সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (বাঁয়ে) ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (বাঁয়ে) ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান

ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শেই কি ওপেক ছেড়েছে আমিরাত, সৌদির ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে

জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংগঠন ওপেক থেকে আগামী মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সৌদি আরবের জন্য একটি সতর্কবার্তা। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য আরব আমিরাতে এই সিদ্ধান্ত একটি উপহার হতে পারে। তাদের সিদ্ধান্ত এই সংকেতই দিচ্ছে যে ইরান যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে এই অঞ্চলের পুরোনো দ্বন্দ্বকে আরও উসকে দিচ্ছে।

বাইরে থেকে দেখলে—পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রস্থান হলো সদস্যদেশগুলোর তেল উৎপাদনের সীমা নিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের বিবাদের চূড়ান্ত পরিণতি। রিয়াদ তেলের দাম ধরে রাখতে সরবরাহ সীমিত রাখতে চাইত। আর আমিরাত চাইত, বেশি পরিমাণে উৎপাদন করতে।

গ্লোবাল রিস্ক ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিশ্লেষক আর্নে লোহম্যান রাসমুসেন মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আরব আমিরাত সব সময় বেশি উৎপাদনের পক্ষে ছিল এবং সৌদিরা দাম নিয়ন্ত্রণের পক্ষে ছিল।’

এই মতপার্থক্যের মূলে রয়েছে সৌদি আরব ও আমিরাতের অর্থনীতির ভিন্নতা। সৌদি আরবে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ মানুষের বসবাস। তাদের তেলের মজুত আমিরাতের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি। অন্যদিকে আমিরাতের নাগরিক মাত্র ১০ লাখ। ফলে তেলের লভ্যাংশ ভাগ করার মানুষ সেখানে কম।

ইতিমধ্যে আমিরাত তাদের অবকাঠামোতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে, যাতে তারা আরও বেশি তেল উৎপাদন ও রপ্তানি করতে পারে। এটাকে বিশ্লেষকেরা ‘উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি’ বলে উল্লেখ করছেন।

রাসমুসেন বলেন, ‘উৎপাদনের তুলনায় ওপেক দেশগুলোর মধ্যে আরব আমিরাতেরই সবচেয়ে বেশি উৎপাদনক্ষমতা রয়েছে। আপনি যুক্তি দিতে পারেন, তাদের এই অর্থনৈতিক হিসাবটি সঠিক। কারণ, মাটির নিচে থাকা তেলের মূল্য ৫ বা ১০ বছর পর আজকের মতো না–ও থাকতে পারে।’

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আগ্রাসন শুরুর আগেই সৌদি আরব আসলে আমিরাতের অবস্থানের কাছাকাছি চলে এসেছিল। রিয়াদ একসময় তেল ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে বলেছিল, তেলের সরবরাহ কমানোর বিষয়ে তাদের দৃঢ়তাকে সন্দেহ করলে ‘চরম মূল্য’ দিতে হবে। তবে শেষ পর্যন্ত সৌদি আরব হার মেনে উৎপাদন ব্যাপক বৃদ্ধির পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল।

এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত

সেন্টার ফর দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের জ্যেষ্ঠ ফেলো গ্রেগ প্রিডি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আমিরাত ও সৌদির মধ্যে নীতিগত পার্থক্য অনেক পুরোনো; কিন্তু সৌদি আরব এখন নিজেদের বাজারের দখল ফিরে পেতে সচেষ্ট। বর্তমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাদের পুরোনো যুক্তিগুলো এখন আর আগের মতো জোরালো নেই। তাই আমিরাতের এই প্রস্থান আসলে অনেক বেশি রাজনৈতিক।’

ওপেকের তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদনকারী সদস্যদেশের এই প্রস্থান এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন আবুধাবি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্ররোচিত করছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।

চলতি সপ্তাহে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এই সপ্তাহে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ক্ষুদ্র এই উপসাগরীয় দেশটি যখন ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হচ্ছিল, তখন ইসরায়েল সেখানে ‘আয়রন ডোম’ বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং কারিগরি দল (অবশ্য কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে ইসরায়েলি সেনা) পাঠিয়েছিল।

ওপেকের লোগো

উপসাগরীয় দেশগুলোতে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এসব দেশ মার্কিন অস্ত্রব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ইরানে হামলা না চালানোর অনুরোধ যুক্তরাষ্ট্র উপেক্ষা করায় কিছুটা ক্ষোভ থাকলেও এই অঞ্চলের দেশগুলো শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পাশেই দাঁড়িয়েছে।

সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটির সুবিধা এবং আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে ইরান যুদ্ধে সহায়তা করেছে। তবে একই সঙ্গে তারা তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী পাকিস্তানের মাধ্যমে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকেও সমর্থন দিয়েছে।

বিপরীতে আরব আমিরাত প্রকাশ্যে ও গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তদবির করেছে যেন তারা ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে যায়। একই সঙ্গে পাকিস্তান যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে না পারে, সেই চেষ্টা করেছে।

প্রতিরক্ষা চুক্তির বিনিময়ে ওপেক ত্যাগ

যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় যাবে, নাকি যুদ্ধ চালিয়ে যাবে তা নিয়ে ভাবছে, তখন ওপেকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ট্রাম্পের মন জয়ের একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ, ট্রাম্প দীর্ঘকাল ধরে ওপেক জোটের বিরুদ্ধে ‘পুরো বিশ্বকে ঠকানো’র অভিযোগ করে আসছেন।

আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো এবং ‘সৌদি ইনকরপোরেটেড’-এর লেখক অ্যালেন ওয়াল্ড পেশাজীবীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘এই বিচ্ছেদ সম্ভবত আরব আমিরাত, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো ‘চুক্তির’ ফল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের হামলা থেকে আরব আমিরাতকে রক্ষায় সাহায্য করেছে। বিনিময়ে আমিরাত ওপেকের ওপর বড় আঘাত হেনেছে, যা ট্রাম্প অনেক দিন ধরেই চাচ্ছিলেন।’

অ্যালেন ওয়াল্ড আরও লিখেছেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে আমরা কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তির ঘোষণা দেখতে পেলে অবাক হব না।’

এমন কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যাতে মনে হচ্ছে, আমিরাত দীর্ঘমেয়াদে অস্থিরতার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের অংশীদারত্ব আরও জোরদার করছে। মিডল ইস্ট আই আগেই এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে বলেছেন, এই যুদ্ধ ৯ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হলেও আবুধাবি প্রস্তুত আছে।

চলতি মাসের শুরুতে আরব আমিরাত ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ‘কারেন্সি সোয়াপ লাইন’-এর প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাবের অর্থ হচ্ছে, আমিরাতের নিজস্ব রিজার্ভ ফুরিয়ে গেলেও তারা মার্কিন ডলার ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, আমিরাতের ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্ত সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের বৃহত্তর প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ। রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত ওপেকের বৃহত্তর সংস্করণ ‘ওপেক প্লাস’-এ সৌদিরা আধিপত্য বিস্তার করেছে।

দুবাইয়ের একটি বন্দরে ইরানের হামলা

ওই অঞ্চলে কর্মরত একজন পশ্চিমা কূটনীতিক মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘এটি সৌদি আরবকে খেপিয়ে দেবে। মনে হচ্ছে, আমিরাতের মাথায় বড় কিছু ঘুরপাক খাচ্ছে।’

সৌদি আরব এই অঞ্চলের বৃহত্তম দেশ এবং আমিরাতের মতো তাদেরও বিদেশে প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ইরান যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে সৌদি আরব ইয়েমেনে আমিরাতের মিত্রদের ওপর হামলা চালিয়েছিল। আবার সুদানের গৃহযুদ্ধেও দুই দেশ বিপরীত পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের হামলা নিয়ে এমন জল্পনা তৈরি হয়েছিল, হয়তো যুদ্ধ এই দুই পুরোনো বন্ধুকে আবার কাছাকাছি আনবে; কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, দেখা যাচ্ছে আবুধাবি ও রিয়াদের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরবের অর্থে কেনা পাকিস্তানের অস্ত্রের চালান গত মার্চ মাস থেকে পূর্ব লিবিয়ার খলিফা হাফতারের কাছে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এর মাধ্যমে রিয়াদ মূলত লিবিয়াকে আমিরাতের প্রভাব থেকে সরিয়ে আনতে চাইছে।

ক্ষমতাশীল আরব আমিরাত

আমিরাতের জ্বালানিমন্ত্রী সুহাইল আল-মাজরুই এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়া আমিরাতের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল। এখন যুদ্ধের কারণে এটি এখন সহজ হয়েছে। আমাদের মতে, সময়টি এখন সঠিক। কারণ, বর্তমানে অন্য উৎপাদনকারীদের ওপর এর প্রভাব হবে সামান্য।’

প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বার্নার্ড হেকেল বলেন, জ্বালানি উৎপাদনের বিষয়ে আমিরাতের দৃষ্টিভঙ্গি সৌদি আরবের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর অর্থ হলো তাদের আর সৌদিদের কথা শুনতে হবে না। কারণ, ওপেকের শর্তগুলো নির্ধারণ করে দেয় সৌদি আরব।

বার্নার্ড আরও যোগ করেন, আমিরাত অনেক বছর ধরেই ওপেক ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করছিল। তারা শেষ পর্যন্ত এটি করে ফেলল, সম্ভবত যুদ্ধের কারণেই। এখন সবকিছুই অনিশ্চিত। এই পরিস্থিতিতে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাস্তবিকভাবে আমিরাতের অনেক বেশি অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা আছে। তারা যদি সৌদি আরবের মতো বাজার নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে চায়, তবে তারা তা করতে পারবে। এটি তাদের বড় আকারে শক্তিশালী করবে।

জ্বালানি বিশ্লেষকেরা একমত, এই পদক্ষেপের সময়টি সঠিক। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি অবরোধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যুদ্ধের আগে আমিরাত দৈনিক প্রায় ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করত। এখন তারা ফুজাইরাহ বন্দর পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক ১৯ লাখ ব্যারেল পাঠাচ্ছে, যা হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যায়। তাত্ত্বিকভাবে, আমিরাতের হাতে আরও প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদনের সক্ষমতা অব্যবহৃত রয়ে গেছে।

সেন্টার ফর দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের জ্যেষ্ঠ ফেলো গ্রেগ প্রিডি বলেন, আমিরাত যুদ্ধের আগে ওপেক ছাড়লে তা অনেক বড় ঘটনা হতো; কিন্তু যুদ্ধের কারণে তাদের বাড়তি তেল এখনই বাজারে আসবে না। তবে যুদ্ধ শেষ হলেও বিশ্বজুড়ে মজুতের যে ঘাটতি তৈরি হবে, তাতে আমিরাতের বাড়তি রপ্তানি অনায়াসেই বাজার গ্রহণ করে নেবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে আরব আমিরাতের এই পদক্ষেপ ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও ভেনিজুয়েলার হাত ধরে শুরু হওয়া ৬৫ বছরের পুরোনো জ্বালানি জোটটির মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিতে পারে। রাসমুসেন বলেন, ‘এটি ওপেকের জন্য বিরাট এক ধাক্কা। আমরা হয়তো এর শেষ অধ্যায়টি লিখতে চলেছি।’