১৯৬৭ সালের আরব–ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি ট্যাংকের গোলার আঘাতে আগুনে পুড়ছে মিসরের একটি সামরিক পরিবহনযান
১৯৬৭ সালের আরব–ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি ট্যাংকের গোলার আঘাতে আগুনে পুড়ছে মিসরের একটি সামরিক পরিবহনযান

ফিরে দেখা

ইসরায়েলি প্রতারণায় শুরু হওয়া যে সংঘাত বদলে দিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের চিত্র

১৯৬৭ সালের জুন মাসে মাত্র ৬ দিনের এক যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের চেহারাই বদলে দিয়েছিল। কিন্তু সেই যুদ্ধের প্রভাবে তৈরি হওয়া সংকট আজও শেষ হয়নি।

ওই যুদ্ধ শুধু কয়েকটি দেশের সীমানা বদলায়নি—বদলে দিয়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা। ফিলিস্তিন প্রশ্নের চরিত্র পাল্টে গেছে। আরব-ইসরায়েল সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা তৈরি হয়েছে। গাজা, পশ্চিম তীর বা জেরুজালেম নিয়ে আজ যে সংঘাত চলছে, তার অনেকটুকু শিকড় ওই ছয় দিনেই প্রোথিত।

গাজায় যখন বোমা হামলা হয়, পশ্চিম তীরে যখন উত্তেজনা ছড়ায়, জেরুজালেম নিয়ে যখন বিশ্বনেতারা তর্ক করেন—প্রতিবারই কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসে সেই ছয় দিনের প্রসঙ্গ। কারণ, আজকের মধ্যপ্রাচ্যের অনেক সংকটের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল তখন।

কিন্তু ওই যুদ্ধ কেন হয়েছিল? কারা এর জন্য দায়ী? আর কেনই–বা প্রায় ছয় দশক পরেও এই যুদ্ধের ছায়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য বের হতে পারছে না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে আরও পেছনে।

যুদ্ধের আগের মধ্যপ্রাচ্য

১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আরব বিশ্বের সঙ্গে দেশটির সংঘাত চলছিল। ওই বছরই শুরু হয় প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে ইসরায়েল টিকে গেলেও পুরো ফিলিস্তিন তাদের নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম রয়ে যায় জর্ডানের হাতে, গাজা মিসরের নিয়ন্ত্রণে। লাখো ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়ে ছড়িয়ে পড়েন আশপাশের আরব দেশগুলোতে।

বিষয়টি সেখানেই থামেনি। যুদ্ধ–পরবর্তী বছরগুলোয় ইসরায়েলের ভেতরে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ধারা মনে করত, ১৯৪৮ সালে তাদের কাজ অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। জেরুজালেমের পুরোনো শহর, পশ্চিম তীর এবং বাইবেলের সঙ্গে যুক্ত ফিলিস্তিনের বহু এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গেছে।

পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত নথি, স্মৃতিকথা ও ইতিহাসবিদদের গবেষণায় দেখা যায়, ইসরায়েলের ভেতরে অনেকেই মনে করতেন, ভবিষ্যতে পুরো ফিলিস্তিন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে আসা উচিত। তখন থেকেই মূলত পুরোপুরিভাবে ফিলিস্তিন দখলের ছক আঁকছিল ইসরায়েল।

ইসরায়েলের ভেতরে অনেকেই মনে করতেন, ভবিষ্যতে পুরো ফিলিস্তিন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে আসা উচিত। তখন থেকেই মূলত পুরোপুরিভাবে ফিলিস্তিন দখলের ছক আঁকছিল ইসরায়েল।

অন্যদিকে সে সময় আরব বিশ্বে দ্রুত উত্থান ঘটেছিল মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসেরের। তিনি শুধু মিসরের নেতা ছিলেন না, তিনি আরব জাতীয়তাবাদের মুখ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল বিভক্ত আরব বিশ্বকে এক রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা। সুয়েজ খালকে পশ্চিমাদের হাত থেকে উদ্ধার করে জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়ার পর তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়। আরব বিশ্বের অনেকেই বিশ্বাস করতেন, নাসের একদিন ইসরায়েলকে মোকাবিলা করতে পারবেন।

দুই পক্ষের এই বিরোধী অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যকে ধীরে ধীরে একটি নতুন সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।

