
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী গত এক সপ্তাহে ইরানের বিভিন্ন স্থানে কয়েক শ বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ৩৫ জন নিহত এবং আরও ৩০০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।
হামলার পাশাপাশি ইরানের ওপর আবার নৌ–অবরোধও আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বাহিনী ইরানের দক্ষিণ উপকূল ও হরমুজ প্রণালির আশপাশের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানও ওই অঞ্চলের কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এ পরিস্থিতি আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) মহাসচিব জাসেম আল-বুদাইউই গত বুধবার বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে ইরানের হামলাকে ‘বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ’ কাজ বলে এর নিন্দা জানিয়েছেন।
আলোচনা বা অন্য কোনো কারণে যদি ইরান হরমুজ প্রণালিকে হাতছাড়া করে, তাহলে শুধু চাপ প্রয়োগের এ গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমকেই তারা হারাবে না, বরং আলোচনাসহ অন্য বিষয়গুলোও ইরানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবেমেহদি ইয়াজদি, তেহরানভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক
ইরানের হামলায় বিভিন্ন অবকাঠামো ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কুয়েতের সামরিক বাহিনীর কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন।
জাসেম আল-বুদাইউই বলেন, এ ধরনের হামলা গোটা অঞ্চলকে আরও বেশি বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এক বিবৃতিতে জাসেম এসব হামলাকে নজিরবিহীন উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে উল্লেখ করে ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নীতি-নিয়ম উপেক্ষা করার অভিযোগ তোলেন।
সাম্প্রতিক দিনগুলোয় কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা (ইরানি) ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
ইরানের কোথায় কোথায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে দেশটির বিভিন্ন শহর, দক্ষিণ উপকূলের দ্বীপ ও মূল ভূখণ্ডের একাধিক স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে—আক্কালা, আহভাজ, বাম্পুর, বন্দর আব্বাস, বুশেহর, চাবাহার, চাবাহার বন্দর, দাশত-ই আজাদেগান, দেহলোরান, ফারভার, হাজিয়াবাদ, হোভেইজেহ, ইরানশাহর বিমানবন্দর, ইসফাহান, জাস্ক, কাবুদারাহাং, খোন্দাব, কোনারাক, বন্দর-ই মাহশাহর, কেশম, সিরিক ও ভেসিয়ান।
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার (এসিএলইডি) তথ্য অনুযায়ী, গত মে ও জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের যেসব স্থানে হামলা চালিয়েছে তার মধ্যে বন্দর আব্বাস, বন্দর-ই লেঙ্গেহ, কং, কেশম দ্বীপ ও শহীদ রাহবার নৌঘাঁটির নাম রয়েছে।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় জলসীমায় ৩০টির বেশি দ্বীপ রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি হরমুজ প্রণালির পাশে অবস্থিত এবং সেগুলো ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষাবলয় গঠন করেছে।
এসব দ্বীপ ইরানকে জাহাজ চলাচলের ওপর নজরদারি এবং ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌবাহিনী মোতায়েনের জন্য অগ্রবর্তী অবস্থান প্রদান করে। পাশাপাশি, বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জ্বালানি পরিবহন করিডরের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস অবকাঠামো সুরক্ষায়ও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইরানের যেসব স্থানে হামলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে—আক্কালা, আহভাজ, বাম্পুর, বন্দর আব্বাস, বুশেহর, চাবাহার, চাবাহার বন্দর, দাশত-ই আজাদেগান, দেহলোরান, ফারভার, হাজিয়াবাদ, হোভেইজেহ, ইরানশাহর বিমানবন্দর, ইসফাহান, জাস্ক, কাবুদারাহাং, খোন্দাব, কোনারাক, বন্দর-ই মাহশাহর, কেশম, সিরিক ও ভেসিয়ান।
তেহরানভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মেহদি ইয়াজদি বলেন, ইরানের হাতে প্রতিরোধমূলক চাপ সৃষ্টির একমাত্র কার্যকর উপায় হলো হরমুজ প্রণালি।
ইয়াজদি আরও বলেন, ‘আলোচনা বা অন্য কোনো কারণে যদি ইরান হরমুজ প্রণালিকে হাতছাড়া করে, তাহলে শুধু চাপ প্রয়োগের এ গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমকেই তারা হারাবে না, বরং আলোচনাসহ অন্য বিষয়গুলোও ইরানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।’
তাই, যা–ই হোক না কেন, যত দিন যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের দেশগুলো থেকে ইরানের ওপর হামলা চালাবে, তত দিন সেসব দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ইরানও তাদের ‘নিশানা’ হিসেবে বিবেচনা করবে বলে মত মেহদি ইয়াজদির।
১৭ জুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর থেকে হরমুজ দিয়ে কত জাহাজ চলাচল করল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলা শুরু করার আগে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করত। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল তেলবাহী ট্যাংকার, যেগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করত, যা বিশ্ব বাজারে সরবরাহ করা মোট অপরিশোধিত তেলের এক–পঞ্চমাংশ।
১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার ঘোষণা আসার পর এ জলপথ আবার খুলে দেওয়া হয়, যদিও তখনো জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় অনেক কম ছিল।
পোর্টওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার পর ১৮ জুন থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত প্রথম ২৫ দিনে মাত্র ৬০৩টি জাহাজ এ প্রণালি অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৪টি জাহাজ চলাচল করেছে, যা যুদ্ধের আগের গড় চলাচলের তুলনায় অনেক কম।
এখন আবার পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র আবার নৌ–অবরোধ আরোপ করেছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালিতে আবারও জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাব–এল-মান্দেব প্রণালিও কি বন্ধ হবে
বাব–এল–মান্দেব বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ (মেরিটাইম চোকপয়েন্ট)। এটি লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি হলে ইয়েমেনের হুতিদের সহায়তায় বাব–এল–মান্দেব বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। এর ফলে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি এই জলপথও চাপ সৃষ্টির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।
যদি হরমুজ প্রণালির সঙ্গে এই জলপথও বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ জ্বালানি সরবরাহ এবং এশিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়া বিপুল পরিমাণ রপ্তানি পণ্যের পরিবহন বাধাগ্রস্ত হবে।