শ্রীনগরের হজরত বাল মসজিদে এক অনুষ্ঠানে মোনাজত করছেন জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ। ১১ জুলাই ২০২৬, শ্রীনগর
শ্রীনগরের হজরত বাল মসজিদে এক অনুষ্ঠানে মোনাজত করছেন জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ। ১১ জুলাই ২০২৬, শ্রীনগর

পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের দাবি কি ট্রাম্পের কাছে জানাব: মোদি সরকারকে ওমর আবদুল্লাহর প্রশ্ন

নির্বাচনের পর দুই বছর কেটে গেছে অথচ কেন্দ্রীয় সরকার এখনো প্রতিশ্রুতিমতো জম্মু–কাশ্মীরকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেয়নি। দাবি আদায়ে জম্মু–কাশ্মীরের শাসক দল ন্যাশনাল কনফারেন্স তাই এবার দিল্লি অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০ জুলাই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন যেদিন বসার কথা, ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ও জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ সেদিন সদলে দিল্লিতে আন্দোলন শুরু করবেন। গতকাল রোববার জম্মুতে এক জনসভায় তিনি এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

জম্মু শহরে মহারাজা হরি সিং পার্কের ওই জনসভায় ওমর আবদুল্লাহ তাঁদের আন্দোলনকে দিল্লি নিয়ে আসার সিদ্ধান্তের কথা জানানোর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি কটাক্ষ করে বলেন, ‘নির্বাচনের পর দুই বছর কেটে গেল। এখনো সরকার তার প্রতিশ্রুতি পালন করল না। অথচ সেই কবে থেকে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি নেতারা বলে চলেছেন, ঠিক সময়ে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এই প্রতিশ্রুতি তাঁরা সংসদেও দিয়েছিলেন।’

এরপরই ওমর আবদুল্লাহর প্রশ্ন, ‘দাবি আদায়ে আমাদের কি তাহলে এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে যেতে হবে? বিজেপি বলে দিক, দিল্লি না গিয়ে আমরা কি তবে এবার হোয়াইট হাউসের সামনে ধরনায় বসব?’

জম্মু–কাশ্মীর রাজ্য দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট। সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ খারিজও সেই দিনে। সেই থেকে জম্মু–কাশ্মীর ও লাদাখ দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। যদিও বিজেপিশাসিত কেন্দ্রীয় সরকার বলেছিল, জম্মু–কাশ্মীরকে ঠিক সময়ে রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

পাঁচ বছর পর ২০২৪ সালে জম্মু–কাশ্মীর বিধানসভার নির্বাচন হয়। নির্বাচনী প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার রাজ্যের হৃত মর্যাদা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেই প্রতিশ্রুতি এমনকি ভারতীয় সংসদেও দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টকেও সরকারের পক্ষে বলা হয়েছে, ঠিক সময়ে রাজ্যের মর্যাদা ফেরানো হবে। সেই থেকে সাত বছর অতিক্রান্ত। অথচ এখনো সেই প্রতিশ্রুতি পালন করেনি মোদি সরকার।

জনসভায় বিশাল এক ব্যানার লাগানো হয়েছিল। তাতে লেখা, ‘দিল্লি চলো। আমরা আমাদের রাজ্য ফেরত পেতে চাই’। আরও ব্যানারে লেখা ছিল, ‘আমাদের রাজ্য আমাদের গর্ব, আমাদের রাজ্য আমাদের হক’।

মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের অপেক্ষা, আমাদের নীরবতাকে ওরা দুর্বলতা ভাবছে। ওরা আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। আমরা দুর্বল নই। আমরা ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি।’

জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কেন্দ্রকে আমরা অনেক সময় দিয়েছি। দুই বছর ধরে নানাভাবে কথা বলেছি। বিভিন্ন উপায়ের খোঁজ করেছি। আর নয়। এবার অন্য কৌশল নিতে হবে। দিল্লি গিয়ে ধরনা দিতে হবে। ২০ জুলাই থেকে সেই নতুন অধ্যায় শুরু হবে।’

ওমর আবদুল্লাহ আরও বলেন, এই দাবি শুধু ন্যাশনাল কনফারেন্সের নয়; এই দাবি সবার। এমনকি বিজেপিরও। তারাও এই দাবি পূরণ হবে বলে ভোট চেয়েছিল। একজন বিজেপি নেতাকেও পাওয়া যাবে না, যিনি রাজ্যের বিরোধিতা করেছিলেন।

ওমর বলেন, ‘যতবার রাজ্যের কথা জানিয়েছি, প্রতিবার শুনেছি, ঠিক সময়ে তা দেওয়া হবে।’ তাঁর প্রশ্ন, সেই ঠিক সময়টা কবে আসবে? তাহলে কি তারা বিজেপির ক্ষমতায় আসার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে? তা–ই যদি হয়, তাহলে সেটা তারা স্পষ্ট করে জানাক।’

জম্মু–কাশ্মীর বিধানসভার বিরোধী নেতা বিজেপির সুনীল শর্মা গতকাল এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকার পরিচালনায় ব্যর্থতা ঢাকতেই মুখ্যমন্ত্রী নতুন এই পথে হাঁটতে চলেছেন।

ওমর আবদুল্লাহ সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, বিজেপি তাঁর সরকার ফেলে দেওয়ার চক্রান্ত করছে। বলেছেন, তাঁর দলের শীর্ষ নেতাদের ভাঙিয়ে নিতে একেকজনকে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার টোপ দিয়েছে।

গত শনিবারও মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তাঁর দলের এক বিধায়ককে ৩০ কোটি টাকা দেবে জানিয়ে বিজেপি বলেছে, দল ত্যাগ করলে মন্ত্রী করবে এবং বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যের মর্যাদাও ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

ওমর বলেন, এমন একজন ওই প্রস্তাব দিয়েছেন, যিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। কিন্তু একজন বিধায়ককেও ওরা পাবে না। ২০ থেকে ৩০ কোটি কেন, ১০০ কোটি দিলেও কেউ দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেবেন না।

গত নির্বাচনে জম্মু–কাশ্মীর বিধানসভায় ৯০ আসনের মধ্যে ন্যাশনাল কনফারেন্স ৪২ ও কংগ্রেস ৬ আসনে জয়ী হয়। এই জোটের সঙ্গে ছিল সিপিএমও। তারা ১টি আসন জেতে। ৪৯ আসন জিতে সরকার গড়েন ওমর আবদুল্লাহ। বিজেপি জেতে ২৯ আসন। মেহবুবা মুফতির পিডিপি মাত্র ৩টি আসনে জয়ী হয়েছিল।

ওমর আবদুল্লাহর আশঙ্কা, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি এবার নজর দিয়েছে জম্মু–কাশ্মীরের ওপর। তাঁদের দল ভাঙিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসতে চাইছে। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, রাজ্যের দাবিতে ওমরের দিল্লি অভিযানের সিদ্ধান্ত বিজেপির সেই উদ্যোগ রোখা ও দলকে জোটবদ্ধ রাখা।