ভারতে বিজেপি সরকারের বিরোধীরা যন্তর মন্তর অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। আজ বুধবারও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে দফায় দফায় যন্তর মন্তর অভিমুখে মিছিলে শামিল হন বাম ও কংগ্রেসের ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতা–কর্মীরা। পুলিশ অবশ্য কাউকেই বেশি দূর এগোতে দেয়নি। বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে।
সিপিএমের ছাত্রসংগঠন এসএফআই ও যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআইয়ের মিছিল আজ দুপুরে ফিরোজ শাহ রোড থেকে শুরু হয়। প্রায় একই সময় কংগ্রেসের ছাত্র ও যুব সংগঠন এনএসইউআই ও যুব কংগ্রেসের কর্মীরা আচমকা মিছিল শুরু করেন যন্তর মন্তরের অদূরে প্যাটল চক মেট্রোস্টেশনের সামনে থেকে। কিছুটা এগোতেই পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার কাছে পুলিশ মিছিলকারীদের পথ রোধ করে। বেশ কিছুক্ষণ দুপক্ষে ধস্তাধস্তি চলে। তারপর তাঁদের বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয়। ফিরোজ শাহ রোড থেকে আটক করা হয় সিপিএমের রাজ্যসভার সদস্য ভি শিবদাসনকে।
ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনের (এসআইআর) নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রী মোদির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সুবিধা হচ্ছে। এ কারণে বিরোধীরা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন।
এসআইআরের নামে ভারতে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে মুসলিমরাও রয়েছেন। এই প্রক্রিয়ায় কারিগরি ত্রুটি এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে দুজন সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের নেওয়া একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। ভারতের নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপরই কংগ্রেস, সিজেপিসহ বিরোধীরা সিইসির পদত্যাগের দাবিতে টানা আন্দোলনের ডাক দেয়।
সিইসি জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে কংগ্রেস রাজধানী দিল্লির বহু স্থানে হোর্ডিংও টাঙিয়েছে। স্পষ্টতই, কংগ্রেস এই লড়াই সর্বাত্মক করতে চাইছে।
আজ ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) দুই নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে ৫ দিনের জেল হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। গত মঙ্গলবার তাঁদের যন্তর মন্তর থেকে আটক করা হয়েছিল। দিল্লি পুলিশের আরজি মেনে মন্দির মার্গ থানা এলাকার ম্যাজিস্ট্রেট এই সিদ্ধান্ত নেন। দুই নেতাকে তিহার জেলে আলাদা সেলে রাখা হয়েছে। পুলিশের আরজি ছিল, ওই নেতারা মুচলেকা অমান্য করে যন্তর মন্তরে ঢুকেছেন। শান্তি ভঙ্গ করেছেন। তাঁদের ছেড়ে দিলে আবার তাঁরা অশান্তি সৃষ্টি করবেন।
দিল্লি প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত ইন্ডিয়া জোট ও সিজেপিকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে সিজেপি ও ইন্ডিয়া জোটের আলাদা আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠছিল। আশুতোষ ও সৌরভকে কারাগারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত জানাজানি হওয়ার পর কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী আজ সকালেই সরকার ও দিল্লি পুলিশের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘যন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা ওড়ানো কোনো অপরাধ নয়। সে জন্য তরুণদের কারাগারে পাঠানো কাপুরুষতার লক্ষণ।’
এই মন্তব্যের সঙ্গেই রাহুল বলেন, ‘ছাত্র , তরুণ, সাংবাদিক, ইন্ডিয়া জোট—প্রত্যেকের ব্যানার আলাদা হতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক এবং অভিন্ন।’
