টানা ১৭ দিন পর মায়ের সঙ্গে প্রথম কথা হয় জয়দেব প্রামানিকের। তা–ও সরাসরি নয়, মুঠোফোনে ভিডিওকলে। তখন দুজনই আবেগাপ্লুত। মা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে সন্তান বেঁচে আছে। কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতার পর জয়দেবই প্রথম বললেন, ‘মা ভালো আছ? চিন্তা করো না। আমি ভালো আছি।’
গতকাল বৃহস্পতিবার জয়দেবের সঙ্গে কথা হওয়ার পরই কেবল মুখে খাবার তুলেছেন তাঁর মা। আগের দিন মঙ্গলবার রাতে ভারতের উত্তরাখন্ডের উত্তরকাশীতে সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে জয়দেবসহ ৪১ শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়। ১২ নভেম্বর সাড়ে ৪ কিলোমিটারের নির্মাণাধীন ওই সুড়ঙ্গধসে আটকা পড়েছিলেন তাঁরা।
জয়দেবের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায়। কাজের খোঁজে উত্তরকাশীতে গিয়েছিলেন তিনি। হুগলিতে জয়দেবের পরিবারের অন্য সদস্যরাও থাকেন। তাঁর চাচা তরুণ কুমার প্রামাণিক বলেন, ‘আমার ভাই (জয়দেবের বাবা) গ্রামে একটি চায়ের দোকান চালান। তেমন একটা আয়–রোজগার হয় না। তাই পরিবারকে সহায়তায় কাজ করতে রাজ্যের বাইরে গিয়েছিল জয়দেব। আমরা কখনোই ভাবিনি, তাঁর সঙ্গে এমন কিছু হবে। তবে এখন সে নিরাপদে আছে। সকাল থেকে তাঁর সঙ্গে কয়েকবার কথা হয়েছে।’
শুধু জয়দেবই নন, পশ্চিমবঙ্গের আরও দুজন শ্রমিক উত্তরকাশীর সুড়ঙ্গে আটকা পড়েছিলেন। তাঁরা হলেন, হুগলির সৌভিক পাখিরা এবং কোচবিচার জেলার মানিক তালুকদার। ছেলেকে ফিরে পেয়ে সৌভিকের মা লক্ষ্মী বলেন, ‘আমার মনে হয় ও রোগা–পাতলা হয়ে গেছে। তবে ১৭ দিন পর আজ আমি শান্তি পাচ্ছি। এ কয় দিনে আমার শরীর ভেঙে গেছে। আমি ঘুমাতে চাই।’
ওডিশা রাজ্যে সত্যবান ভাত্রার ছোট ভাই ভগবানও আটকা পড়েছিলেন সুড়ঙ্গে। উদ্ধারের পর দুই ভাইয়ের মধ্যে প্রথম কথা হয়। ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে অশ্রু ধরে রাখতে পারছিলেন না সত্যবান।
সৌভিকের পরিবার জানিয়েছে, সৌভিক পলিটেকনিক কলেজ থেকে পাস করেছেন। তবে পশ্চিমবঙ্গে কোনো কাজ পাননি। তাঁর মা বলেন, ‘আমার অত তাড়া নেই। সেখানে ওকে (সৌভিক) কয়েক দিন শান্তিতে থাকতে দিন। ও এখন পশ্চিমবঙ্গে এলে সবাই ওকে ঘিরে ভিড় করবে। ওর বিশ্রাম দরকার। আমি চাই, ও মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠুক।’
বেঁচে ফেরা আরেক শ্রমিক মানিক তালুকদারের স্ত্রীর নাম সোমা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্বামীর কাছ থেকে ফোন পান তিনি। সোমা বলেন, ‘ও আমাকে ফোন করে বলল, ভালো আছে। আমি ওকে আর কখনোই এ রকম জায়গায় কাজে পাঠাব না।’
পশ্চিমঙ্গের পাশেই ওডিশা রাজ্যে সত্যবান ভাত্রার ছোট ভাই ভগবানও আটকা পড়েছিলেন সুড়ঙ্গে। উদ্ধারের পর দুই ভাইয়ের মধ্যে প্রথম কথা হয়। ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে অশ্রু ধরে রাখতে পারছিলেন না সত্যবান। তিনি বলেন, ভগবানের প্রথম কথা ছিল, তাঁর পুনর্জন্ম হয়েছে। তারপর জানান যে তিনি ভালো আছেন। পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন।
মনজিৎ ছাড়া উত্তর প্রদেশের শ্রীবস্তি জেলার মতিপুর গ্রামের ছয় বাসিন্দা রাম মিলান, সত্য দেব, অঙ্কিত কুমার, জয় প্রকাশ, সন্তোষ কুমার ও রাম সুন্দর এবং মির্জাপুর জেলার অখিলেশ কুমারকে মঙ্গলবার সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
বিগত ১৮ মাস ওই সুড়ঙ্গে কাজ করেছেন ভগবান। আরও পাঁচ আত্মীয়ের সঙ্গে উত্তরকাশীতে গিয়েছিলেন তিনি। ওডিশা থেকে সুড়ঙ্গ নির্মাণে গিয়েছিলেন ভদ্রক জেলার ২১ বছর বয়সী তপন মন্ডলও। উদ্ধারের পর তিনি বিপর্যস্ত ছিলেন, আর তেমন একটা কথা বলেননি—এমন তথ্য দিলেন তাঁর মা গৌরিবালা। তিনি বলেন, ‘আমি ওকে শক্ত হতে বললাম। বোঝালাম যেন বিষণ্ন না হয়ে পড়ে। আমি বললাম, এই তরুণ বয়সে ও যে সাহসিকতা দেখিয়েছে, তা নিয়ে পরিবারের সবাই গর্বিত। ওর ফিরে আসাটা আমরা উদযাপন করব।’
ওডিশার ময়ূরভঞ্জ জেলার সুকান্তি নায়ক শুনিয়েছেন সুড়ঙ্গে আটকা পড়ার পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা সেখানে কীভাবে কাটিয়েছেন তাঁর ছেলে। সন্তানকে আর এ ধরনের কাজে পাঠাবেন না বলে জানান এই মা। তিনি বলেন, ‘ওর বাবা আর আমি ওকে বলেছি, আয়–রোজগার নিয়ে চিন্তা না করতে। আমাদের গ্রামেই ওর জন্য একটা ব্যবস্থা করে দেব।’
একই কথা উত্তর প্রদেশের ২৪ বছর বয়সী মনজিৎ চৌহানের পরিবারের। গত মাসে তিনি লাখিমপুর খাড়ি থেকে উত্তরকাশীতে কাজে গিয়েছিলেন। তাঁর মা চৌধারিয়ান বলেন, ‘আমাদের বড় ছেলে দীপু গত বছর মুম্বাইয়ে মারা গেছে। মনজিৎ এখন আমাদের একমাত্র সন্তান। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারীও সে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে ওকে আর উত্তরকাশীতে পাঠাব না। এই ১৭ দিন আমাদের কাছে ১৭ বছরের মতো ছিল।’
মনজিৎ ছাড়া উত্তর প্রদেশের শ্রীবস্তি জেলার মতিপুর গ্রামের ছয় বাসিন্দা রাম মিলান, সত্য দেব, অঙ্কিত কুমার, জয় প্রকাশ, সন্তোষ কুমার ও রাম সুন্দর এবং মির্জাপুর জেলার অখিলেশ কুমারকেও মঙ্গলবার সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
সত্য দেবের ছোট ভাই বীরেন্দ্র রানা বলেন, ‘সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধারের পর বুধবার সকালে আমরা ওর সঙ্গে প্রথম কথা বলি। ও জানায়, হাসপাতালে ওর চিকিৎসা চলছে। এক থেকে দুই দিনের মধ্যে ওকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে।’ অপর দিকে রাম মিলানের ছেলে সন্দ্বীপ বলেন, ‘বাবার কণ্ঠ শুনে আমার খুবই ভালো লাগছিল।’
অঙ্কিত কুমারকে উদ্ধারের পর তাঁর বড় ভাই বীক্রম বলেন, কে আগে তাঁর সঙ্গে কথা বলবেন, তা নিয়ে রীতিমতো লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল। এদিকে রাম সুন্দরের স্ত্রী শিলা দেবী স্বামীকে নিয়ে দিপাবলি উদ্যাপনের তোড়জোড় শুরু করেছেন। আর ছেলের উদ্ধার হওয়ার খবর শুনে খুশিতে নাকি কেঁদে ফেলেছেন সন্তোষের মা। তাঁর চাচাতো ভাই প্রদীপ বলেন, ‘সন্তোষ সুস্থ আছে আর শিগগিরই বাড়িতে ফিরবে জেনে আমরা সবাই খুশি।’