
ফুটপাতগুলো নতুন করে রং করা হচ্ছে। জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থাও। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ এখন উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠার নগরী। কারণ, আজ শনিবার সেখানে এমন এক বৈঠক হতে যাচ্ছে, যার দিকে তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব। আর সেই বৈঠক ঘিরেই এত আয়োজন, এত নিরাপত্তা। বৈঠকে যোগ দিতে ইতিমধ্যে ইরানের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রতিনিধিদলও ইসলামাবাদের পথে।
ঠিক ছয় সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে আগ্রাসন শুরু করেছিল। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এর ফলে শুরু হয় এক ভয়াবহ যুদ্ধ। এতে একাধিক দেশে হাজারো মানুষ প্রাণ হারান। বন্ধ হয়ে যায় বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি। আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে জ্বালানি তেলের দাম। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই আজ শনিবার ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে শান্তি আলোচনা বৈঠক।
নিরাপত্তার স্বার্থে ৯ ও ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। তবে পুলিশ, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎ-গ্যাসের মতো জরুরি সেবাগুলো এই ছুটির আওতামুক্ত থাকবে। পুরো শহরজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। রেড জোন সিল করে দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামাবাদে প্রবেশের প্রধান পথগুলোও বন্ধ রাখা হয়েছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার কয়েক দিন পরই এই বৈঠক হচ্ছে। তবে এই যুদ্ধবিরতি এখনই চাপের মুখে পড়েছে। কারণ, লড়াই থামানোর শর্তগুলো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। তার ওপর লেবাননে ইসরায়েল বোমা হামলা আরও জোরদার করেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান শুধু ইসরায়েল নয়, তার প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপরও হামলা চালিয়েছে। এর ফলে বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি রপ্তানি কেন্দ্র এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো এখন চরম অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই তেহরান কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এই পথ দিয়েই বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস আনা-নেওয়া করা হয়।
বর্তমানে ইরান কেবল সেই সব দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে, যারা তাদের সঙ্গে আলাদাভাবে চুক্তি করেছে। ইরানের এই সিদ্ধান্তে বিশ্ববাজার টালমাটাল হয়ে পড়েছে এবং জ্বালানির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে আজ শনিবার শুরু হতে যাওয়া এই বৈঠক কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, এতে কারা যোগ দিচ্ছেন, এতে আলোচনার মূল বিষয়গুলো কী, সম্ভাব্য বাধাগুলো কী এবং বিশ্ব এই বৈঠক থেকে কী আশা করতে পারে—সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাক।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আনুষ্ঠানিকভাবে উভয় পক্ষকে যুদ্ধের একটি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় আজ এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
হোয়াইট হাউস ইসলামাবাদে শনিবারের বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এর আগে, ৮ এপ্রিল ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল জানিয়েছিল, এই আলোচনা ১৫ দিন পর্যন্ত চলতে পারে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিনিধিদলের সদস্যরা আগামীকালের পরেও ইসলামাবাদে অবস্থান করতে পারেন অথবা পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য আবারও পাকিস্তানে ফিরে আসতে পারেন।
প্রতিনিধিদলগুলো ইসলামাবাদের অত্যাধুনিক সেরেনা হোটেলে অবস্থান করবেন। হোটেলটি রাজধানীর অত্যন্ত সুরক্ষিত এলাকা রেড জোনে অবস্থিত। এর পাশেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ও দূতাবাস রয়েছে। আলোচনার প্রস্তুতির জন্য বুধবার সন্ধ্যা থেকে রোববার পর্যন্ত হোটেলের সব বুকিং বাতিল করে অতিথিদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই হোটেলেই মূল আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
নিরাপত্তার স্বার্থে ৯ ও ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল দেশটির সরকার। তবে পুলিশ, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎ-গ্যাসের মতো জরুরি সেবাগুলো এই ছুটির আওতামুক্ত থাকবে। পুরো শহরজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। রেড জোন সিল করে দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামাবাদে প্রবেশের প্রধান পথগুলোও বন্ধ রাখা হয়েছে।
ইরানের ১০ দফা শান্তি প্রস্তাবে বেশ কিছু বড় দাবি রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি প্রতিষ্ঠা করা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন যুদ্ধকালীন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া এবং ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করা।
হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে থাকছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
