
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতায় গড়ায়নি। দীর্ঘ বৈঠক, নানা প্রস্তাব ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পরও দুই পক্ষের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকায় আশা জাগানো এই আলোচনা ভেস্তে যায়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় ও ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সূত্রের দাবি, আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ার মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ‘কঠোর ও অযৌক্তিক’ অবস্থান। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের কিছু দাবি এমন পর্যায়ের ছিল, যা শুধু আলোচনায় নয়, যুদ্ধের ময়দানেও অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
৪০ দিন যুদ্ধের পর গতকাল শনিবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সরাসরি আলোচনায় বসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। ইরানের পক্ষ নেতৃত্ব দেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ। ২১ ঘণ্টা আলোচনায় কোনো সমঝোতা না হওয়ার পর দুই দেশের প্রতিনিধিরাই আজ ইসলামাবাদ ছেড়ে যান।
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ার পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মাত্র এক বৈঠকেই কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব—এমন প্রত্যাশা কারও ছিল না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি বরাতে এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ার পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মাত্র এক বৈঠকেই কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব—এমন প্রত্যাশা কারও ছিল না।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগেই বলেন, ‘শুরু থেকেই আমাদের এমন আশা করা উচিত ছিল না যে একটি বৈঠকেই সমঝোতা হয়ে যাবে। কারও মনে এমন কোনো প্রত্যাশা ছিলও না।’
ইসমাইল বাগেইর মতে, আলোচনাটি ছিল একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সূচনা মাত্র। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পাকিস্তান এবং ইরানে অন্যান্য বন্ধুরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
আইআরআইবি দাবি করেছে, আলোচনার ব্যর্থতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অযৌক্তিক দাবি’ই মূল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানি প্রতিনিধিদল টানা ২১ ঘণ্টা আলোচনা চালিয়ে গেলেও মার্কিন পক্ষ এমন কিছু শর্ত দিয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিল না।
ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিল থেকে সরে যাওয়ার জন্য কার্যত ‘অজুহাত’ খুঁজছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হওয়ার পর এখন কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছিল ওয়াশিংটন।
ফার্স নিউজ আরও জানায়, হরমুজ প্রণালি, ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা–সংক্রান্ত বেশ কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো ছিল ‘অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী’, যা তেহরান মেনে নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকেরা ইরানকে এমন শর্ত দিয়েছে, যা তারা যুদ্ধের মাধ্যমেও আদায় করতে পারেনি।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচনার পর এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে ইরান জানিয়েছে, এখন উচ্চপর্যায়ের আলোচনা থেকে বিষয়টি কারিগরি পর্যায়ে চলে গেছে। সেখানে উভয় পক্ষ লিখিত প্রস্তাব ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের খসড়া বিনিময় করছে। কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনা অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় টানা আলোচনা শেষে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত অগ্রগতি না এলেও, ইরান জানিয়েছে তারা কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে। তবে ইরানি কিছু সূত্র বলছে, পরবর্তী দফার আলোচনার বিষয়ে এখনো কোনো পরিকল্পনা নেই।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বিমান হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হয়। এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালাতে থাকে, ফলে পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হয়। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অস্থিরতা দেখা দেয় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় টানা আলোচনা শেষে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত অগ্রগতি না এলেও, ইরান জানিয়েছে তারা কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে। তবে ইরানি কিছু সূত্র বলছে, পরবর্তী দফার আলোচনার বিষয়ে এখনো কোনো পরিকল্পনা নেই।
এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি প্রশমনের উদ্যোগ হিসেবে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেয়। দুই পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগের পর ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি বৈঠকের আয়োজন করা হয়। ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।