কোভিড বৈঠকে মোদি, সতর্ক হওয়ার নির্দেশ

সাবধানতা বোঝাতে বৃহস্পতিবার সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য ও সংসদ সদস্য মাস্ক পরে আসেন। নয়াদিল্লি, ভারত
ছবি: এএনআই

ভারতের কোভিড পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠক করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে জনবহুল এলাকায় মাস্ক পরার পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে সবাইকে বুস্টার ডোজ নিতেও বলা হয়েছে।

গতকাল বুধবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ডাকা বৈঠকে যে যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর ডাকা বৈঠকে তার অতিরিক্ত কিছু হয়নি। ওই বৈঠকে আতঙ্কগ্রস্ত না হওয়ার আবেদন জানানো হলেও সাবধানতার যে মার নেই, তা বোঝাতে বৃহস্পতিবার সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীসহ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য ও সংসদ সদস্য মাস্ক পরে আসেন। মাস্ক পরার প্রয়োজনীয়তার কথা বোঝানো হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এখনো তা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। বুস্টার ডোজ নেওয়ার কথাও বারবার বলা হচ্ছে, যদিও সে বিষয়ে কড়াকড়ি কোনো নিয়ম এখনো জারি করা হয়নি।

হঠাৎই নতুন করে কোভিড নিয়ে চর্চা শুরু হলেও সরকার এমন কিছু করতে চাইছে না, যাতে অর্থনীতি আবার বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। তিন বছর পর অর্থনীতির হাল কিছুটা মন্দের ভালো। সরকার চাইছে না তা আবার অনিশ্চিত হয়ে যাক। এই কারণে যে যে দেশ থেকে কোভিড–সংক্রান্ত বিপৎসংকেত আসতে শুরু করেছে, যেমন চীন, জাপান, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া বা ব্রাজিল, তাদের বিমান চলাচলের ওপর কোনো রকম বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনসুখ মান্ডবীয় বৃহস্পতিবার সংসদে জানিয়েছেন, আপাতত ভারতে বিমানবন্দরগুলোতে আসা বিদেশি যাত্রীদের মধ্যে মাত্র ২ শতাংশের নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়েছে। বিমানবন্দরেই তাঁদের আরটি–পিসিআর পরীক্ষা হবে। রিপোর্টের ওপর নির্ভর করবে ওই যাত্রীদের সুরক্ষার বিষয়ে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, সরকার সজাগ ও সতর্ক রয়েছে। সব ধরনের জরুরি পরিষেবা তৈরি রাখা হচ্ছে। অবস্থা বুঝে সরকার ব্যবস্থা নেবে। উপদ্রুত দেশগুলোর বিমানের ওপর এখনই কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে না বলেও তিনি জানান।

কোভিড পরিস্থিতি নিয়ে সরকার হঠাৎই সক্রিয় হয়ে ওঠায় আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোর কী হবে, সেই প্রশ্ন বৃহস্পতিবার উঠে আসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে। বিশেষ করে প্রশ্ন ওঠে ‘জি-২০’–এর আসন্ন বৈঠকগুলো নিয়ে।

চলতি মাসেই এ আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর সভাপতিত্বের দায়িত্ব নিয়েছে ভারত। দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারত জানায়, আগামী এক বছরে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে অন্তত ২০০টি সম্মেলন হবে। জোর দেওয়া হবে পর্যটনের বিকাশের ওপর। কোভিডের কারণে সেসব বৈঠকের চরিত্র পাল্টাবে কি না, জানতে চাওয়া হলে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি বৃহস্পতিবার বলেন, এখন পর্যন্ত সব বৈঠকই হবে বলে ঠিক আছে এবং সবাই সশরীর তাতে হাজির হবেন। তবে সবকিছু নির্ভর করবে পরিস্থিতির ওপর।

এ অবস্থায় ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (আইএমএ) কোভিড বিধি কড়াভাবে মেনে চলার ওপর জোর দিয়েছে। বৃহস্পতিবার তারা জানিয়েছে, নতুন করে মহামারি যাতে না ছড়ায়, সে জন্য প্রত্যেককে সতর্ক থাকতে হবে। কোভিডকালে যে যে নিয়ম মানা হয়েছিল, এখন থেকে প্রত্যেকের সেভাবে চলা উচিত। আইএমএ জানিয়েছে, মানুষের উচিত ভিড় এড়িয়ে চলা। সে জন্য বিয়েবাড়ি, নাচগানের অনুষ্ঠান, জনসভা এড়ানো দরকার। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে বিদেশভ্রমণও বন্ধ রাখা উচিত। বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে যাঁদের কোমর্বিডিটি (নানা ধরনের পার্শ্ব অসুখ) রয়েছে।

কোভিড পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি তৎপরতাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক বৃহস্পতিবারও অব্যাহত। গত মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলটকে চিঠি লিখে ভারত জোড়ো যাত্রীদের কঠোরভাবে কোভিডবিধি মানার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার রাহুল এর জবাব দেন। হরিয়ানার নুহ এলাকায় যাত্রাকালে তিনি বলেন, ‘কোভিডের দোহাই দিয়ে সরকার এখন ভারত জোড়ো যাত্রা থামাতে উঠেপড়ে লেগেছে। সরকার ভয় পেয়েছে। যেভাবে জনসাধারণ এই যাত্রায় শামিল হচ্ছেন, যেভাবে সত্যের উন্মোচন হচ্ছে, সরকারি ভাঁওতাবাজি ধরা পড়ে যাচ্ছে, তা ঠেকাতে কোভিড অজুহাত হয়ে উঠেছে।’ রাহুল বলেন, ‘এই যাত্রা শ্রীনগর পর্যন্তই যাবে।’ কংগ্রেস মুখপাত্র জয়রাম রমেশ আগেই জানিয়েছেন, দরকার হলে কোভিডবিধি অবশ্যই মানা হবে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই যাত্রা বাতিল করা হবে না।

মহারাষ্ট্রে কংগ্রেসের জোট শরিক উদ্ধব ঠাকরে নেতৃত্বাধীন শিবসেনাও এ নিয়ে সরকারকে একহাত নিয়েছে। দলীয় মুখপত্র ‘সামনা’র সম্পাদকীয় নিবন্ধে লেখা হয়েছে, কংগ্রেসের ভারত জোড়ো যাত্রা ঠেকাতেই সরকার করোনাভাইরাস ছেড়েছে।

সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, ‘রাহুল গান্ধী ১০০ দিন ধরে হাঁটছেন। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। সরকার কোনোভাবেই ওই যাত্রা আটকাতে পারছে না।

তাই মনে হচ্ছে তারা কোভিড-১৯ ভাইরাস ছেড়েছে।’ প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে ‘সামনা’ লিখেছে, ‘তিন বছর আগে করোনা যখন হই হই করে বাড়ছিল, তখন গুজরাটে কে ডেকে এনেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে?’ অশোক গেহলট বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উচিত ছিল প্রথম চিঠিটি প্রধানমন্ত্রীকে লেখা। এই সেদিন তিনি ত্রিপুরায় জনসভা করলেন। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় চুটিয়ে জনসভা করেছেন পশ্চিমবঙ্গেও।’