দলীয় নেতাদের কারা হেফাজতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছেন সিজেপি আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকেও। আজ সকালেই নাগপুর থেকে এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘ওদের অপরাধ কী? যন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা ওড়ানো?’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীজি, একটু সাহস দেখান। এভাবে ভিন্নমত দমাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলে বরং জরুরি অবস্থা জারি করে দিন। কাপুরুষের মতো কৌশলের আড়ালে লুকোনোর দরকার নেই।’
লক্ষণীয়, রাহুল ও অভিজিৎ দুজনেই একই দিনে একই সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদিকে কাপুরুষ বললেন। দুজনেই জানালেন, তাঁদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক। রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, দুপক্ষ ক্রমশই কাছাকাছি আসছে।
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আজ সিজেপি নেতাদের কারাগারে পাঠানোর নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদের দিদি তোমাদের সঙ্গে আছে। চিরকাল থাকবেও।’
গত মঙ্গলবার নিজের বাসভবনে চা চক্রে ইন্ডিয়া জোটের নেতাদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, আন্দোলনকর্মী, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতা–নেত্রীদেরও রাহুল আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বামপন্থী নেত্রী নেহা বোরা ও ঐশী ঘোষেরা সেখানে গিয়েছিলেন। সেই আমন্ত্রণপত্রেই রাহুল জানিয়েছিলেন, ‘আমাদের সবার লক্ষ্য এক। উদ্দেশ্য এক। আন্দোলন এক।’ তিনি বলেন, ‘যন্তর মন্তর এ দেশের জনগণের। আমরা তা উদ্ধার করব।’
নাগপুর থেকে অভিজিৎ আজ দুপুরেই দিল্লি আসেন। নাগপুর থেকেই তিনি সরকারের সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছিলেন। দিল্লি এসেও বলেন, ‘আশুতোষ ও সৌরভ যন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা তোলার অপরাধে জেলে গেলেন। ব্রিটিশ আমলে ঠিক এমনটাই হতো। আজ নরেন্দ্র মোদি ঠিক সেই কাজ করছেন।’
উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য যখন এক, তখন সিজেপি ও ইন্ডিয়া জোট কেন আলাদা আলাদা আন্দোলন করছে, এই প্রশ্ন আজ নাগপুরে অভিজিৎকে করা হয়েছিল। সিজেপি আহ্বায়ক উত্তরে জানান, ‘আমাদের সবার লক্ষ্য এক। উদ্দেশ্যও এক। আমরা জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। কেননা, ওই ব্যক্তি ভোট চুরি করে নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতায় থাকতে সাহায্য করছেন।’
কেন তাঁরা একযোগে সেই লড়াই লড়ছেন না, সেই ব্যাখ্যায় অভিজিৎ বুঝিয়ে দেন, ইন্ডিয়া জোটের চরিত্র রাজনৈতিক। তাঁদেরটা আলাদা। তিনি বলেন, ‘সিজেপি রাজনৈতিক দল নয়। আমরা নিরপেক্ষ প্রেশার গ্রুপ। সিজেপি সব সময় এমনই থাকবে। কিন্তু এর অর্থ এমন নয়, আমরা ইন্ডিয়া জোটের বিরুদ্ধে।’
আজ রাহুল জনপথে সোনিয়া গান্ধীর বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে হাজির করেন পুলিশের হাতে নির্যাতিত কয়েকজন তরুণ–তরুণীকে। জ্ঞানেশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেওয়া পুলিশ তাঁদের আটক করে কীভাবে অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছে, তাঁরা একে একে সেই বিবরণ দেন।
রাহুল তাঁদের বলেন, অত্যাচারের প্রতিটি ভিডিও, প্রতিটি প্রমাণ তাঁরা যেন রেখে দেন। প্রতিটি প্রমাণ যেন তাঁর কাছে পাঠানো হয়। রাহুল বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য আজ হোক কাল হোক, পূরণ হবেই। তারপর উঁচু থেকে নিচুতলা পর্যন্ত প্রত্যেককে তাঁদের কৃতকর্মের জন্য ফল ভোগ করতে হবে। মোদি–শাহ–জ্ঞানেশ থেকে শুরু করে নিচুতলার পুলিশ—কেউ পার পাবেন না। শাস্তি সবাইকে পেতে হবে।’