সবকিছু প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কমিশনের চোখে সন্তোষজনক না হওয়ায় বহু মানুষকে নাগরিকত্ব প্রমাণে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের পর যে ২৭ লাখ মানুষের ভোটাধিকার এখনো ফেরানো হয়নি, বিজেপি সরকার তাঁদের রেশন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলাকারীরা সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলেন। সর্বোচ্চ আদালত তাঁদের হাইকোর্টে যেতে বলেছেন।

পাসপোর্ট নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য আইনের চোখে যাই হোক, নাগরিকত্ব নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। তুলে দিয়েছে নানা প্রশ্ন। নানা বিভ্রম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ নিয়ে সরগরম।