
ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালামের জন্মদিন ছিল গতকাল ১৫ অক্টোবর। শৈশবে পরিবারের অভাব মেটাতে সংবাদপত্র বিলি করতেন তিনি। পরে মহাকাশ গবেষণা ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে পরিচিতি পান ‘মিসাইল ম্যান অব ইন্ডিয়া’ নামে। বিজ্ঞানী থেকে ভারতের প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার এই যাত্রায় তিনি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন অসংখ্য তরুণকে।
প্রতিদিন ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠতে হতো তাঁকে। এরপর অঙ্কের শিক্ষকের কাছে পড়তে যেতেন। পড়া শেষে বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ ছিল না। যেতে হতো তিন কিলোমিটার দূরের রেলস্টেশনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সেখানে ট্রেন থামত না। চলন্ত ট্রেন থেকে ছুড়ে দেওয়া সংবাদপত্রের বান্ডিল সংগ্রহ করে সেগুলো পৌঁছে দিতে হতো গ্রাহকদের কাছে। কাজ শেষে বাড়ি ফিরে নাশতা সেরে যেতেন স্কুলে। সন্ধ্যায় আবার শহরে বের হতেন সকালে বিলি করা সংবাদপত্রের বকেয়া অর্থ আদায় করতে।
বলছি এ পি জে আবদুল কালামের কথা। ১৯৪১ সালে এভাবেই কাটত তাঁর দিন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১০ বছর। পড়াশোনা আর কাজের ফাঁকে চলত পরিবারের অভাবের সঙ্গে লড়াই। তবে সেই লড়াইয়ে তিনি হেরে যাননি, পৌঁছেছেন সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে।
ভারতের মহাকাশ গবেষণা ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন আবদুল কালাম। ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব ও সমন্বয়ের ভূমিকার কারণে তিনি পরিচিতি পান ‘মিসাইল ম্যান অব ইন্ডিয়া’ নামে। পরে ২০০২ সালে ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। জনপ্রিয়তার কারণে দেশবাসীর কাছে পরিচিতি পান ‘জনতার প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে।
আকাশের প্রতি টান
১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর ভারতের তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে জন্ম এ পি জে আবদুল কালামের। তাঁর পুরো নাম আবুল পাকির জয়নুলাবদিন আবদুল কালাম। বাবা জয়নুলাবদিন নৌকা তৈরি ও ভাড়া দেওয়ার কাজ করতেন। পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারকে সাহায্য করতে ১০ বছর বয়সেই সংবাদপত্র বিলির কাজ শুরু করেন তিনি।
এমআইটিতে পড়ার সময় উড়োজাহাজের নকশা ও বিভিন্ন কারিগরি ব্যবস্থা নিয়ে হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ পান আবদুল কালাম। প্রকৌশলবিদ্যার প্রতি আগ্রহ তখন শুধু আকাশে ওড়ার স্বপ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না। উড়োজাহাজ কীভাবে তৈরি হয়, এর বিভিন্ন অংশ কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে, সেসব জানার আগ্রহও তৈরি হয়েছিল তাঁর।
১৯৫৪ সালে তিরুচিরাপল্লির সেন্ট জোসেফস কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন আবদুল কালাম। তবে তাঁর আগ্রহের জায়গা ছিল দিগন্তবিস্তৃত আকাশ। শৈশব থেকেই স্বপ্ন দেখতেন আকাশে ডানা মেলে ওড়ার। এক অনুষ্ঠানে ছোটবেলার সেই স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, স্কুলে তাঁর শিক্ষক শিব সুব্রামনিয়াম আয়ার শ্রেণিকক্ষের বোর্ডে একটি পাখি এঁকে জানতে চেয়েছিলেন, পাখির মতো উড়তে পারবে? কথাটি তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। এরপর পাখির মতো ওড়ার স্বপ্ন থেকে যুদ্ধবিমানের পাইলট হওয়ার ইচ্ছা জাগে।
উড়োজাহাজের প্রতি আকর্ষণ আবদুল কালামকে বিমান প্রকৌশল নিয়ে পড়তে উৎসাহিত করে। ১৯৫৫ সালে ভর্তি হন মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি)। সেখানে উড়োজাহাজ নির্মাণ ও উড্ডয়নপ্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ পান।
তবে পড়াশোনার খরচ জোগানো পরিবারের পক্ষে কঠিন ছিল। আবদুল কালামের বড় বোন জোহরা নিজের সোনার গয়না বন্ধক রেখে তাঁর পড়ার ব্যয় মেটাতে সাহায্য করেন।
১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর ভারতের তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে জন্ম এ পি জে আবদুল কালামের। তাঁর পুরো নাম আবুল পাকির জয়নুলাবদিন আবদুল কালাম। বাবা জয়নুলাবদিন নৌকা তৈরি ও ভাড়া দেওয়ার কাজ করতেন। পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারকে সাহায্য করতে ১০ বছর বয়সেই সংবাদপত্র বিলির কাজ শুরু করেন তিনি।
এমআইটিতে পড়ার সময় উড়োজাহাজের নকশা ও বিভিন্ন কারিগরি ব্যবস্থা নিয়ে হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ পান আবদুল কালাম। প্রকৌশলবিদ্যার প্রতি আগ্রহ তখন শুধু আকাশে ওড়ার স্বপ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না। উড়োজাহাজ কীভাবে তৈরি হয়, এর বিভিন্ন অংশ কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে, সেসব জানার আগ্রহও তৈরি হয়েছিল তাঁর।
