যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আগ্রাসন শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আগ্রাসন শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান

ইরানে শাসক বদল করতে গিয়ে এখন হরমুজ খুলতে পেরেই খুশি ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতার কারণে হরমুজ প্রণালি এখন পুরোপুরি খুলে যাবে। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরানে আগ্রাসন শুরুর আগে হরমুজ খোলাই ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়।

গত রোববার যুক্তরাষ্ট্র যখন সমঝোতার ঘোষণা দিল, তখনো ইরানে তাদের যুদ্ধের মূল লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে ছিল। ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন ইরানের রাজপথে তাদের সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারী ইরানিদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার নিয়ে। যুদ্ধের শুরুর দিকে এক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ট্রাম্প ইরানিদের বলেছিলেন, তাঁদের নিজেদের দেশ পুনর্দখল করার সময় এসেছে।

কিন্তু সেই গণ-অভ্যুত্থান আর কখনোই ঘটেনি। এরপর প্রায় চার মাসে ইরানের নেতারা ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিধ্বংসী আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষমতা দেখিয়েছেন, বন্ধ করে দিয়েছেন হরমুজ প্রণালি, পঙ্গু করে দিয়েছেন বৈশ্বিক জ্বালানিবাজার। ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে এতটাই গভীর ফাটল ধরিয়েছেন, রোববার নিজের ৮০তম জন্মদিনে ট্রাম্প সাংবাদিকদের কাছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে গালিগালাজ করে কাটিয়েছেন।

যুদ্ধবিরতির চুক্তিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প ও তাঁর শীর্ষ সহযোগীরা বলেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে ইরানের নেতারা কয়েক দশক ধরে বারবার একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন। রোববারও তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কঠিন আলোচনা এখনো বাকি এবং সেটি কেবল তাদের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার পরই শুরু হবে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ। ১৫ জুন ২০২৬, ওমানের মুসান্দাম উপকূল

রোববার সমঝোতার কথা বলা হলেও চুক্তির বিষয় এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তাই পারমাণবিক বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ থেকে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাতের সামগ্রিক ফলাফল মূল্যায়ন করার সময় এখনো আসেনি।

তবে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। ইরানিদের দমনকারী নেতাদের উৎখাত করার আহ্বান জানানোর বদলে এখন জোর দেওয়া হচ্ছে বর্তমান সরকারের সঙ্গে দর–কষাকষির ওপর। শান্তি বিঘ্নিত করতে পারে, এমন যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন প্রেসিডেন্ট, যেমনটা তিনি রোববার নেতানিয়াহুর সঙ্গেও করেছেন।

ট্রাম্প রোববার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা যদি বলেন, তবে আমি কখনোই শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন নিয়ে মাথা ঘামাইনি।’ বর্তমানে ইরানের তৃতীয় সারির নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। আগের দুই স্তরের নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে দলটির সঙ্গে আলোচনা করছি, তাদের মধ্যে সবচেয়ে যুক্তিবাদী দল।

সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে হরমুজ প্রণালির দৃশ্য। ১১ মার্চ ২০২৬

ট্রাম্প ও তাঁর সমর্থকেরা বলছেন, এই যুদ্ধের বড় এক সাফল্য হলো ইরানের শীর্ষ নেতাদের কয়েকটি স্তরকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। এ ছাড়া ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক কর্মসূচির আরও ক্ষতি করা এবং দেশটির প্রথাগত নৌবাহিনীকে নির্মূল করা হয়েছে।

ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে রোববার বলেন, ‘ইরানিরা যদি এই চুক্তি মেনে চলে, তবে এটি আগামী ৫০ বছরের জন্য মধ্যপ্রাচ্যকে মৌলিকভাবে বদলে দেবে।’

তবে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ব্রায়ান কাটুলিস বলেন, ‘এই চুক্তি যদি প্রতিবেদন অনুযায়ী এগিয়ে যায়, তবে এটি ইরানে ‘নির্মম’ একটি সরকারকে ক্ষমতায় রেখে দেবে এবং অঞ্চলটিকে হুমকিতে ফেলার জন্য ব্যবহৃত অধিকাংশ হাতিয়ারেরই নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে—যার মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন। এ ছাড়া লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনে তাদের দুর্বল কিন্তু এখনো বিপজ্জনক আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক থেকে যাচ্ছে।’

কাটুলিস বলেন, ‘ট্রাম্প এখানে প্রকৃত অর্থেই পিছু হটেছেন। তিনি জানতেন, কোনো ভালো সামরিক বিকল্প ছিল না। তাই তাঁকে একধরনের চুক্তিতে পৌঁছাতে হয়েছে। উভয় পক্ষই বিজয়ের দাবি করবে। আগামী চার বা পাঁচ দিন এ নিয়েই কাটবে।’

ট্রাম্প যখন চুক্তি নিয়ে কথা বলছিলেন, তখন ইরানের প্রতি কঠোর মনোভাবাপন্ন তাঁর কিছু কট্টর সমর্থক প্রশ্ন তুলেছেন, এই মুহূর্তে যুদ্ধ শেষ হওয়া বিশ্বকে আরও ভালো কোনো অবস্থানে নিয়ে গেল কি না।

ওমানের মুসান্দাম উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত জাহাজ। ১৮ এপ্রিল ২০২৬

ট্রাম্প–ঘনিষ্ঠ সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম চুক্তির শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ইরানের বিবৃতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতির অমিল থাকায় তিনি চিন্তিত। তিনি বলেন, ‘আইন অনুযায়ী ইরানের সঙ্গে যেকোনো পারমাণবিক চুক্তি পর্যালোচনা এবং ভোটের জন্য কংগ্রেসে পাঠানো হবে। আমি চূড়ান্ত ফলাফলটি পর্যালোচনার অপেক্ষায় আছি। সময়ই বলে দেবে।’

বাইডেন প্রশাসনের অধীনে ইরান ইস্যুতে কাজ করা এবং ২০১৫ সালের ইরান চুক্তি হওয়ার সময় ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান শাপিরো এক্সে লিখেছেন, ইরান জানে কীভাবে এই আলোচনাকে দীর্ঘায়িত করতে হয় এবং সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে সুবিধা আদায় করে নিতে হয়।

শাপিরো বলেন, হরমুজ খুলে দেওয়াটাই এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল। ইরান একটি তাত্ত্বিক সুবিধার জায়গাকে অত্যন্ত বাস্তব এবং শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত করেছে।