মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বে কি ফাটল ধরেছে, কী ভাবছেন ইসরায়েলিরা

একসময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে প্রায় অটুট বলেই মনে করা হতো। তবে গত কয়েক সপ্তাহে সেই সম্পর্ক নিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিক মহল ও গণমাধ্যমে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তৎপরতা এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিয়ে তাঁর প্রকাশ্য সমালোচনা ইসরায়েলে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

অনেক ইসরায়েলি এখন প্রশ্ন তুলছেন, ট্রাম্পকে কি এখনো হোয়াইট হাউসে তাঁদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলা যায়?

এর মধ্যে গত মঙ্গলবার নিউইয়র্ক নগরের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারির ফলাফল সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসরায়েলের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত মেয়র জোহরান মামদানির সমর্থন পাওয়া তিন ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থী ডেমোক্র্যাট–দলীয় কংগ্রেসনাল প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছেন। তাঁরা ইসরায়েলের সমর্থক প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করেন।

এ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের কেউ এখনই চীন বা রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ার কথা বলছেন না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা দ্রুতই ইসরায়েলের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কে ইসরায়েলের কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তেল আবিবের বর্তমান ডেপুটি মেয়র আসাফ জামির বলেন, ‘আমি চরম উদ্বিগ্ন।’ তিনি বলেন, বিজয়ী তিন প্রার্থীই নির্বাচনী প্রচারে ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনাকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অথচ জেরুজালেমের পর নিউইয়র্ক বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইহুদি–অধ্যুষিত শহর।

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, ইসরায়েল হয়তো আর বেশি দিন ওয়াশিংটনের নিঃশর্ত সমর্থন পাবে না। বছরে শতকোটি ডলারের সামরিক সহায়তা, জাতিসংঘে ইসরায়েলবিরোধী প্রস্তাবে মার্কিন ভেটো কিংবা ইসরায়েলি দাতব্য সংস্থাগুলোর জন্য কর-সুবিধা—সবকিছুই ভবিষ্যতে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল সি কার্টজার বলেন, ‘সামনে একটা বড় খাদ আছে। আর আমরা সেই খাদের কিনারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’

মঙ্গলবার নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট–দলীয় প্রাইমারিতে কয়েকজন ইসরায়েলপন্থী প্রার্থীও জয় পেয়েছেন। তবে জোহরান মামদানির সমর্থন পাওয়া ব্র্যাড ল্যান্ডার ও ক্লেয়ার ভালদেজের মতো প্রার্থীদের জয় ইসরায়েলের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত মঙ্গলবার নিউইয়র্ক সিটির ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসনাল প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছেন মেয়র জোহরান মামদানির সমর্থন পাওয়া ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থী ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার

এই প্রার্থীরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যার অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে বিজয়ী আরেক প্রার্থী ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন এবং ক্লেয়ার ভালদেজের মতো দেশটিকে বর্ণবাদী রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

আসাফ জামির দাবি করেন, ‘ঘুম থেকে উঠেই শুনছি, আমাদের গণহত্যাকারী ও বর্ণবাদী বলা হচ্ছে।’ তিনি আরও দাবি করেন, ‘আমি একজন বামপন্থী, দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে বিশ্বাসী এবং শান্তিপ্রিয় ইসরায়েলি। কিন্তু আমি অন্ধ নই। আমি জানি, ইসরায়েলের পরিস্থিতি কী। আমাদের যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, আমরা তেমন নই। অথচ দিন দিন আরও বেশি মার্কিন নাগরিক এসব বিশ্বাস করছেন এবং সেই ভিত্তিতে ভোট দিচ্ছেন। এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে।’

(আসাফের এই দাবি আসলেই কি সত্য? গাজায় যেভাবে ইসরায়েল ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, বাড়িঘর, হাসপাতাল–স্কুল গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, হাজার হাজার শিশু আর বেসামরিক মানুষকে নিশানা বানিয়ে হত্যা করছে, সেটাকে তিনি সঠিক মনে করেন? গাজায় খাদ্যসংকট তৈরি করে যেভাবে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের অনাহার আর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সেটাই কি সঠিক? নেতানিয়াহু সরকার আর উগ্র ইহুদিরা শিশুদের হামাস সদস্য বলে তাদের হত্যাকে যেভাবে সমর্থন করেন, আসাফও কি সেটাকেই সঠিক মনে করেন? কোন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল আছে বলে আসাফ দাবি করেন?)

