নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ
নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ

ধর্মেন্দ্র প্রধানের খুঁটির জোর কোথায়, মোদি সরকার কেন তাঁকে বরখাস্ত করছে না

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রীকে ছেঁটে ফেললে আন্দোলনরত ছাত্রসমাজ যদি শান্ত হয়, তিনি পদত্যাগ করলে বিরোধীরা যদি সংসদ সচল রাখে, তাহলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তা মানতে অসুবিধা কোথায়? কেন এই দাবি, যা ছাত্রসমাজ এক মাস ধরে জানিয়ে আসছে, বিরোধীরাও যে দাবিতে সরব হয়েছে, সেটা মানতে প্রধানমন্ত্রীর এত অনীহা কেন? কেন সরকার এই সমঝোতায় রাজি নয়?

এই প্রশ্নই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে। আলোচিত হচ্ছে ধর্মেন্দ্র প্রধানের গুরুত্ব নিয়ে। কী এমন শক্তি তাঁর, কেন তিনি এত অপরিহার্য যে তাঁকে অপসারণের দাবি সরকার মানতে চায় না? বিষয়টি একটু খতিয়ে দেখা যাক।

নরেন্দ্র মোদি সরকারের বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম হলো কোনো রকম চাপের কাছে মাথা না নোয়ানো। এই ১২ বছরের শাসনে মোদি সরকারকে সবচেয়ে বেশি বিব্রত করেছে কৃষি আইন। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে তিনটি কৃষি আইন পাস করিয়েছিল মোদি সরকার। কিন্তু দেশজুড়ে লাগাতার আন্দোলন ও দিল্লির সীমান্ত অবরোধের কারণে ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তা প্রত্যাহার করে নেন।

এই একটি মাত্র নিদর্শন ছাড়া সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অন্য যেসব আন্দোলন হয়েছে, যেমন সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ খারিজ, সিএএ, এনআরসি কিংবা সর্বশেষ ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন—কোনো সিদ্ধান্ত থেকেই সরকার পিছিয়ে আসেনি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং তাঁদের দাবি নিয়েও তাই আগ্রহ জমছে। জল্পনা শুরু হয়েছে ধর্মেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে।

এই সরকারের বৈশিষ্ট্য নিয়ে ২০১৫ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এক মন্তব্য করেছিলেন। ললিত মোদি বিতর্ক নিয়ে মন্তব্য করার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘এটা এনডিএ সরকার, ইউপিএ সরকার নয়। এখানে বিরোধীরা চাইলেই কাউকে পদত্যাগ করানো হয় না।’

সেই থেকে বারবার দেখা গেছে, বিরোধীদের দাবি নিয়ে সরকার আলোচনায় রাজি হয়েছে, তদন্তে রাজি হয়েছে, হয়তো নানা রকম ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু একবারের জন্যও কোনো মন্ত্রীকে বরখাস্ত করা হয়নি।

রেল দুর্ঘটনার জন্য রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণোকে পদত্যাগ করানো যায়নি। এপস্টিন ফাইলে নাম থাকার দরুন হরদীপ সিং পুরিকে ছেঁটে ফেলা হয়নি। মন্ত্রিসভায় রদবদল ঘটানো হয়েছে বিজেপির শর্তে, বিজেপির পক্ষে উপযুক্ত সময়ে, বিরোধীদের দাবির মুখে নয়।

শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতি ও নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও তাঁদের দাবি মেনে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ছেঁটে ফেললে তাই সেটা হবে মোদি সরকারের চরিত্রবিরোধী। সরকার এখনো এই দাবির মুখে ঝুঁকতে নারাজ। ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বরখাস্ত করে সরকার সংকট মোচনে উদ্যোগী হলে বুঝতে হবে, প্রধানমন্ত্রী দুর্বল হয়ে গেছেন। অন্যান্য ক্ষেত্রেও এটাই হয়ে দাঁড়াবে বিরোধীদের হাতিয়ার। সংগত কারণেই মোদি চান না নিজেকে দুর্বল প্রতিপন্ন করতে।

ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান

ধর্মেন্দ্র প্রধান ওডিশার রাজনীতিবিদ। তিনি শুধু শিক্ষামন্ত্রীই নন, তিনি মোদি-শাহর অতি ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সঙ্গী ও রাজনৈতিক কুশলী। কয়েক বছর ধরে মোদি-শাহর নির্বাচনী কৌশল রূপায়নের অন্যতম প্রধান কারিগর তিনিই। ওডিশায় দীর্ঘ আড়াই দশকের বিজু জনতা দলের (বিজেডি) মৌরসিপাট্টার অবসান বিজেপি ঘটিয়েছে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সামনে রেখেই।

ওডিশার পর বিহার, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশেও ধর্মেন্দ্রই ছিলেন মোদি-শাহর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ভোট-কুশলী। এটা তাঁর সবচেয়ে শক্তি। তাঁকে অপসারণের অর্থ শুধু একজন শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া নয়, এক অতি বিশ্বস্ত অনুচরকে শাস্তি দেওয়া। সেই ঝুঁকি মোদি-শাহ নিতে চান না। এটা দ্বিতীয় কারণ।

