মহারাষ্ট্রের ‘স্ট্রং ম্যান’ খ্যাত শারদ পাওয়ার
মহারাষ্ট্রের ‘স্ট্রং ম্যান’ খ্যাত শারদ পাওয়ার

বিজেপির জালে কি এবার শারদ পাওয়ারের এনসিপি

ভারতীয় সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের আগে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আরও একটি খিলান ধসের মুখে দাঁড়িয়েছে। মহারাষ্ট্রের ‘স্ট্রং ম্যান’ শারদ পাওয়ারের দল এনসিপি (এসপি) লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস ও নারী সংরক্ষণ বিল শর্তাধীনে সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছে। এই ইঙ্গিত ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অস্তিত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

ভারতীয় সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর আগে ভাঙন ধরেছিল আম আদমি পার্টি (আপ), তৃণমূল কংগ্রেস ও উদ্ধবপন্থী শিবসেনায়।

রাজ্যসভায় আপের মোট ১০ সদস্যের মধ্যে ৭ জন যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের বিপর্যয়ের পর লোকসভায় ২০ জন বিজেপিকে সমর্থন জানিয়ে যোগ দিয়েছেন অজানা অনামি দল ‘এনসিপিআই’তে। রাজ্যসভার তিন সদস্যের পদত্যাগের পর বিজেপির হয়ে দাঁড়িয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে চলেছেন। উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনার লোকসভা সদস্যসংখ্যা ৯। তাঁদের মধ্যে ছয়জন শিন্ডে সেনায় যোগ দিয়ে এনডিএর সঙ্গী হয়েছেন। এবার পালা মহারাষ্ট্রের অশীতিপর রাজনীতিক শারদ পাওয়ারের দলের। শারদ–কন্যা সুপ্রিয়া সুলের ইঙ্গিত অনুযায়ী, দল সমর্থন দেওয়ার কথা ভাবছে বিতর্কিত সেই সংবিধান সংশোধন বিলে, যা সংসদের আসন বাড়ানোর পাশাপাশি এক–তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণ করতে চাইছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটের আগে সংসদের বাজেট অধিবেশনে এই বিলটিই কিছুদিন আগে সম্মিলিত বিরোধী প্রতিরোধে পরাস্ত হয়েছিল। সেই সময় বিরোধী জোট যতটা জমাট ছিল, আজ তা প্রায় ততটাই ভঙ্গুর মনে হচ্ছে।

সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হচ্ছে আগামী সোমবার থেকে। এই অধিবেশনেই বিজেপি সরকার চাইছে সংসদে এক–তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণের পাশাপাশি আইনসভার মোট আসন বাড়ানো সংক্রান্ত বিলটি পাস করাতে। সরকার আরও চাইছে, ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেই তা কার্যকর করতে। এই বিল ছাড়া আরও একটি সংবিধান সংশোধন বিল এই অধিবেশনে পাস করানোর তোড়জোড় চলছে। ‘এক দেশ, এক ভোট’ বিল। এই বিল পাস হলে লোকসভা ও বিধানসভার ভোট একই সঙ্গে করানো হবে।

সংবিধান সংশোধন বিল পাস করাতে লোকসভা ও রাজ্যসভায় উপস্থিত সদস্যদের দুই–তৃতীয়াংশের সম্মতি লাগে। বাজেট অধিবেশনে বিলটি দুই কক্ষে পরাস্ত হয়েছিল শাসক জোট এনডিএর সেই গরিষ্ঠতা না থাকায়। পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। বিজেপি এখন মরিয়া বর্ষাকালীন অধিবেশনে বিল দুটি পাস করাতে।

সেই লক্ষ্যেই রাজ্যসভায় আপে ভাঙন ধরানো। সেই লক্ষ্যেই রাজ্যসভা ও লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসে বিভেদ সৃষ্টি করে সমর্থন আদায় নিশ্চিত করা। রাজ্যসভায় তৃণমূলের তিন সদস্য পদত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হওয়ার অপেক্ষায়। লোকসভায় ২৮ জনের মধ্যে ২০ জনকে বিজেপি ভাঙিয়ে নিয়েছে। সরাসরি তাঁদের দলে না নিয়ে তাদেরই উদ্যোগে তৈরি অজানা অনামা দল ‘ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া’তে (এনসিপিআই) যোগ দিতে বাধ্য করেছে। এই ২০ জন সদস্য বিজেপিকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।

এর পরের লক্ষ্য শারদ পাওয়ারের দল এনসিপি। সংবিধান সংশোধন বিলে সমর্থন দিলে শারদের দলে ভাঙন ধরানোর প্রয়োজন বিজেপির হবে না। বিজেপি সেই চেষ্টাই করছে। প্রশ্ন হলো শারদ পাওয়ার কি ‘ইন্ডিয়া’ জোটে থেকেও আসন পুনর্বিন্যাস ও নারী বিল সমর্থন করতে পারবেন? বিরোধী জোটেও থাকব আবার বিজেপির বিলে সমর্থন দেব, এভাবে দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা কি সম্ভব হবে? প্রশ্নটি আলোচিত হচ্ছে।

শারদ–কন্যা সুপ্রিয়া সুলে গতকাল বুধবার জানান, বিজেপি যদি নতুন বিলে লোকসভায় প্রতি রাজ্যের আসনসংখ্যা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর উল্লেখ করে (আগের বিলে তা লেখা ছিল না), তাহলে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে তাঁরা সেই বিল সমর্থন করতে পারেন। অর্থাৎ সুপ্রিয়া বিজেপির কাছে বিল সমর্থনে শর্ত রেখেছেন। যদিও ইন্ডিয়া জোট আগের বিলটির বিরোধিতা করেছিল নৈতিক দিক থেকে। এবার দেখার, বিজেপির চাপের কাছে শরদ পাওয়ারের দল মাথা নোয়ায় কি না। লোকসভায় শারদপন্থী সদস্যসংখ্যা ৮, রাজ্যসভায় ১ জন।

