নিজের পরিবারের বাড়িঘর ধ্বংসের ভিডিও মুঠোফোনে দেখছেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি ওমর আল-হাসাইনা। মিসরের কায়রোতে, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিজের পরিবারের বাড়িঘর ধ্বংসের ভিডিও মুঠোফোনে দেখছেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি ওমর আল-হাসাইনা। মিসরের কায়রোতে, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তিন বছরের ইসরায়েলি নৃশংসতা কীভাবে গাজাকে ‘নরকে’ পরিণত করেছে

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালানো হয়। হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গাজায় সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। সেই যুদ্ধের তিন বছর পূর্ণ হলো গতকাল বুধবার ৭ অক্টোবর। এ তিন বছরে ফিলিস্তিনের গাজার চেহারা এমনভাবে বদলে গেছে, যে কারণে অবরুদ্ধ উপত্যকাটির অনেক জায়গা এখন আর চেনার উপায় নেই।

ইসরায়েলের টানা বিমান ও স্থল হামলায় গাজা উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস হয়েছে। ঘরবাড়ি ও জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়েছে। অবকাঠামো ও জরুরি পরিষেবাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুদ্ধ প্রায় ২০ লাখ মানুষের জীবন ওলট–পালট করে দিয়েছে। বারবার বাস্তুচ্যুতি ও এলাকা ছাড়ার নির্দেশে পরিবার ও জনপদ ছিন্নভিন্ন হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধে ৭৪ হাজার ২৪৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

২০২৫ সালের অক্টোবরে ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করা হলেও দুর্ভোগের অবসান হয়নি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকে ১ হাজার ৪৬২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে গাজাজুড়ে ইসরায়েলি হামলা ও অন্যান্য সামরিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে।

বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধের কারণে গাজার শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। উপত্যকাটিতে এখন খাবার, পানি, আশ্রয়সহ জীবনের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোই নিত্যদিনের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

প্রতিদিনই বেঁচে থাকার লড়াই

শুধু বসবাসের জায়গা নয়, যুদ্ধ গাজাবাসীর জীবনযাত্রা আমূল বদলে দিয়েছে। দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে সাধারণ কাজগুলো করার ধরনও পাল্টে গেছে।

একটি ঘর, কলের পানি, বিদ্যুৎ কিংবা যাতায়াতের কোনো বাহন-দৈনন্দিন জীবনের এই মৌলিক সুবিধাগুলো গাজার বহু ফিলিস্তিনির জীবনে এখন আর আগের মতো নেই।

জাতিসংঘের হিসাবমতে, গত সেপ্টেম্বরে গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষের জরুরি আশ্রয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রীর প্রয়োজন ছিল। ৬৫ শতাংশ পরিবার তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছিল। এসব আশ্রয় রোদ-বৃষ্টি বা প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে তেমন সুরক্ষা দিতে পারে না।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, আগস্টের শুরুর দিকে জরিপ করা পরিবারগুলোর ৯১ শতাংশ মাঝারি থেকে গুরুতর পানি-সংকটে ভুগছিল। জুনে এই হার ছিল ৮৪ শতাংশ।

ইসরায়েলি হামলা কিংবা জোর করে এলাকা ছাড়ার নির্দেশের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। জাতিসংঘ বলছে, অনেক পরিবারের পর্যাপ্ত বিছানাপত্র, রান্নার সরঞ্জাম ও স্যানিটেশন সুবিধা নেই।

পানি সংগ্রহ করাও এখন প্রতিদিনের বড় চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘের তথ্যমতে, আগস্টের শুরুর দিকে জরিপ করা পরিবারগুলোর ৯১ শতাংশ মাঝারি থেকে গুরুতর পানি-সংকটে ভুগছিল। জুনে এই হার ছিল ৮৪ শতাংশ।

বিদ্যুতের অবস্থাও একই রকম। গাজায় বর্তমানে কার্যকর কোনো বিদ্যুৎ গ্রিড নেই। ফলে জরুরি পরিষেবা ও সাধারণ পরিবারগুলো জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে জ্বালানি, ইঞ্জিন অয়েল ও যন্ত্রাংশের সংকট ক্রমে বাড়ছে।

সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যাতায়াত কঠিন হয়েছে। ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার এবং মৌলিক পরিষেবা পাওয়াও আগের চেয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফলে গাজার বাসিন্দাদের দৈনিক জীবন এখন কেবল বেঁচে থাকার কাজকর্মে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। পানি সংগ্রহ, ফোনে চার্জ দেওয়া, রান্না, কাপড় ধোয়া কিংবা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে কোনো পরিষেবা নেওয়া—সবকিছুর জন্যই এখন আলাদা পরিকল্পনা ও সম্পদের প্রয়োজন হচ্ছে। যুদ্ধের আগে এসব নিয়ে এতটা ভাবতে হতো না।

আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন এক ফিলিস্তিনি তরুণ। গাজা সিটিতে, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অর্থনীতির বিপর্যয়

যুদ্ধে গাজার অর্থনীতি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে। অনেক পরিবারের আয় প্রায় শেষ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা ইউএনসিটিএডিরের হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বেকারত্ব পৌঁছেছে ৭৮ শতাংশে।

২০২৫ সালে গাজার মাথাপিছু জিডিপি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২১২ ডলারে। ২০২২ সালে এই পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৫৩ ডলার। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে গাজার মাথাপিছু জিডিপি ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৮৩ শতাংশ কমেছে।

অর্থনীতির এই পতনের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গাজার অধিকাংশ পণ্য বাণিজ্য ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত সীমান্তপথ দিয়ে হয়ে থাকে। ফলে পণ্য পরিবহনে বিধিনিষেধ যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকাটির অর্থনীতির ক্ষতি আরও বাড়িয়েছে।

যুদ্ধ গাজার সমাজকে কয়েক দশক পেছনে ঠেলে দিয়েছে। পুরোনো অনেক পেশা আবার ফিরে এসেছে। হাতে থাকা সামান্য সরঞ্জাম ও সম্পদ কাজে লাগিয়ে নতুন ধরনের কাজও তৈরি হয়েছে।
রামি আল-জাইগ, অর্থনীতি গবেষক

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। জাতিসংঘের হিসাবে, গত সেপ্টেম্বরে গাজায় পণ্যের দাম ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ২০০ শতাংশ বেশি ছিল।

চাকরি ও আয় হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্রমে ত্রাণসহায়তা, ঋণ ও ছোটখাটো অনানুষ্ঠানিক কাজনির্ভর হয়ে পড়েছে।

অর্থনীতি গবেষক রামি আল-জাইগ আল-জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধ গাজার সমাজকে ‘কয়েক দশক পেছনে ঠেলে দিয়েছে’। পুরোনো অনেক পেশা আবার ফিরে এসেছে। হাতে থাকা সামান্য সরঞ্জাম ও সম্পদ কাজে লাগিয়ে নতুন ধরনের কাজও তৈরি হয়েছে।

গাজার অনেক পরিবার এখন মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর দেওয়া নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীল। তবে হাতে হাতে ব্যবহারের নগদ অর্থও ক্রমে দুর্লভ হয়ে উঠেছে। ফলে মানুষ ডিজিটাল লেনদেন ও ই-ওয়ালেট ব্যবহার করছেন।

পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম

যুদ্ধ গাজার শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছে। তিন বছর ধরে লাখ লাখ শিশু নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনার সুযোগ পায়নি। বহু বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। যেসব বিদ্যালয় এখনো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোর অনেকগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে।

ইউনিসেফের হিসাবে, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৭ লাখ শিশু টানা প্রায় তিন বছর সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল।

২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বেকারত্ব পৌঁছেছে ৭৮ শতাংশে।

শ্রেণিকক্ষে ফেরার বদলে অনেক শিশুকে তাঁবু ও অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রে পড়তে হচ্ছে। প্রায় দুই লাখ শিশুর কোনো ধরনের শিক্ষার কোনো সুযোগই নেই।

দীর্ঘদিন পড়াশোনা বন্ধ থাকায় শিশুদের শেখার ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় মৌলিক দক্ষতায় গুরুতর ঘাটতি ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান শিক্ষাগত ব্যবধানের বিষয়ে সতর্ক করেছে।

প্রায় তিন বছরে শিক্ষা ব্যাহত হওয়ায় পুরো একটি প্রজন্মের দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাজীবন হুমকির মুখে পড়েছে।

বিপর্যস্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা

গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, গাজার ৩৬টি হাসপাতালের সব কটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে মাত্র ১৯টি হাসপাতাল কোনো না কোনোভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর একটিও পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না।

যেসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখনো চালু আছে, সেগুলোয় জরুরি ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, রোগনির্ণয়ের উপকরণ ও জ্বালানির তীব্র সংকট রয়েছে। এ কারণে ক্যানসারের চিকিৎসা, ডায়ালাইসিস এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে।

গাজার বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগও সীমিত। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় ১২ হাজার ৪০০ রোগীকে চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে নেওয়া হয়েছে।

