উত্তর প্রদেশে দলীয় সম্মেলনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (ডানে) ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। ৩০ অক্টোবর ২০২৬, লক্ষ্ণৌ
উত্তর প্রদেশে দলীয় সম্মেলনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (ডানে) ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। ৩০ অক্টোবর ২০২৬, লক্ষ্ণৌ

বিধানসভা নির্বাচনের আগে উত্তর প্রদেশ নিয়ে কেন এতটা চিন্তিত বিজেপি

ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যে বিধান পরিষদের নির্বাচন বিজেপির চিন্তা বাড়িয়েছে। উত্তর প্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে দলীয় কোন্দল ও শরিকি অসন্তোষ মেটাতে তৎপর হয়েছেন কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। আগামী বছরের গোড়ায় উত্তর প্রদেশ বিধানসভা ভোটের রণকৌশল ঠিক করতে লক্ষ্ণৌ গিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ করে শাহ বলেছেন, মান-অভিমান, ক্ষোভ-বিক্ষোভ ভুলে যান, যা কিছু অপ্রাপ্তি, অসন্তোষ গোমতীর জলে বিসর্জন দিন।

রাজ্যের সব জেলার আড়াই হাজার দলীয় নেতাদের এক সম্মেলনে অংশ নিয়ে গতকাল শুক্রবার অমিত শাহ বলেন, ‘সবার সব আশা পূরণ হয় না। অনেকেই অনেক কিছু পান না। এতে মনে ক্ষোভ বা হতাশা জন্মাতেই পারে। আপনাদের মনেও এমন কিছু থাকতে পারে। কিন্তু দলের স্বার্থে এখান থেকে বেরোনোর পর তা গোমতীর জলে বিসর্জন দিন। এখন আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার সময়।’

শাহ বলেন, কোনো নেতাই একা সবাইকে জেতাতে পারেন না। জয় নিশ্চিত করেন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা।

বিধান পরিষদের ভোটে বিজেপি এবার খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন বারানসির দুটি আসনেই হেরে গেছে। সেই দুই আসন জিতেছে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টি (এসপি)। বারানসির দুটি আসন ছাড়া এসপি জিতেছে এলাহাবাদ, লক্ষ্ণৌ ও আগ্রার তিন আসন।

বিধানসভার ভোটের আগে এসপির এই ৫ আসনে জয় বিজেপির দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছে এই জন্য যে এবারের ভোটাররা ছিলেন শুধু শিক্ষক ও স্নাতকেরা। অর্থাৎ ওই ৫ আসনের শিক্ষিত ভোটাররা বিজেপিকে ত্যাগ করেছেন।

এটাই বিজেপির দুশ্চিন্তা। কেননা, ‘ভোটচুরি’র বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তার পুরোভাগে রয়েছে শিক্ষিত যুব সমাজ। পাশাপাশি উত্তর প্রদেশে এনডিএর শরিকদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বিজেপিতেও।

সম্প্রতি রাজ্যের যে ১১টি আসনে রাজ্যসভার ভোট হলো, তার মধ্যে বিজেপির দখলে ছিল ৮টি আসন। সেই আসনগুলোর প্রত্যেকটিতেই বিজেপি পুরোনোদের বাতিল করে নতুন প্রার্থী দেয়। বিধান পরিষদের ভোটে তার একটা প্রভাব পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এ অবস্থায় দলীয় অসন্তোষ দূর করতেই অমিত শাহকে তৎপর হতে হয়েছে। তিনি বলেছেন, বিধানসভার ভোট আসছে। তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় থাকতে হলে মান-অভিমান-অসন্তোষ গোমতী নদীর জলে বিসর্জন দিতে হবে।

তবে শুধু দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষাই নয়, হিন্দুত্ববাদী চেতনা জাগাতে শাহ অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের (ইউসিসি) কথাও বলেছেন। ওই বৈঠকে তিনি বলেন, এবার ক্ষমতায় এসে তাঁরা রাজ্যে ইউসিসি চালু করবেন।