পড়াশোনা শেষে বিমানবাহিনীর পাইলট হওয়ার চেষ্টা করেন আবদুল কালাম। কিন্তু নির্বাচিত হতে পারেননি। স্বপ্নের পেশায় যেতে না পারা ছিল তাঁর জন্য হতাশার। পরে তিনি নিজেই বলেছেন, বিমানবাহিনীতে পাইলট হতে না পারলেও তাঁর কর্মজীবন প্রযুক্তি ও উড্ডয়নসংক্রান্ত কাজের মধ্য দিয়েই এগিয়েছে। পাইলট হওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও উড়োজাহাজের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার সুযোগ তাঁর সামনে খোলা ছিল।
উড়োজাহাজ থেকে রকেট
১৯৫৮ সালে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার (ডিআরডিও) অধীন অ্যারোনটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন আবদুল কালাম। সেখানে উড্ডয়নপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন তিনি। পরে ভারতের মহাকাশ গবেষণা কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান।
১৯৬৯ সালে যোগ দেন ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় (ইসরো)। তখন ভারত নিজস্ব প্রযুক্তিতে উপগ্রহ উৎক্ষেপণযান তৈরির চেষ্টা করছে। এই কর্মসূচিতে যুক্ত হয়ে আবদুল কালাম এমন একটি প্রকল্পের দায়িত্ব পান, যা পরবর্তী সময়ে ভারতের মহাকাশ গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রকল্পটির নাম স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকেল-৩ বা এসএলভি-৩। এর লক্ষ্য ছিল নিজস্ব রকেটের সাহায্যে উপগ্রহকে পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করা। এসএলভি-৩ প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আবদুল কালাম। তাঁর সঙ্গে কাজ করেন বিভিন্ন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী।
১৯৭৯ সালের ১০ আগস্ট এসএলভি-৩-এর প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করা হয়। কিন্তু রকেটটি উৎক্ষেপণের পর দ্বিতীয় ধাপের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেয়। ফলে উপগ্রহটি নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছাতে পারেনি। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও পরিশ্রমের পর এই ব্যর্থতা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের জন্য বড় ধাক্কা ছিল।
আবদুল কালাম দেশীয় প্রযুক্তিতে একটি স্টেন্ট তৈরির উদ্যোগ নেন। এটি ‘কালাম-রাজু স্টেন্ট’ নামে পরিচিতি পায়। ১৯৯৮ সালে এই স্টেন্ট বাজারে আসে। এর লক্ষ্য ছিল হৃদ্রোগের চিকিৎসার ব্যয় কমানো।
কিন্তু এখানেই থেমে থাকেননি আবদুল কালাম ও তাঁর সহযোদ্ধারা। উৎক্ষেপণের তথ্য বিশ্লেষণ করে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করেন তাঁরা। পরবর্তী প্রচেষ্টার জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধনও আনেন তিনিসহ তাঁর দল।
১৯৮০ সালের ১৮ জুলাই দ্বিতীয় পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণে সফল হয় এসএলভি-৩। রোহিণী আরএস-১ উপগ্রহকে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে স্থাপন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ভারত নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি উৎক্ষেপণযানের সাহায্যে উপগ্রহ কক্ষপথে পাঠাতে সক্ষম দেশগুলোর একটি হয়ে ওঠে। এই সাফল্য আবদুল কালামের কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এসএলভি-৩-এর অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে ভারতের জন্য আরও উন্নত উৎক্ষেপণযান তৈরির পথ খুলে দেয়।
ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে নেতৃত্ব
মহাকাশ গবেষণায় এসএলভি-৩-এর অভাবনীয় সাফল্যের পর ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ পি জে আবদুল কালামের সাংগঠনিক ক্ষমতা ও বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞাকে এক নতুন লড়াইয়ে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৮২ সালে তিনি আবার প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থায় (ডিআরডিও) ফিরে আসেন। এবার তাঁর কাঁধে ন্যস্ত হয় এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব—‘ইন্টিগ্রেটেড গাইডেড মিসাইল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’ বা আইজিএমডিপি। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল ভারতকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী করে তোলা।
১৯৮০-এর দশকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির ওপর আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তি গড়ে তোলার পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম পেতে বাধার মুখে পড়তে হয় দেশটিকে। এই পরিস্থিতিতে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় ভারত।
১৯৮৩ সালে শুরু হওয়া আইজিএমডিপির আওতায় ভারতীয় বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা পাঁচ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ শুরু করেন। এগুলো হলো ভূমি থেকে ভূমিতে আঘাত হানতে সক্ষম ‘পৃথ্বী’, দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘অগ্নি’, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘আকাশ’, স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘ত্রিশূল’ এবং ট্যাংক ধ্বংসের জন্য ‘নাগ’।