উত্তেজনা যেভাবে বাড়ল

১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়। পানিসম্পদ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। ফিলিস্তিনি গেরিলারা সিরিয়া থেকে ইসরায়েলের ভেতরে হামলা চালাতে থাকেন। ইসরায়েল পাল্টা আক্রমণ করলে পুরো অঞ্চল অস্থির হয়ে ওঠে।

১৯৬৬ সালের নভেম্বরে জর্ডানের পশ্চিম তীরের আল-সামু গ্রামে ইসরায়েলি হামলায় ১৮ জন নিহত ও ৫৪ জন আহত হন। ১৯৬৭ সালের এপ্রিলে সিরিয়ার সঙ্গে আকাশযুদ্ধে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী সিরিয়ার ছয়টি মিগ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে।

ওই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন মিসরকে একটি তথ্য দেয়। তারা দাবি করে, ইসরায়েল নাকি সিরিয়ার বিরুদ্ধে বড় আকারের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরে এই তথ্য ভুল প্রমাণিত হয়। কিন্তু মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের তখন সেটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছিলেন। তিনি মনে করলেন, সিরিয়ার ওপর হামলা হলে আরব বিশ্বের নেতা হিসেবে তাঁর নীরব থাকার সুযোগ নেই। কারণ, এর আগে সিরিয়া ও জর্ডানকে সাহায্য না করার কারণে আরব বিশ্বে নাসের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।

১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের হামলায় ধ্বংস হওয়া মিসরীয় সাঁজোয়া যান সিনাইয়ের একটি সড়কের পাশে পড়ে আছে

এমন পরিস্থিতিতে আরব বিশ্বে নিজের ভাবমুর্তি ঠিক রাখতে তৎপর হন জামাল আবদেল নাসের। ১৪ মে তিনি সিনাই উপদ্বীপে বিপুল মিসরীয় সেনা মোতায়েন করেন। এরপর সেখান থেকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল তিরান প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। এই প্রণালি দিয়ে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামুদ্রিক যোগাযোগ চলত। ইসরায়েল বহু আগেই ঘোষণা করেছিল, তিরান প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হলে তারা সেটিকে যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য বলে মনে করবে।

অন্যদিকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে তৎপর হয়ে ওঠে জর্ডান। দেশটির বাদশা হোসেন ইসরায়েলি বাহিনীকে মোকাবিলার জন্য ৩০ মে কায়রোতে এসে মিসরের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেন এবং জর্ডানের বাহিনীকে মিসরীয় কমান্ডের অধীনে ন্যস্ত করেন। এরপর ইরাকও এই জোটে যোগ দেয়। সিরিয়া আগে থেকেই মিসরের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ছিল।

আরব দেশগুলোর এই জোট ইসরায়েলের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা আগে থেকেই শুরু হওয়া উত্তেজনায় ঘি ঢালার কাজ করে।

আরব দেশগুলোর জোট ইসরায়েলের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা আগে থেকেই শুরু হওয়া উত্তেজনায় ঘি ঢালার কাজ করে।

আত্মরক্ষা, নাকি পূর্বপরিকল্পিত যুদ্ধ

নাসেরের পদক্ষেপগুলোকে ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্ব প্রচার করতে শুরু করে, মিসরের প্রেসিডেন্ট আরব দেশগুলোকে নিয়ে ইসরায়েলের অস্তিত্ব মুছে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যুদ্ধের পর ইসরায়েলের সরকারি বয়ানও ছিল এমনই। বলা হয়, দেশটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছিল এবং আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করা ছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্প ছিল না।

কিন্তু পরবর্তী দশকগুলোতে প্রকাশিত নথি এবং কিছু ইসরায়েলি নেতার বক্তব্য এই ব্যাখ্যাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

যুদ্ধকালীন লজিস্টিক কমান্ডের প্রধান জেনারেল মাতিতিয়াহু পেলেদ স্বীকার করেছেন, ইসরায়েলের অস্তিত্ব ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘১৯৬৭ সালে ইসরায়েলে গণহত্যার হুমকি ছিল—এই গল্পটা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। যুদ্ধের পরে তৈরি করা।’

ছয় দিনের যুদ্ধের সময় মেনাখেম বেগিন ছিলেন ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার সদস্য। পরবর্তী সময়ে তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৮২ সালে তিনিও স্বীকার করেন, নাসেরের সেনা মোতায়েনের বিষয়টিকে ইসরায়েল নিশ্চিত হামলার হুমকি হিসেবে দেখেনি; বরং ইসরায়েল আগে থেকেই হামলার পরিকল্পনা করেছিল।

যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছে ইসরায়েলি ট্যাংকের বহর

যুদ্ধকালীন সেনাপ্রধান মোশে দায়ানও পরে বলেছিলেন, মিসরীয় বাহিনী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা তাৎক্ষণিক বিপদের মুখে ছিল না।

ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ইলান পাপেসহ আরও কিছু গবেষকের মতে, যুদ্ধকে পরে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন এটি ছিল সম্পূর্ণ অনিবার্য এক আত্মরক্ষার লড়াই। তাঁদের যুক্তি, এই বয়ান পরবর্তী দখলদারত্বকে নৈতিক বৈধতা দিতে সাহায্য করেছে।

অবশ্য সব ইতিহাসবিদ এ বিষয়ে একমত নন। অনেকে মনে করেন, নাসেরের পদক্ষেপগুলো—বিশেষত তিরান প্রণালি বন্ধ করা এবং সিনাই থেকে জাতিসংঘের বাহিনী সরিয়ে দেওয়া—ইসরায়েলের উদ্বেগকে সম্পূর্ণ অমূলক বলার সুযোগ দেয় না। তাঁদের মতে, নাসের হয়তো সরাসরি যুদ্ধ চাননি, কিন্তু তাঁর পদক্ষেপগুলো পরিস্থিতিকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, যেখান থেকে ফেরা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

ছয় দিনে বদলে গেল মানচিত্র

৫ জুন ভোরে ইসরায়েল মিসরের বিমানঘাঁটিগুলোতে আকস্মিক হামলা চালায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মিসরের বিমানবাহিনীর ৯০ শতাংশের বেশি বিমান মাটিতেই ধ্বংস হয়ে যায়। একই সময়ে সিরিয়ার বিমানবাহিনীকেও অকেজো করে দেওয়া হয়।

বিমান সহায়তা ছাড়া স্থলযুদ্ধে মিসরীয় বাহিনী অসহায় হয়ে পড়ে। তিন দিনের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী গাজা এবং সিনাই উপদ্বীপের পুরোটা সুয়েজ খালের পূর্ব তীর পর্যন্ত দখল করে নেয়।

পূর্ব রণাঙ্গনেও একই দিনে যুদ্ধ শুরু হয়। ইসরায়েলের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে জর্ডানের বাহিনী পশ্চিম জেরুজালেমে গোলাবর্ষণ শুরু করলে ইসরায়েল পাল্টা আঘাত হানে। ৭ জুনের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী জর্ডানের সেনাদের পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরের অধিকাংশ এলাকা থেকে হটিয়ে দেয়। পুরোনো জেরুজালেম শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সেই দৃশ্য ছয় দিনের যুদ্ধের সবচেয়ে আলোচিত ছবিগুলোর একটি হয়ে আছে।

ছয় দিনের মধ্যে ইসরায়েল গাজা, সিনাই উপদ্বীপ, পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র আর আগের মতো থাকেনি।

৭ জুন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায়। ইসরায়েল ও জর্ডান সঙ্গে সঙ্গে তাতে রাজি হয়, মিসর পরদিন রাজি হয়। কিন্তু সিরিয়া যুদ্ধবিরতি মানতে অস্বীকার করে উত্তর ইসরায়েলের গ্রামগুলোতে গোলাবর্ষণ চালিয়ে যায়। ৯ জুন ইসরায়েল গোলান মালভূমিতে আক্রমণ শুরু করে। এক দিনের তীব্র লড়াইয়ের পর সিরীয় বাহিনী পিছু হটে এবং ১০ জুন সিরিয়া যুদ্ধবিরতি মেনে নেয়।

ছয় দিনের মধ্যে ইসরায়েল গাজা, সিনাই উপদ্বীপ, পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র আর আগের মতো থাকেনি।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলে পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরের দখল। কারণ, এই ভূখণ্ডই ছিল ফিলিস্তিনি জাতীয় আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র। পূর্ব জেরুজালেমে রয়েছে ইহুদি, মুসলিম ও খ্রিষ্টান—তিন ধর্মের পবিত্র স্থানসমূহ। এই শহরের নিয়ন্ত্রণ তাই শুধু ভূরাজনৈতিক নয়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও অত্যন্ত সংবেদনশীল।

