
ভারতে স্বাধীনতা দিবসের দিন থেকে দেশে নতুন আন্দোলনের ডাক দিয়েছে তেলাপোকাদের দল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। আন্দোলনের নাম ‘স্কুল ঠিক করো’। দেশের গ্রাম–গঞ্জের সরকারি স্কুলগুলোর বেহাল অবস্থা ফেরাতে রাজ্যে রাজ্যে সিজেপি যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তাতে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে জেন–আলফাও।
উত্তর প্রদেশের রাজধানী লখনৌয়ে যারা ২০১০ এর পর জন্মেছে এমন কয়েক শ স্কুলশিক্ষার্থী গতকাল সোমবার রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। জয়প্রকাশ নারায়ণ সর্বোদয় বালিকা বিদ্যালয়ের ১২ থেকে ১৪ বছরের ওইসব কচিকাঁচার দাবি, স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ করা হোক। দীর্ঘদিন ধরে পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও ইতিহাসের শিক্ষক না থাকায় তারা পড়তে পারছে না। জেন–জির পাশাপাশি জেন–আলফার আন্দোলন বিভিন্ন রাজ্য সরকারকে তটস্থ করে তুলেছে।
‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলন শুরুর সময় সিজেপির আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে এক ভিডিও প্রকাশ করেন। তাতে দেখা যায়, মহারাষ্ট্রে তাঁর জেলা সদর ছত্রপতি শম্ভাজিনগরের প্রতিটি রাস্তা মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিশের বিজ্ঞাপনী হোর্ডিংয়ে বোঝাই।
অভিজিতের দাবি, আত্মপ্রচারে ওই অর্থহীন অপচয় না করে ওই টাকায় সরকারি স্কুলের অবকাঠামো ঠিক করা হোক। শিক্ষক নিয়োগ করা হোক। এই আন্দোলনই তেলাপোকারা এখন শুরু করেছে। উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানসহ বিভিন্ন রাজ্যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে।
জেন–জিদের এই আন্দোলন ঠেকাতে রাজস্থান সরকার উঠেপড়ে লেগেছে। বিজেপিশাসিত এই রাজ্যের সরকার সম্প্রতি এক নির্দেশিকা জারি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো সরকারি স্কুলে বহিরাগতরা ঢুকতে পারবে না। ছবি তুলতে বা ভিডিও করতে পারবে না। স্কুল নিয়ে কোনো রকম প্রচার করতে পারবে না। ছাত্র–ছাত্রীদের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত পরিসর অক্ষুণ্ন রাখা সরকারের দায়িত্ব।
রাজস্থান সরকারের ওই নির্দেশিকা অন্যান্য রাজ্যেও বলবৎ হলে সিজেপি কী করবে, তা এখনো জানা যায়নি। যদিও সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেছেন, স্কুল বন্ধ না করে রাজ্য সরকার বরং স্কুল মেরামতের দিকে নজর দিক। নইলে স্কুল পড়ুয়ারাই তাদের দুরবস্থার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেবে। তারাই জনমত গড়ে তুলবে।
লখনৌয়ে জেন–আলফা যা করেছে, রাজ্যের বিভিন্ন শহরে কয়েক দিন ধরে সরকারি স্কুলের পড়ুয়ারা তা করে চলেছে। রাজস্থানের সরকারি স্কুলের পড়ুয়ারাও তেমনই করবে বলে সিজেপির দাবি।
সিজেপির আন্দোলনে উজ্জীবিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারা নানা ধরনের আন্দোলনে শামিল হচ্ছেন। ঝাড়খন্ডে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ইন্ডিয়া জোট সরকারও মাথা নুইয়েছে। পড়ুয়াদের দাবি মেনে নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা গত তিন সপ্তাহ ধরে সেখানে আন্দোলন করছিলেন। সরকারের শরিক দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী সেই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। দুদিন আগে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধও জানান। তারপরেই গত সোমবার রাতে মুখ্যমন্ত্রী ওই ঘোষণা দেন।
স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, যন্তর মন্তর আন্দোলনের ঢেউ রাজ্যে রাজ্যে সংক্রমিত হচ্ছে।
এই আন্দোলনের ফলেই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত হায়দরাবাদের ন্যাশনাল একাডেমি অব লিগ্যাল স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চের (নালসার) সমাবর্তনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গত সোমবার গণমাধ্যমকে তিনি জানান, নালসারের আমন্ত্রণপত্র তিনি গ্রহণই করেননি। কাজেই সমাবর্তনে যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।
বিতর্কের শুরু চার দিন আগে। নালসার কর্তৃপক্ষ বার্ষিক সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তকে। তাঁর হাত দিয়েই ২০২৬ সালের স্নাতকদের ডিগ্রি দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এতে বেঁকে বসেন প্রতিষ্ঠানের স্নাতক ও শিক্ষকদের একাংশ।
শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে চিঠি লিখে বলেন, যিনি পড়ুয়াদের ওপর অত্যাচারের ভিডিও দেখতে চাননি, সময় নেই বলে তাৎক্ষণিকভাবে মামলা শুনতে চাননি, আদালতের সময় নষ্ট না করার নিদান দিয়েছিলেন, তাঁর হাত থেকে তাঁরা স্নাতক ডিগ্রি নেবেন না।
শিক্ষার্থীদের ওই চিঠির কথা জানাজানি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান বিজেপির রাজ্যসভা সদস্য মননকুমার মিশ্র নালসার কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখে বলেন, তাঁদের অনুমোদন ছাড়া নালসার থেকে পাস করা ২০২৬ সালের আইন পরীক্ষার স্নাতকেরা কোনো রাজ্যে নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন না।
ওই ফরমান জারির সঙ্গে সঙ্গে সিজেপি নেতারা প্রতিবাদ জানান। অভিজিৎ দিপকে ‘এক্স’ হ্যান্ডলে আইনি তেলাপোকাদের একজোট হওয়ার হুমকি দেন। সিজেপি মুখপাত্র সৌরভ দাস বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের (বিজেপি সাংসদ) কথা জানিয়ে দেন।
চার ঘণ্টার মধ্যে মননকুমার মিশ্র তাঁর নির্দেশ প্রত্যাহার করে নেন। ১৮ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে চিঠি লেখেন। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব নতুন করে তেলাপোকাদের রোষে পড়তে চাইছে না। শিক্ষার্থীদের সমীহ করছে।
নালসারের শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল বেঙ্গালুরুর শীর্ষস্থানীয় ন্যাশনাল ল স্কুল অব ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি। তাদের শিক্ষার্থী ও অধ্যাপকেরা চিঠি লিখে নালসারের পড়ুয়াদের দাবি সমর্থন করেন। এরপরেই সমাবর্তনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন প্রধান বিচারপতি।
এর রেশ পড়েছে মহারাষ্ট্রের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সের (টিস) ওপর। এই সংস্থার বার্ষিক সমাবর্তনেও প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তকে। পরে সমাবর্তনের দিন পরিবর্তন করা হয়।
গত সোমবার জানানো হয়, ২২ আগস্ট সমাবর্তন অনুষ্ঠান। কিন্তু তাতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালের পরিচালক সি এস প্রমেশ। কী কারণে সূর্যকান্তকে বাদ দেওয়া হলো, টিস কর্তৃপক্ষ তা জানায়নি। যদিও প্রতিষ্ঠান সূত্রের খবর, ছাত্রবিক্ষোভ এড়াতেই ওই সিদ্ধান্ত।
জেন–জি ও জেন–আলফা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে স্বাধীনতা দিবসের দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘দিমাগি নকশাল’ থেকে যুব সম্প্রদায়কে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন, নকশাল মানসিকতাসম্পন্ন নাকি বুদ্ধিমান নকশাল, কাদের তিনি চিহ্নিত করতে চেয়েছেন, তার কোনো ব্যাখ্যা মোদি দেননি।
এর আগে মোদির কথায় ‘আরবান নকশাল’ এসেছে। ‘খান মার্কেট গ্যাং’ বলে শিক্ষিত বিরোধীদের চিহ্নিত করেছেন। দেশবিরোধীদের ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ বলেছেন। বিক্ষোভকারীদের ‘আন্দোলনজীবী’ বলেছেন। এবার বললেন ‘দিমাগি নকশাল’।
এ নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপান–উতোর। কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম, আপ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি প্রকাশ্যেই নিজেদের ‘দিমাগি নকশাল’ বলে জাহির করেছেন। এ নিয়ে বিজেপির সঙ্গে বিরোধীদের রাজনৈতিক কাজিয়া অব্যাহত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরব হয়েছে তেলাপোকারা। সিজেপি মুখপাত্র সৌরভ দাস মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে তেলাপোকাদেরই চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। ‘এক্স’ হ্যান্ডলে এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি লিখেছেন, ‘শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়কে এত সহজে কী করে নকশাল বলে দাগাতে পারলেন? তারা আপনার সরকারকে প্রশ্ন করছে বলে? স্রেফ এই কারণে? এ তো চরম ঔদ্ধত্য? সমস্যার সমাধানে চরম অযোগ্যতা?’
এরপরেই প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে সৌরভ লিখেছেন, ‘শুনুন, দিমাগি নকশাল বলুন বা অন্য কিছু, তাতে আর কাজ হবে না। ঘণ্টা বেজে গেছে। সবাই জেগে গেছে।’
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও তেলাপোকাদের কর্মসূচি ক্রমেই বিজেপি–বিরোধিতায় পরিণত হতে চলেছে।