তবে ডব্লিউএইচও বলছে, আরও কয়েক হাজার মানুষের এমন বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রয়োজন, যা গাজার ভেতরে পাওয়া যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার পতনের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার অবনতিও যুক্ত হয়েছে। ফলে জনস্বাস্থ্যের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

গত সেপ্টেম্বরে ডব্লিউএইচও সতর্ক করে বলেছিল, অতিরিক্ত জনসমাগম, অপর্যাপ্ত আশ্রয় এবং পানি ও স্যানিটেশনের সংকট রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

সংস্থাটি বলেছে, ক্রমবর্ধমান এসব ঝুঁকি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার নেই। এ জন্য নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনর্বাসন এবং আরও বেশি রোগীকে চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ডব্লিউএইচও।

ক্রমেই ছোট হচ্ছে গাজার পরিসর

যুদ্ধ গাজার ভৌগোলিক চিত্রও বদলে দিয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও চলাচলে বিধিনিষেধ গাজাকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করেছে।

ফিলিস্তিনিদের ক্রমে আরও ছোট একটি এলাকার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিজেদের বাড়িঘর, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন তাঁরা।

তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ (গাজার ভেতরে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন ও প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকা এলাকা চিহ্নিতকারী সামরিক সীমারেখা) এই পরিবর্তনের একটি অংশ।

২০২৫ সালের অক্টোবরের ‘যুদ্ধবিরতির’ আওতায় এই সীমারেখা তৈরি করা হয়েছে। এরপর ইসরায়েল এটি আরও ভেতরের জনবসতিপূর্ণ এলাকায় সরিয়ে নিয়েছে। এ কারণে পরিবারগুলোকে নিজেদের এলাকা ছাড়তে হয়েছে।

ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর গত সেপ্টেম্বরে জানিয়েছে, ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রবেশে বিধিনিষেধ গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে। ফলে ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি গাজা উপত্যকার ৩০ শতাংশেরও কম এলাকার মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছেন।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলোর একটি রাফা শহর। গাজার দক্ষিণে মিসরের সীমান্তবর্তী এই শহর যুদ্ধের সময় গাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত ১০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনির আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল।

জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৪ সালের মে মাসে রাফায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে আট লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।

বর্তমানে পশ্চিমের আল-মাওয়াসি রাফাহ এলাকা ছাড়া রাফার প্রায় পুরোটাই ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। ফলে শহরটি থেকে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারছেন না।

ইউরো-মেড গত ২৯ সেপ্টেম্বর সতর্ক করে বলেছে, ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত এলাকার বিস্তার জোর করে বাস্তুচ্যুতিকে স্থায়ী রূপ দিচ্ছে। ফিলিস্তিনিরা নিজেদের বাড়িঘর ও জমিতে যেতে পারছেন না। সেখানে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তাও তাঁদের নেই।

যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত আল-হাসাইনা পরিবারের প্রতিষ্ঠানের গুদামের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন এক ফিলিস্তিনি তরুণ। গাজা সিটিতে, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থা

যুদ্ধের আগে ২০০৭ সাল থেকে গাজা শাসন করে আসছিল হামাস। বেসামরিক প্রশাসন ও নিরাপত্তা পরিষেবাও পরিচালনা করত সংগঠনটি। যুদ্ধ সেই ব্যবস্থা তছনছ করে দিয়েছে। গাজার বেসামরিক প্রশাসনের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

গত জুলাইয়ে হামাস ঘোষণা দেয়, তারা গাজার প্রশাসনিক ক্ষমতা ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজার (এনসিএজি) কাছে হস্তান্তর করবে। যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনার আওতায় গঠিত এটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের একটি সংস্থা। তবে এখনো সেই ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি।

যুদ্ধ জনশৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে দিয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী বারবার পুলিশ সদস্য ও নিরাপত্তাচৌকিতে হামলা চালিয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে পুলিশের ওপর অন্তত ১২টি হামলা হয়েছে। এসব হামলায় ৫৩ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৫ জন পুলিশ সদস্য।

জাতিসংঘ বলেছে, জনপরিচালনার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করায় বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষাও দুর্বল হয়েছে।

ফিলিস্তিন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসও একই ধরনের সতর্কতা জারি করেছে। সংস্থাটি বলেছে, পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীদের ওপর হামলা গাজার বেসামরিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে।

এ কারণে নিরাপত্তাশূন্যতা তৈরি হয়েছে। অপহরণ, সম্পত্তির ওপর হামলা এবং মানবিক ত্রাণ লুটের ঘটনাও ঘটছে।

তিন বছরের যুদ্ধের পর গাজার মানুষের সামনে এখন গভীর অনিশ্চয়তা। সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট কোনো পথও তাঁদের সামনে নেই।