
গত সপ্তাহে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন সেনাকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান আলী লারিজানি।
গতকাল শনিবার খুদে ব্লগ লেখার সাইট এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এই দাবি করেন আলী লারিজানি। মার্কিন সেনা আটকের দাবি করলেও এর কোনো সংখ্যা জানাননি তিনি।
লারিজানি লিখেছেন, ‘আমাকে জানানো হয়েছে যে বেশ কয়েকজন আমেরিকান সেনাকে বন্দী করা হয়েছে। তবে আমেরিকানরা দাবি করছেন, ওই সেনারা যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তাঁদের এই বৃথা চেষ্টা সত্ত্বেও সত্য এমন কোনো জিনিস নয়, যেটা বেশি দিন লুকিয়ে রাখা সম্ভব।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে দ্রুতই এই দাবি খণ্ডন করে। লারিজানির পোস্টের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, ‘ইরানি শাসকগোষ্ঠী মিথ্যা ছড়াতে ও প্রতারণা করতে সম্ভাব্য সবকিছুই করছে। এটি তার আরেকটি সুস্পষ্ট উদাহরণ।’
আল–জাজিরা অ্যারাবিককে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) এক মুখপাত্রও হকিন্সের কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। ওই মুখপাত্র বলেন, ‘আমেরিকান সেনা আটকের বিষয়ে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর এই দাবি তাদের মিথ্যাচার ও প্রতারণার আরেকটি উদাহরণমাত্র।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর অন্তত ছয় সদস্য নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই সামরিক অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।
ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থার চলতি সপ্তাহের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে আনুমানিক ১ হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন।
নিহত ব্যক্তির তালিকায় প্রায় ১৮০ শিশু রয়েছে। দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলীয় শহর মিনাবের একটি স্কুলে হামলায় তাদের মৃত্যু হয়।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ওই স্কুলে যুক্তরাষ্ট্রই হামলা চালিয়েছিল।
তবে ট্রাম্প এই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন। প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজ এয়ার ফোর্স ওয়ানে বসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন ট্রাম্প।
গতকাল ট্রাম্প বলেন, ‘আমি যা দেখেছি, তার ভিত্তিতে বলতে পারি, এই কাজ ইরান করেছে।’
ট্রাম্প সেদিন দক্ষিণ ফ্লোরিডার রিসোর্ট ও ডেলাওয়্যারের ডোভার বিমানঘাঁটির মধ্যে যাওয়া–আসা করে দিন পার করেন। ফ্লোরিডায় তিনি লাতিন আমেরিকার কর্মকর্তাদের আতিথেয়তা দিচ্ছিলেন। আর ডোভার ঘাঁটিতে নিহত সেনাদের মৃতদেহ হস্তান্তর করা হচ্ছিল।
যুদ্ধ শুরুর এক দিন পর, ১ মার্চ কুয়েতের একটি বন্দরে ইরানের ড্রোন হামলায় ওই ছয় সেনার সবাই নিহত হন। তাঁরা হলেন ডেকলান কোডি, জেফরি ও’ব্রায়েন, কোডি খোরক, নোয়া টিটজেনস, নিকোল আমোর ও রবার্ট মারজান।
এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে মৃতদেহগুলোর ‘সম্মানজনক হস্তান্তর’ অনুষ্ঠান শেষে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত দুঃখজনক দিন। আমি আনন্দিত যে আমরা আমাদের শ্রদ্ধা জানাতে পেরেছি। এটি কঠিন, এটি একটি কঠিন পরিস্থিতি।’
তারপরও ট্রাম্প যুদ্ধ নিয়ে বেশ আশাবাদী সুরেই কথা বলেছেন। এর অগ্রগতিকে তিনি ‘যথাযথ ও আশানুরূপ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যুদ্ধে বিশাল ব্যবধানে জিতছি। আমরা তাদের পুরো দুষ্ট সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দিয়েছি।’
ট্রাম্প এখনো ইরানে মার্কিন সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা নাকচ করেননি।
গত সোমবার নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, ‘সব প্রেসিডেন্টই বলেন, মাটিতে কোনো বুট পড়বে না (সরাসরি সেনা মোতায়েন হবে না)। আমি এমনটা বলছি না।’
ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের মতো কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এনবিসি নিউজের সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা হতাহতের আশঙ্কা করছি। তবে দিন শেষে এটি বিশ্বের জন্য দারুণ একটি ব্যাপার হতে চলেছে।’
ট্রাম্প অনুমান করেন, এই যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে।
এই যুদ্ধ ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) সমর্থকদের বিভক্ত করে ফেলেছে। প্রেসিডেন্টের এই সর্বশেষ সামরিক অভিযান নিয়ে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন।
সমালোচকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ট্রাম্প কোনো ‘অন্তহীন যুদ্ধে না জড়ানোর’ প্রতিশ্রুতি দিয়েই পুনর্নির্বাচনের প্রচার চালিয়েছিলেন।
ইরানে সরাসরি মার্কিন সেনা মোতায়েনের কথা ভাবছেন ট্রাম্প, এমন খবরের প্রতিক্রিয়ায় রক্ষণশীল মিডিয়া উপস্থাপক মেগান কেলি গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘আমি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারছি না যে, আমরা আবারও এমন কিছু করছি।’
অন্যদিকে সাবেক মার্কিন কংগ্রেস সদস্য মারজোরি টেইলর গ্রিন তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (সবার আগে আমেরিকা) নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্য ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন।
আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের ক্ষোভের বিষয়ে সতর্ক করে টেইলর গ্রিন গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘আর কোনো বিদেশি যুদ্ধ নয় বা আর কোনো শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন নয়, নিজেদের এমন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।’
টেইলর গ্রিন আরও বলেন, ‘আমরা “সবার আগে আমেরিকা” নীতিতে ভোট দিয়েছিলাম। এর অর্থ হলো, সবার আগে আমেরিকানরা এবং শুধুই আমেরিকানরা।’
সংবাদ সংস্থা এনপিআর, পিবিএস ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ম্যারিস্টের শুক্রবারের এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক এই যুদ্ধের বিপক্ষে।
জরিপে অংশ নেওয়া ১ হাজার ৫৯১ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ৫৬ শতাংশই এই সংঘাতের বিরোধিতা করেছেন।
আল–জাজিরার সংবাদদাতা কিম্বার্লি হ্যালকেট বলেন, ‘গত এক সপ্তাহে আমরা যত জরিপের তথ্য দেখেছি, তার সব কটির মতেই এটি একটি অজনপ্রিয় যুদ্ধ।’
‘অধিকাংশ আমেরিকান বিশ্বাস করেন, এই (যুদ্ধের) ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব নয়। সম্ভাব্য প্রাণহানির এই দিক বিবেচনা করলে এ যুদ্ধ কোনোভাবেই চালিয়ে নেওয়া যায় না। এখন পর্যন্ত আমাদের ছয় আমেরিকান নিহত হয়েছেন এবং তাঁদের মরদেহ যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।’