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের কারণেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

দুই বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে এবং গাজা উপত্যকার বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মনেও।

গত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা কলেজের এক জরিপে দেখা যায়, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মার্কিন নাগরিকেরা ইসরায়েলিদের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতি প্রকাশ করছেন।

এ ছাড়া গত এপ্রিলে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা যায়, ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েলের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ২০২২ সালে এই হার ছিল ৪২ শতাংশ।

নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইসরায়েল পলিসি ফোরামের বিশ্লেষক মাইকেল কোপলো বলেন, ‘আমি ইসরায়েলি হলে কংগ্রেসের কট্টর বামপন্থী তিন-চারজন সদস্যকে নিয়ে এতটা চিন্তিত হতাম না।’

মাইকেল কোপলো বলেন, এই নতুন আইনপ্রণেতাদের জয় ডেমোক্রেটিক দলের ভেতরে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাবের একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

এই বিশ্লেষকের ভাষায়, ‘ইসরায়েলের বিরোধিতা এখন আর কোনো গুরুত্বহীন বিষয় নয়। এটি এখন নির্বাচনী প্রচার এবং মানুষের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।’

ডেমোক্র্যাটদের প্রধান আপত্তি হলো, মানবাধিকার ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এখন বড় ধরনের নৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

নিউইয়র্কে বেড়ে ওঠা ইসরায়েলি জনমত জরিপকারী ডাহলিয়া শিন্ডলিন বলেন, ‘দশকের পর দশক এই বিশেষ সম্পর্ককে চিরস্থায়ী বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল।’

গাজা যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে ডাহলিয়া শিন্ডলিন বলেন, ‘অনেক ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান এখন বুঝতে পেরেছেন, বিশেষ সম্পর্ক ততক্ষণই ভালো, যতক্ষণ ইসরায়েল গাজায় হাজার হাজার শিশুকে হত্যা না করছে। এই নির্মমতার কারণেই মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।’

অন্যদিকে রিপাবলিকান সমালোচকদের প্রধান আপত্তি হলো, ইসরায়েল নিজের যুদ্ধগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে আনছে। তাঁদের প্রশ্ন, দুই দেশের জাতীয় স্বার্থ কি এখনো এক জায়গায় আছে?

২০০০-এর দশকের শুরুতে নিউইয়র্কে ইসরায়েলের কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অ্যালন পিনকাস। তিনি বলেন, ‘৪০ বছর ধরে ইসরায়েল নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক কৌশলগত সম্পদ হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু এখন একটি যৌক্তিক প্রশ্ন উঠেছে—ইসরায়েল কি সত্যিই একটি সম্পদ, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের বোঝায় পরিণত হচ্ছে?’

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে যদি মার্কিন জনগণকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হয়, তাহলে এই প্রশ্ন আরও জোরালো হবে।

তবে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মূল সমর্থনে এখনো বড় ধরনের ফাটল ধরেনি।

বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের কাছে শতকোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি ও জরুরি সামরিক সহায়তা দ্রুত করার ব্যবস্থা করেছে। হামাসের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়েছে, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের ওপর চাপ কমিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ দমনে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে।

তবে সম্পর্কের আরও অবনতি হলে ইসরায়েলের অনেক কিছু হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

ইতিমধ্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনার স্বার্থে ট্রাম্প প্রশাসন আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের, বিশেষ করে লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করছে, যা অনেক ইসরায়েলির কাছেই অকল্পনীয় ছিল।

এ ছাড়া ইসরায়েল এখন আর প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শতকোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পাওয়ার ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও এ বছর ইঙ্গিত দিয়েছেন, ধীরে ধীরে মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমানো উচিত।

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভের একটি চিত্র

বিশ্লেষক মাইকেল কোপলো বলেন, ‘ইসরায়েল সব সময় ধরে নিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই এ ধরনের পদক্ষেপ নেবে না। কিন্তু এখন সেই সম্ভাবনাই তীব্র হয়ে উঠছে।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল সি কার্টজার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতিসংঘে ইসরায়েলের পক্ষে মার্কিন ভেটো প্রায় নিশ্চিত। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

কার্টজারের ভাষায়, ‘এখন এমন একজন খামখেয়ালি প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় আছেন, যিনি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়; বরং কোন সিদ্ধান্তে তাঁর নিজের লাভ হবে, সেটি বিবেচনা করেই পদক্ষেপ নেন।’

দুই দেশের এই টানাপোড়েন এখন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এ সপ্তাহে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক এখন ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে এবং এটি ঠিক করা হবে অত্যন্ত কঠিন কাজ।

বেনেট সতর্ক করে বলেন, ‘ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের চোখে ইসরায়েল একটি বোঝায় পরিণত হয়েছে। এটি আমাদের জন্য এক চরম বিপর্যয়।’

তবে ইসরায়েলিদের জন্য আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া খুব বেশি কিছু করার নেই।

তেল আবিবের ডেপুটি মেয়র আসাফ জামির বলেন, সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসলে মনস্তাত্ত্বিক। তিনি বলেন, ‘আমি সামরিক সহায়তা হারানোর ভয় পাচ্ছি না। সেটা ছাড়াও আমরা বেঁচে থাকতে পারব। আমি আসলে ভয় পাচ্ছি বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সেই ভরসাটুকু হারানোর—যে অনুভূতিটা আমাদের এত দিন সাহস দিয়েছে, যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাদের পেছনে কেউ একজন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’