ছয় দিনের যুদ্ধে সাফল্যের পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন ইসরায়েলি সেনারা

ব্যর্থ রাজনৈতিক সমাধান

যুদ্ধের পর অনেকে আশা করেছিলেন, দখলকৃত ভূখণ্ড নিয়ে দ্রুত কোনো রাজনৈতিক সমাধান হবে। সেই আশার প্রতিফলন ঘটে একই বছরের নভেম্বরে, যখন নিরাপত্তা পরিষদ ২৪২ নম্বর প্রস্তাব পাস করে। প্রস্তাবে বলা হয়, ইসরায়েলকে দখলকৃত ভূখণ্ড থেকে সরে যেতে হবে এবং অঞ্চলটির সব রাষ্ট্রের নাগরিকদের শান্তিতে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পরবর্তী দশকগুলোতে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি থেকে শুরু করে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের সব কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ভিত্তি হয়ে উঠেছিল এই প্রস্তাব।

কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টো। কয়েক মাসের মধ্যেই পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন শুরু হয়। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে যায়, ইসরায়েলের ক্ষমতাবান একটি অংশ এসব এলাকা স্থায়ীভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। বসতি স্থাপনের এই প্রক্রিয়া পরবর্তী দশকগুলোতে আরও বিস্তৃত হয়। আজ পশ্চিম তীরে কয়েক লাখ ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী বাস করেন, যা আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ বলে বিবেচিত।

ফিলিস্তিনিদের জীবনে নতুন বাস্তবতা

যুদ্ধের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে ফিলিস্তিনিদের। যুদ্ধ শেষে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি মানুষ নতুন করে উদ্বাস্তু হয়ে পড়েন। ১০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি সরাসরি ইসরায়েলি সামরিক শাসনের অধীনে চলে যান। পশ্চিম তীর ও গাজায় তল্লাশিচৌকি, ভূমি অধিগ্রহণ, বসতি সম্প্রসারণ ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। চলাফেরা, কাজ, শিক্ষা—সবকিছুতেই সামরিক নিয়ন্ত্রণের ছাপ পড়তে থাকে।

১৯৪৮ সালের যুদ্ধে যেসব ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকে আশ্রয় নিয়েছিলেন গাজা বা পশ্চিম তীরে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে সেই এলাকাগুলোও ইসরায়েলের দখলে চলে যায়। ফলে ফিলিস্তিনিদের একটি বড় অংশ দ্বিতীয়বারের মতো বাস্তুচ্যুতির মুখে পড়েন।

যুদ্ধের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে ফিলিস্তিনিদের। যুদ্ধ শেষে লাখো মানুষ নতুন করে উদ্বাস্তু হয়ে পড়েন। ১০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি সরাসরি ইসরায়েলি সামরিক শাসনের অধীনে চলে যান।

আরব বিশ্বে গভীর আঘাত

ছয় দিনের যুদ্ধে পরাজয় ছিল আরব বিশ্বের জন্য রাজনৈতিকভাবে বিধ্বংসী। শুধু ভূখণ্ড নয়, মানবিক ক্ষতিও ছিল অপ্রতিসম। মিসরের ১১ হাজারের বেশি সেনা নিহত হন, জর্ডানে নিহতের সংখ্যা ৬ হাজার এবং সিরিয়ায় ১ হাজার। অন্যদিকে ইসরায়েলে নিহত হন প্রায় ৭০০ জন। আরব বাহিনীগুলো একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জামও হারায়।

পরাজয়ের খবরে নাসের ৯ জুন পদত্যাগের ঘোষণা দেন। কিন্তু তাঁকে ক্ষমতায় রাখার দাবিতে রাস্তায় নামেন লাখো মিসরীয়। জনমতের চাপে তিনি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন। তবু তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি আর আগের জায়গায় ফেরেনি। ১৯৭০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর আরব জাতীয়তাবাদের এই ধারা আর কখনো আগের শক্তি ফিরে পায়নি।

সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে থাকে নতুন ধারার আন্দোলন। পরবর্তী দশকগুলোতে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান ঘটে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড, ফিলিস্তিনে হামাস—এই আন্দোলনগুলোর শক্তিবৃদ্ধির পেছনে ১৯৬৭ সালের পরাজয়ের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।