বাব আল-মানদেব প্রণালি
বাব আল-মানদেব প্রণালি

লোহিত সাগরে জাহাজের সুরক্ষায় সৌদির সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশসহ ১৪ দেশ

ইয়েমেনের বাব আল-মানদেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরবসহ আরও ১৩টি দেশ। এই জোটে এ অঞ্চলের বাংলাদেশ ও পাকিস্তান রয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যৌথ সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করার কাঠামো হিসেবে এই বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট (এমএমডিএ) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

বিবৃতিতে জানানো হয়, এই ১৪টি দেশ এই ৩টি জলপথে নৌ চলাচল নিরাপদ রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের পথ সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।

এসব জলপথ ভারত মহাসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত সামুদ্রিক করিডর গড়ে তুলেছে।

হরমুজ প্রণালি এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটের মূল কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় সৌদি আরব এই সামুদ্রিক সামরিক জোট গঠনের পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়ে থাকে। এ জলপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।

সৌদি আরব ছাড়া এ জোটের স্বাক্ষরকারী দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও কমোরোস।

সম্প্রতি বাব আল-মানদেব, লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর রুটে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধারা সৌদি আরবের জ্বালানিবাহী জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ করার ঘোষণা দিয়েছে। তারা সৌদির তেলবাহী কয়েকটি জাহাজেও হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরবও হুতিদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

যৌথ দায়িত্ব

সামুদ্রিক সামরিক জোট গঠনের এই বৈঠকে আমন্ত্রিত ৫১টি দেশের মধ্যে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধিদলও অন্তর্ভুক্ত ছিল। লোহিত সাগরে আগে থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘অ্যাসপাইডস’ নামে একটি নৌ সুরক্ষা মিশন চালু রয়েছে। ফলে সৌদি নেতৃত্বাধীন এ জোট ঠিক কতটা ভিন্ন হবে, তা স্পষ্ট নয়।

জানা গেছে, এ জোটের স্বাক্ষরকারী দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও কমোরোস।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইরান ঘিরে সংকটের মধ্যে একই ধরনের নিরাপত্তার লক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ওমান কেউই এ জোটে স্বাক্ষর করেনি।

সৌদির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘অন্যান্য দেশের নিজ নিজ জাতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর জোটের সনদে যুক্ত হওয়ার পথ উন্মুক্ত রাখা রয়েছে।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘অংশগ্রহণকারী দেশগুলো দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা যৌথ দায়িত্ব। যৌথ ও আন্তরাষ্ট্রীয় সামুদ্রিক হুমকি মোকাবিলার জন্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয় এর মূল ভিত্তি।’

জোটের প্রতিটি দেশ ঠিক কী ধরনের জাহাজ বা বিমান দিয়ে অবদান রাখবে, সৌদির ঘোষণায় তা উল্লেখ করা হয়নি। তবে তাদের কার্যক্রমের মধ্যে থাকবে গোয়েন্দা তথ্য ও পরিকল্পনা বিনিময় করা; পাশাপাশি যৌথ মহড়া ও সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনা করা।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এ জোট ‘সম্পূর্ণরূপে আত্মরক্ষামূলক প্রকৃতির হবে এবং কোনো দেশকে লক্ষ্য করে এই জোট গঠিত হয়নি’।

সৌদি আরবকে এ জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং এর সদর দপ্তর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে বিবৃতিতে সদর দপ্তরের সঠিক অবস্থান নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি।

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী গত সপ্তাহে সৌদি আরবের ওপর সামুদ্রিক অবরোধ আরোপ করেছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালির পর লোহিত সাগর দিয়ে তেল সরবরাহ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে ইরানে আগ্রাসন শুরুর পর হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয় তেহরান। এর পর থেকে রিয়াদ তাদের সিংহভাগ তেল ‘ইস্ট ওয়েস্ট পাইপলাইন’-এর মাধ্যমে রপ্তানি করছিল। এ পাইপলাইন দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেল শোধনাগারগুলোকে লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

সৌদি আরবে তেলবাহী জাহাজকে অবশ্যই বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে যেতে হয়। ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও ইয়েমেনের মাঝে এ প্রণালি অবস্থিত। সামুদ্রিক এই সংকীর্ণ জলপথের পাশের ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশটি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই অবস্থান সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে লোহিত সাগরে জাহাজগুলোকে নিশানা করার কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে।

প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেলসহ বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১০ থেকে ১২ শতাংশ এ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ হয়ে থাকে। এটি লোহিত সাগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার মাত্র দুটি জলপথের একটি। অন্যটি হচ্ছে সুয়েজ খাল।

বাব আল-মানদেব প্রণালি সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে মাত্র ২৯ কিলোমিটার (১৮ মাইল) চওড়া। এই প্রণালিতে জাহাজ আসা ও যাওয়ার জন্য মাত্র দুটি লেন রয়েছে। তাই এই এলাকায় জাহাজ চলাচলে যেকোনো ধরনের সংকট দেখা দিলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।