তৃতীয়ত, ধর্মেন্দ্র প্রধানকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ হবে সরকারি ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়া। ছাত্রসমাজ ও বিরোধীরা নিট নিয়ে যে দাবি জানিয়ে চলেছে, তা শুধু একটি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দুটি সরকারি প্রকল্পও। প্রথমটি ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষা নীতি (এনইটি) ও দ্বিতীয়টি ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)। এনটিএ করা হয়েছিল প্রবেশিকা পরীক্ষা কেন্দ্রীভূত করার উদ্দেশ্যে।

যখনই প্রশ্নপত্র ফাঁস বা দুর্নীতি–সংক্রান্ত অভিযোগ উঠেছে, তখনই সরকার পরীক্ষা বাতিল করেছে, তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে, সিবিআই বা বিশেষ দল গড়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কিংবা শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু কখনো শিক্ষামন্ত্রীকে দায়ী করেনি। সরকারও দায় নেয়নি। কাজেই ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অপসারণ করলে অন্য বার্তা দেওয়া হবে—রাজনৈতিক ব্যর্থতা স্বীকার করা হবে, দুর্বলতা প্রকাশ করা হবে। সরকার তাতে নারাজ।

চতুর্থত, ধর্মেন্দ্র প্রধান হলেন পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রধান অনগ্রসর নেতা। ওডিশা ও বিহার জয়ে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ব্রাহ্মণ্যবাদী বিজেপির বহর ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ মারফত ভারতের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে অনগ্রসর যেসব নেতার অবদান অনস্বীকার্য, ধর্মেন্দ্র প্রধান তাঁদের অন্যতম। পূর্ব ভারতের অ-যাদব অনগ্রসর ও অতি অনগ্রসরদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারে ধর্মেন্দ্রর ভূমিকা ও অবদান কতটা, মোদি-শাহর তা জানা।

ধর্মেন্দ্রকে অপসারণের অর্থ হবে সব দায় ধর্মেন্দ্রর ঘাড়ে চাপানো এবং অনগ্রসর সমাজকে আহত করা। তাতে দেশের পূর্বাঞ্চলে অনগ্রসর ও অতি অনগ্রসরদের মধ্যে বিজেপির জনপ্রিয়তা নষ্ট হবে। গ্রহণযোগ্যতা কমে যাবে। সামাজিক মেরুকরণ নষ্ট হবে। সেই ঝুঁকি মোদি নিতে নারাজ।

পঞ্চমত, নরেন্দ্র মোদির বিজেপি মনে করে, মন্ত্রিসভায় কে থাকবেন, কে বাদ যাবেন, তা পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত। বিরোধীরা বা অন্য কেউ তা ঠিক করতে পারে না। সরকারকে বাধ্য করতে পারে না। ছাত্রসমাজ সেই দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে। কংগ্রেসসহ সব বিরোধী দলও এই আন্দোলন ও শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণের দাবি সমর্থন করছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড়। নাগরিক সমাজেও ক্ষোভ বাড়ছে।

এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রীকে ছেঁটে ফেললে এটাই প্রমাণ হবে, লাগাতার আন্দোলন মন্ত্রিসভায় বদল ঘটাতে পারে। দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করানো যায়। বিজেপি এটা হতে দিতে চায় না। তারা মনে করে আন্দোলন করা যায়, বিক্ষোভও দেখানো যায়। কিন্তু কে মন্ত্রী থাকবেন, কে থাকবেন না, সরকারের নীতি কী হবে—তা বিরোধীরা ঠিক করতে পারে না।

তবে এর অর্থ এই নয়, ধর্মেন্দ্র প্রধান এমনই অপরিহার্য থাকবেন। যে যা–ই করুক, শেষ পর্যন্ত তিনি মন্ত্রী থাকবেনই। এখন পর্যন্ত মোদি-শাহ শিক্ষামন্ত্রীর পাশে রয়েছেন। কিন্তু ঘটনাবলি হাতের বাইরে চলে গেলে সরকার মাথা নোয়াতে বাধ্য হতেই পারে।

কৃষকেরা এক বছর পর সফল হয়েছিলেন। মোদিকে আইন প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা মাত্র দুটি মাস কাটিয়েছেন। বিরোধীরা তাঁদের সমর্থনে দাঁড়িয়েছেন মাত্র দুই দিন আগে। এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি ও বিরোধীদের জোটবদ্ধতা ঠিক করবে, কী হবে।

যদি দেখা যায়, দাবি শুধু ধর্মেন্দ্র প্রধানকে কেন্দ্র করেই, তাঁকে সরালে বিক্ষোভ মিটে যাবে, সে ক্ষেত্রে সরকারকে অন্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপাতত শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণের দাবি মানতে মোদি সরকার নারাজ। শিক্ষার্থী ও বিরোধীরাও অনড়। সংসদ অচল। রাজনীতি উত্তাল।