এই কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব ও সমন্বয়ের ভূমিকা পালনের জন্যই আবদুল কালাম পরিচিতি পান ‘মিসাইল ম্যান অব ইন্ডিয়া’ নামে।
ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পাশাপাশি ভারতের পারমাণবিক সক্ষমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আবদুল কালাম। ১৯৯৮ সালের মে মাসে রাজস্থানের পোখরানে ভারতের দ্বিতীয় দফার পারমাণবিক পরীক্ষা ‘পোখরান-২’ চালানো হয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের সচিব হিসেবে কালাম এই পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কারীদের একজন ছিলেন।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নজর এড়াতে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে পারমাণবিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। বিজ্ঞানীরা ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। কালামসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী সেনা কর্মকর্তার পোশাক পরেও পরীক্ষাস্থলে যেতেন। ১৯৯৮ সালের ১১ ও ১৩ মে মোট পাঁচটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে ভারত প্রকাশ্যে নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ঘোষণা করে।
চিকিৎসাক্ষেত্রে অবদান
এ পি জে আবদুল কালামের মেধা শুধু ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা মহাকাশ প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞানের ব্যবহার সাধারণ মানুষের দুঃখকষ্ট লাঘব ও মানবকল্যাণেও ভূমিকা রাখতে পারে। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ড. সোমা রাজুর সঙ্গে কাজ করার সময় তিনি লক্ষ করেন, ভারতে হৃদ্রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত করোনারি স্টেন্ট বা রিং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে তা অনেক সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল।
আবদুল কালাম দেশীয় প্রযুক্তিতে একটি স্টেন্ট তৈরির উদ্যোগ নেন। এটি ‘কালাম-রাজু স্টেন্ট’ নামে পরিচিতি পায়। ১৯৯৮ সালে এই স্টেন্ট বাজারে আসে। এর লক্ষ্য ছিল হৃদ্রোগের চিকিৎসার ব্যয় কমানো।
পোলিও আক্রান্ত শিশুদের জন্যও অবদান রাখেন আবদুল কালাম। সে সময় পোলিও আক্রান্ত শিশুদের হাঁটার জন্য যে ক্যালিপার ব্যবহার করা হতো, সেগুলোর ওজন ছিল প্রায় তিন কেজি। ভারী এই ক্যালিপার পরে হাঁটতে গিয়ে শিশুরা কষ্ট পেত। শিশুদের এই কষ্ট তাঁকে ভাবিয়ে তোলে।
এরপর আবদুল কালাম তাঁর দলের সঙ্গে বিশেষ ধরনের হালকা ক্যালিপার তৈরির কাজে যুক্ত হন। ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত একটি উপাদান কাজে লাগিয়ে তৈরি এই ক্যালিপারের ওজন তিন কেজি থেকে কমিয়ে প্রায় ৩০০ গ্রামে নামিয়ে আনা হয়।
এই হালকা ওজনের কৃত্রিম পা পরে যখন শত শত পোলিও আক্রান্ত শিশু অনায়াসে মাঠে দৌড়াদৌড়ি করতে শুরু করল, তখন আবদুল কালাম পরম তৃপ্তিতে বলেছিলেন, মহাকাশে রকেট পাঠানোর চেয়েও এই শিশুদের মুখে হাসি দেখা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।’
জনতার প্রেসিডেন্ট
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অবদান এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থনে ২০০২ সালে ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এ পি জে আবদুল কালাম। রাজনীতির বাইরে থেকে আসা একজন বিজ্ঞানীর দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হওয়া ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হন।
২০০২ সালের ২৫ জুলাই থেকে ২০০৭ সালের ২৫ জুলাই পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন আবদুল কালাম। এ সময় তিনি শিক্ষার্থী ও তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন, প্রশ্ন শুনতেন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে ভাবতে উৎসাহ দিতেন। সহজ জীবনযাপন ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে পারার গুণে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। দেশবাসীর কাছে পরিচিতি পান ‘জনতার প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও শিক্ষাদান, লেখালেখি ও তরুণদের অনুপ্রাণিত করার কাজ চালিয়ে যান আবদুল কালাম। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। নিজের জীবন ও কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন একাধিক বইয়ে। এর মধ্যে তাঁর আত্মজীবনী ‘উইংস অব ফায়ার’ বিশেষভাবে পরিচিত।
২০১৫ সালের ২৭ জুলাই মেঘালয়ের শিলংয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তৃতা দেওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন আবদুল কালাম। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেদিন সন্ধ্যায় সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। এ সময় তাঁর বয়স ছিল ৮৩ বছর।
তথ্যসূত্র: ভারতের রাষ্ট্রপতির সরকারি ওয়েবসাইট, ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো), প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও)