চোরবাগান মণ্ডপের মর্মান্তিক ঘটনার পর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে স্বজনদের ভিড়। কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত, ১৭ অক্টোবর
চোরবাগান মণ্ডপের মর্মান্তিক ঘটনার পর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে স্বজনদের ভিড়। কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত, ১৭ অক্টোবর

কলকাতার মণ্ডপে ১৯ মৃত্যু নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর ভাতিজাকে নিয়ে তৃণমূলের প্রশ্ন

উত্তর কলকাতার চোরবাগান সার্বজনীন দুর্গোৎসবে ১৯ ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সামনে চলে এসেছে। কারণ, চোরবাগান দুর্গোৎসবের প্রধান উদ্যোক্তা খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাতিজা দেবদীপ অধিকারী। চোরবাগান পূজা কমিটি প্রকাশিত এক পোস্টার মারফত এই তথ্য সামনে এসেছে।

পোস্টারে দেবদীপ অধিকারীর নাম ‘চিফ প্যাট্রন’ বা প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রয়েছে। এ ছাড়া জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা এই পূজা কমিটির চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন। উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপির সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষও এই পুজোর সঙ্গে জড়িত বলে জানানো হয়েছে।

শনিবারের ঘটনা প্রসঙ্গে বিজেপির সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস জানতে চেয়েছে এত মৃত্যুর জন্য দায়ী কে এবং এমন মর্মান্তিক ঘটনার পরে মুখ্যমন্ত্রী কবে পদত্যাগ করবেন। তৃণমূলের পক্ষ থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ওই পূজা কমিটির পোস্টার প্রকাশ করে আক্রমণ শাণানো হয়েছে। চোরবাগান পুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে এখন পর্যন্ত ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেস তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোববার দুপুরে লিখেছে, ‘প্রথম তিনটি নামের বিরুদ্ধে কি কলকাতা পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেবে, নাকি অবৈধ মুখ্যমন্ত্রী নিজেই তাঁদের আড়াল করছেন? দেবদীপ অধিকারী-প্রধান পৃষ্ঠপোষক, শুভেন্দু অধিকারীর ভাইপো, বিজয় ওঝা-পুজোর চেয়ারম্যান এবং বিজেপির বিধায়ক ও তন্ময় ঘোষ পুজোর প্রধান উপদেষ্টা এবং বিজেপি জেলা সভাপতি, উত্তর কলকাতা।’ তৃণমূল কংগ্রেসের প্রশ্ন, ‘তারা কি সমানভাবে দায়ী নয়? মুখ্যমন্ত্রী নিজে চোরবাগান পূজা প্যান্ডেলের উদ্বোধন করেছিলেন, প্যান্ডেলে যাওয়ার সময় কি তিনি নিরাপত্তার ব্যবস্থার বিষয়টি খতিয়ে দেখেননি? হারানো প্রতিটি প্রাণের জন্য কি তাঁকে দায়বদ্ধ করা হবে না।’

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাতিজা দেবদীপ অধিকারীর নাম–সংবলিত পোস্টার

শনিবার রাতেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই দুর্ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে দুর্ঘটনার সব সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ফুটেজে যাঁদের গাফিলতি ধরা পড়বে, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রীর কথামতোই বিপর্যয়ের পর রাতভর জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন চোরবাগান সার্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটির একাধিক কর্তা, ভিআইপি পাস ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি এবং দুই বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীও। তবে পোস্টারে প্রকাশিত নাম থাকা সত্ত্বেও দেবদীপ অধিকারীর নাম গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় নেই। নেই বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা অথবা দলের উত্তর কলকাতার সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষও।

অন্যদিকে দুর্ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের মুখোমুখি হলে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা তাঁর জানা নেই এবং মুখ্যমন্ত্রীর ভাতিজা নাবালক না সাবালক কিংবা তিনি কলকাতায় থাকেন কি না, এসব তথ্য তাঁর জানা নেই। পাশাপাশি, তিনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত থাকার কথা জানিয়ে সেই মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার উত্তর দিতে অপারগতাও প্রকাশ করেন।

ইতিমধ্যে শনিবারের দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে, আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন, যাঁরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রোববার সকালেই কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে বিপর্যয়ে আহত ব্যক্তিদের দেখতে যান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দুর্গাপূজা উপলক্ষে তাঁর নির্ধারিত সব কর্মসূচি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য হাইকোর্টের বর্তমান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠনের ঘোষণা করা হয়েছে এবং ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্তসহ নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে সরকারি সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।