দেশের মধ্যে প্রথম ইউসিসি চালু হয় বিজেপিশাসিত উত্তরাখন্ডে। তারপর একে একে গুজরাট, আসাম ও মধ্য প্রদেশ বিধানসভায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল পাস করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও রাজস্থানে তা চালুর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

অথচ ২০১৭ সালে ক্ষমতাসীন হয়েও উত্তর প্রদেশে বিজেপি ওই রাস্তায় হাঁটেনি। এবার বিধানসভা ভোটের আগে শাহ সেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, আগামী বছর রাজ্যে ক্ষমতায় এলে বিজেপি দেশের এনডিএশাসিত ২১টি রাজ্যেই ইউসিসি চালু করবে। ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে সেটা হয়ে যাবে।

রাজ্যের প্রধান প্রতিপক্ষ যেহেতু সমাজবাদী পার্টি, তাই সেই দলকে কটাক্ষ করতেও অমিত শাহ ছাড়েননি। এসপি নেতা অখিলেশ যাদবের নাম করে তিনি বলেন, ৩০ বছরেও আপনারা উত্তর প্রদেশে ক্ষমতায় আসতে পারবেন না। জনগণ আপনাদের তৃতীয় প্রজন্মদেরও ক্ষমা করবে না।

অখিলেশও ছাড় দেননি শাহকে। ১০ বছর ক্ষমতায় থেকেও বিজেপি কেন রাজ্যে ইউসিসি চালু করতে পারেনি সেই প্রশ্ন তুলে অখিলেশ বলেন, ‘আপনারা অনেক দেরি করে ফেলেছেন স্যার। স্রেফ বক্তৃতা করে ভোটে জেতা যায় না। বিধান পরিষদের ভোট সেটা বুঝিয়ে দিয়েছে।’

উত্তর প্রদেশে বিজেপির শরিক প্রধানত তিনটি দল। নিষাদ পার্টি, সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি ও রাষ্ট্রীয় লোকদল। নিষাদ পার্টি ও সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি শুরু থেকেই বিজেপির সঙ্গে জোট করে ভোটে লড়েছিল। নিষাদ পার্টি জেতে ১১ আসনে, সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি পেয়েছিল ৬টি আসন। এবার ভোটের আগে দুই দলেই নতুন ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে।

সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব

নিষাদ পার্টির নেতা সঞ্জয় নিষাদ সম্প্রতি দিল্লিতে এক সমাবেশে এনডিএর প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, পরিস্থিতির বদল না ঘটলে তাঁরা ভিন্ন রাজনৈতিক পথ বেছে নেবেন। সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টির নেতা ওমপ্রকাশ রাজভরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। দলত্যাগের ঘটনাও ঘটেছে। অখিলেশের প্রতি দলের অনেকেই ঝুঁকতে চাইছেন। অর্থাৎ ভোটের আগে রাজ্যের রাজনৈতিক মেরুকরণে বদল ঘটতে পারে।

জয়ন্ত চৌধুরীর রাষ্ট্রীয় লোকদল ২০২২ সালের ভোটে অখিলেশের সঙ্গে জোট বেঁধে ৮টি আসন জিতেছিল। পরে জোটত্যাগ করে আরএলডি এনডিএর শরিক হয়। জয়ন্ত চৌধুরী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হন। তিনি বরাবরই হাওয়া বুঝে চলেন। এই দলের প্রভাব প্রধানত পশ্চিম উত্তর প্রদেশের জাটদের মধ্যে। এবার কী করবেন এখনো অজানা।

অমিত শাহ এসব সমীকরণ বিলক্ষণ বোঝেন। তাঁর প্রধান কাজ দলীয় নেতাদের ক্ষোভ ও মান-অভিমান দূর করা। বিধান পরিষদের ভোটে খারাপ ফল করার কারণগুলো অনুসন্ধান তাঁর প্রধান কাজ। উত্তর প্রদেশ সফর সেই কারণেই।