ইরানের পক্ষে প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তবে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কোনো প্রতিনিধি বৈঠকে থাকবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। যদিও গালিবাফ নিজেই আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার ছিলেন।
পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদাম এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) সংক্ষিপ্তভাবে জানিয়েছিলেন, ‘ইসরায়েল বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে কূটনৈতিক উদ্যোগে বাধা দিলেও, ইরানের প্রস্তাবিত ১০টি পয়েন্টের ভিত্তিতে গুরুতর আলোচনার জন্য আমাদের প্রতিনিধিদল এখানে এসেছে।’ তবে পোস্টটি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি সেটি মুছে ফেলেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আনুষ্ঠানিকভাবে এই আলোচনার আয়োজন করছেন। প্রতিনিধিদলগুলো পৌঁছানোর সময়ের ওপর ভিত্তি করে শনিবার সকালে তিনি দুই পক্ষের সঙ্গে আলাদাভাবে প্রাথমিক বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
পুরো যুদ্ধ চলাকালীন যাঁরা বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে দূতিয়ালি করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। ধারণা করা হচ্ছে, আগামীকালের মূল আলোচনার কাজগুলো তিনিই সমন্বয় করবেন। তবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে সেনাবাহিনী বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল আলাদা আলাদা কক্ষে বসবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করবেন (যাকে শাটল ডিপ্লোম্যাসি বলা হয়)।
এই আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের অন্তর্ভুক্তিকে একটি বড় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে মাস্কট ও জেনেভায় ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে আলোচনা চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করেছিল। এ কারণে ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে তাঁদের নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে তাঁরা মনে করেন, ভ্যান্স এই সংঘাত বন্ধের ব্যাপারে অনেক বেশি আন্তরিক ও উন্মুক্ত।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশী ভ্যান্স মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততার বিরোধী হিসেবে পরিচিত।
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি সরাসরি কভার করার জন্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো থেকে তিন ডজনের বেশি ভিসার আবেদন জমা পড়েছে, যার মধ্যে অন্তত ২০ জন সাংবাদিককে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৩০ সদস্যের একটি মার্কিন নিরাপত্তাদল ইতিমধ্যে ইসলামাবাদে পৌঁছেছে।
লেবানন ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে আলাদা একটি বিরোধ তৈরি হয়েছে। গত বুধবার লেবাননে ইসরায়েলের চালানো ভয়াবহ বোমা হামলায় ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের নাম সামনে এসেছে। অতীতে এই দুই দেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও বর্তমানে ইসলামাবাদের সঙ্গে উভয়েরই ভালো সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষ করে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে কথা বলেছেন।
ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এ ছাড়া ইরানের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস পাকিস্তানে, যা তেহরানের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের মতো পাকিস্তানে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নেই, যা ইরানের কাছে পাকিস্তানের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। আবার ২০০৪ সাল থেকে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটোবহির্ভূত বড় মিত্র হিসেবেও স্বীকৃত।
যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে ইসলামাবাদে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পদটি বেশির ভাগ সময় খালিই থেকেছে এবং বর্তমানেও সেখানে কোনো স্থায়ী রাষ্ট্রদূত নেই। ২০০৬ সালের পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং ২০১১ সালের পর কোনো ভাইস প্রেসিডেন্ট পাকিস্তান সফর করেননি।
দীর্ঘ ১৫ বছর পর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জে ডি ভ্যান্সের এই সফরটি তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত যেসব দেশে স্থায়ী রাষ্ট্রদূত নেই, সেখানে ভাইস প্রেসিডেন্টরা সফর করেন না। কিন্তু একটি ভয়াবহ যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্য বড় হওয়ায় ভ্যান্সের এই সফরকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিরল ও শক্তিশালী কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উভয় পক্ষই বড় ধরনের মতপার্থক্য নিয়ে এই আলোচনায় বসতে যাচ্ছে।