সংসদের উভয় কক্ষের হিসাব–নিকাশ

কিন্তু শারদপন্থীদের সমর্থন পেলেও লোকসভায় এনডিএর দুই–তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা হচ্ছে না। বাজেট অধিবেশনে নারী বিলের পক্ষে সমর্থন ছিল ২৯৮ জনের, বিরুদ্ধে ছিলেন ২৩০ জন। লোকসভার মোট আসন ৫৪৩। তিনটি আসন শূন্য রয়েছে। ফলে মোট আসন দাঁড়াচ্ছে ৫৪০। দুই–তৃতীয়াংশের অর্থ ৩৬০ জনের সমর্থন। গত এপ্রিলে মোট সদস্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ৫২৮ জন। দুই–তৃতীয়াংশ সমর্থনের জন্য দরকার ছিল ৩৫২ জনের ভোট।

এরপর তৃণমূল কংগ্রেস ও উদ্ধবপন্থী শিবসেনায় ভাঙন ধরানো হয়। লোকসভায় এনডিএর শক্তি বেড়ে হয়েছে ৩১৯। শারদপন্থী এনসিপি বিল সমর্থন করলে এনডিএর সংখ্যা হবে ৩২৭। ভোটের দিন সব দলের সবাই উপস্থিত থাকলে দুই–তৃতীয়াংশ ম্যাজিক ফিগার থেকে এনডিএর ৩৩টি আসন কম থাকছে। এই ঘাটতি মেটাতে পারে ডিএমকে (২২) ও সমাজবাদী পার্টি (৩৭)। সেটা হতে পারে দুটি উপায়ে। প্রথমত ভাঙন, দ্বিতীয়ত অনুপস্থিতির মধ্য দিয়ে।

তামিলনাড়ুর ভোটের পর ডিএমকের মন জিততে বিজেপি চেষ্টার ত্রুটি রাখছে না। চেষ্টা চালাচ্ছে সমাজবাদী পার্টিতেও ভাঙন ধরানোর। আগামী বছর উত্তর প্রদেশ বিধানসভার নির্বাচন। এই দুই দল যদি লোকসভায় ভোটের দিন অনুপস্থিত থাকে কিংবা বিলের বিরোধিতা করে ভোট না দিয়ে ওয়াক আউট করে, তাহলেও বিজেপির কেল্লা ফতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে লোকসভার মোট প্রার্থীসংখ্যা ৫৪৩ থেকে ৫৯ জন কমে হবে ৪৮৪। এর দুই–তৃতীয়াংশ ৩২৪। শারদপন্থীদের সমর্থন পেলে এনডিএর সমর্থক হবে ৩২৭। তবে সেই হিসাবে যাওয়ার আগে বিজেপি নজর দিচ্ছে ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চার (জেএমএম) তিনজন সদস্যসহ অন্য ছোট ছোট দলের দিকে। মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সঙ্গে এর আগেও এ নিয়ে বিজেপি নেতৃত্ব কথা বলেছিল। নতুনভাবে সেই আলোচনা শুরু হয়েছে।

রাজ্যসভার তিন আসনে জয়ীদের ঘোষণা ২৪ জুলাই হয়ে যাবে। তিনটি আসনই ছেড়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের তিন সদস্য শুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব ও প্রকাশ চিক বরাইক। উচ্চকক্ষে দুই–তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা পাওয়ার অর্থ ১৬৪ জনের সমর্থন লাভ। সবাই উপস্থিত থাকলে ও ভোট দিলে এনডিএর পক্ষে আসবে ১৫৫ জনের সমর্থন। শরদপন্থী একজনের সমর্থন পেলে সংখ্যা হবে ১৫৬। এর অর্থ সেখানেও কম পড়বে ৮ জনের সমর্থন।

বিজেপি যেভাবে নারী সংরক্ষণ ও আসন বৃদ্ধি এবং ‘এক দেশ এক ভোট’ বিল পাস করাতে মরিয়া, যেভাবে তারা একে একে দল ভাঙানোয় উদ্যোগী, তাতে ‘ইন্ডিয়া’ জোট কত দিন অটুট থাকবে বলা কঠিন। বিরোধীরা এত দিন ধরে যা বলে আসছে, দল ভাঙানোর খেলায় ইডি, সিবিআই, আয়কর বিভাগকে কাজে লাগানো হচ্ছে—এ ক্ষেত্রেও সেই অভিযোগই প্রধান। গতকাল বুধবার তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বিধায়ক, একেবারে শুরু থেকে আন্দোলনের সঙ্গী মদন মিত্র নেত্রীকে ছেড়ে বিদ্রোহী তৃণমূলে যোগ দিলেন। গত মঙ্গলবার মদন মিত্রের স্ত্রী ও দুই ছেলেক পৌরসভায় নিয়োগ দুর্নীতির এক মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইডি তলব করে। তারপরই তাঁর দলত্যাগ। বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের শঙ্কা, এইভাবে জয় নিশ্চিত মনে করলেই বিজেপি নতুনভাবে সংবিধান সংশোধন বিল পেশ করবে। দলের এক শীর্ষ নেতার কথায়, ‘এবার আমরা হারার জন্য বিল আনব না।’