ইরানের ১০ দফা শান্তি প্রস্তাবে বেশ কিছু বড় দাবি রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি প্রতিষ্ঠা করা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন যুদ্ধকালীন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া এবং ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করা।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই শর্তগুলো মেনে নেয়নি। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের এই ১০ দফাকে ‘কার্যকরযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, ইরান তাদের হাতে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ছেড়ে দিতে রাজি আছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট এই বিষয়টিকে একটি ‘অপরিবর্তনযোগ্য দাবি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে ইরান এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরেনিয়াম ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে কোনো সম্মতি জানায়নি।
লেবানন ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে আলাদা একটি বিরোধ তৈরি হয়েছে। গত বুধবার লেবাননে ইসরায়েলের চালানো ভয়াবহ বোমা হামলায় ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে তেহরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি থেকে সরে আসতে পারে। তিনি সাফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে এখন হয় যুদ্ধবিরতি বেছে নিতে হবে, নয়তো ইসরায়েলের মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দায়ভার নিতে হবে।
আরাগচি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বক্তব্য উল্লেখ করে বলেন, যুদ্ধবিরতির শর্তানুযায়ী লেবাননসহ পুরো অঞ্চলেই হামলা বন্ধ রাখার কথা ছিল।
তবে বুদাপেস্টে দেওয়া এক বক্তব্যে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স দাবি করেন, যুদ্ধবিরতির শর্তের মধ্যে লেবানন অন্তর্ভুক্ত ছিল না—যে অবস্থানে ট্রাম্প ও হোয়াইট হাউসও অনড় রয়েছে।
চীনে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদ আল–জাজিরাকে বলেন, আলোচনা শুরুর আগেই পরিস্থিতি বিষিয়ে উঠেছে। তিনি মনে করেন, ইসরায়েল এই শান্তিপ্রক্রিয়া নস্যাৎ করতে বাধা হিসেবে কাজ করছে। লেবাননে তাদের এই নির্বিচার বোমা হামলার উদ্দেশ্য হলো এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে পক্ষগুলো তাদের অবস্থানে আরও অনড় হয়ে পড়ে এবং আলোচনা ভেস্তে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, দুপক্ষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাসের কারণে খুব দ্রুত কোনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছানো কঠিন। ইসলামাবাদে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মোগাদাম তাঁর মুছে ফেলা পোস্টে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তেহরান মনে করে ইসরায়েলের এসব হামলা আসলে আলোচনা নস্যাৎ করার একটি অপচেষ্টা।
বর্তমানে লেবাননই হয়ে উঠেছে আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যখন আলোচনার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তখন সেখানে স্পষ্টভাবে লেবাননের কথা উল্লেখ ছিল। এতে ধারণা করা হয়, ওয়াশিংটনের সঙ্গে এ নিয়ে আগে কথা হয়েছিল।
তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দ্রুত পাকিস্তানের এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেন এবং পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পও যুদ্ধবিরতির আওতা থেকে লেবাননকে বাদ দেন। ইরান অবশ্য লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধের বিষয়ে অনড়। এ ক্ষেত্রে ফ্রান্সের মতো কিছু দেশের সমর্থনও পাচ্ছে তারা। খালিদের মতে, সব চাবিকাঠি এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে।
বিশ্লেষক সাহার খান মনে করেন, লেবানন ইস্যুটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, ইসরায়েল হামলা বন্ধ করলেই কেবল একটি স্থায়ী সমাধান সম্ভব। এর আগে সব আলোচনায় ইসরায়েলই ইরানে হামলা চালিয়ে আলোচনা ভেঙে দিয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের—হয় তারা যুদ্ধবিরতি ভেঙে ইরানে হামলা করবে, নয়তো ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে বাধ্য করবে।
গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফার বলেন, ইসরায়েল এই আলোচনায় না থাকাটা একটি বড় কাঠামোগত সমস্যা। যেহেতু ইসরায়েল এই যুদ্ধের অন্যতম পক্ষ এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পেছনে তাদের স্বার্থ সবচেয়ে বেশি, তাই চূড়ান্ত সমাধানে তাদের অংশগ্রহণ জরুরি। অন্যথায় তারা যেকোনো সময় বলতে পারে, কোনো চুক্তির শর্তে তারা রাজি ছিল না।
তবে মাসুদ খালিদ মনে করেন, দুই পক্ষই যুদ্ধের ক্লান্তিতে ভুগছে এবং একটু বিরতি চায়। তাই শেষ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি ছোটখাটো ঐকমত্য সম্ভব হতে পারে।
চুক্তি হলেও তা নিশ্চিত করার মতো কোনো দেশের গ্যারান্টি বা জামিনদার হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। খালিদ বলেন, কোনো দেশই যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হয়ে গ্যারান্টি দিতে চাইবে না। এমনকি চীনও এমন ঝুঁকি নেবে না। যেকোনো চুক্তির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদেশগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হবে।
সাহার খানের মতে, এখনই জামিনদার খোঁজাটা সময়ের আগে হয়ে যাচ্ছে। এই দফার প্রধান লক্ষ্য হলো পারস্পরিক বিশ্বাস তৈরি করা। যদি যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে শান্ত রাখতে পারে এবং লেবাননে হামলা বন্ধ করাতে পারে, তবে সেটিই হবে বড় সাফল্য এবং ট্রাম্প একে তাঁর বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন।