
ইরান যুদ্ধের ধাক্কা ও এর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের চিরশত্রু দেশগুলোও এখন একটি শান্তিচুক্তির পক্ষে একজোট হয়েছে। ইসরায়েল ও ওয়াশিংটনে তেল আবিব সমর্থকদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও তারা ট্রাম্প প্রশাসনকে একটি খসড়া চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করেছে।
এসব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এমন এক সময়েই ঘটছে, যখন ওই অঞ্চলের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নিজেদের নতুন করে সাজাচ্ছে। বিশেষ করে যখন ওয়াশিংটন ইরানের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানতে, হরমুজ প্রণালি জোরপূর্বক উন্মুক্ত করতে কিংবা তাদের উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
অবশ্য এ অঞ্চলে তেহরানের বন্ধু খুব কমই আছে। তবে দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে যাওয়ার কারণে প্রতিবেশীরা বাধ্য হয়েই তাদের সঙ্গে একটি সমঝোতার পথ খুঁজছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিয়েগ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো (যুক্তরাষ্ট্রে) লাখ লাখ কোটি ডলার বিনিয়োগ করার পরও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় ওয়াশিংটন যেভাবে সবার আগে ইসরায়েলকে রক্ষা করেছে, এ ঘটনা তাদের হতবাক করেছে।
আন্দ্রেয়াস বলেন, ‘আমরা সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের শেষ দিনগুলো দেখছি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতার ওপর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর মোহ পুরোপুরি কেটে গেছে।’
তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি চুক্তির রূপরেখা তৈরির জন্য গত সপ্তাহের শেষ দিকে পাকিস্তান ও কাতারের কর্মকর্তারা ইরানে যান। তাঁদের এ চূড়ান্ত চেষ্টার পরই একটি খসড়া চুক্তিতে সবাই একমত হন। গত শনিবার আটটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নেতারা ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তাঁরা তাঁকে এমন একটি চুক্তি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান, যার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হবে, হরমুজ প্রণালি খুলে যাবে এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হবে।
যুদ্ধের আগে এসব দেশ ওয়াশিংটনের কাছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুক্তির কাছে হেরে গিয়েছিল। কিন্তু এবার তারা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে পেছনে ফেলতে পেরেছে। নেতানিয়াহুও একই দিনে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এখন ঘোষণা দিয়েছেন যে চুক্তির বিষয়ে ‘অনেকটাই আলোচনা হয়ে গেছে’।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান ইস্যুতে নেতানিয়াহুকে ‘আমি যা বলব, তিনি তা-ই করবেন।’ গত সোমবার টাইমস অব ইসরায়েল পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণী খবরের শিরোনাম ছিল, ‘ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে ইরান যুদ্ধ শুরু করেছিল, আর এখন সাইডলাইনে থেকে তা শেষ করছে’।
এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল এবং নিজেরাও বিমান হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু এখন তারাও সৌদি আরব, কাতার, জর্ডান, বাহরাইন, পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরের পাশাপাশি শান্তিচুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
এ অঞ্চলে একমত হওয়ার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মধ্যকার প্রভাব বিস্তারের তিক্ত লড়াই কিছুটা কমেছে বলে মনে হচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহে এ দুই দেশের শাসকদের মধ্যে বেশ কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে।
যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে ট্রাম্পের বিখ্যাত আব্রাহাম চুক্তিতে নতুন করে অন্য দেশগুলোর যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এ চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল ইসরায়েল ও বেশ কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করা। গত শনিবার কনফারেন্স কলে ট্রাম্প যখন আরও দেশকে এ চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান, তখন সবাই চুপ ছিল বলে জানা গেছে। এ মধ্যস্থতাপ্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিয়েছে পাকিস্তান (ইসলামাবাদ)। তারা বলেছে, মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বিভেদ থাকলে তা কেবল ইসরায়েলেরই সুবিধা করে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খান বলেন, ইসলামাবাদের আসল সাফল্য হলো, অন্যান্য দেশকেও শান্তিপ্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে পারা। তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব ও কাতার নিজ নিজ জায়গা থেকে এ প্রচেষ্টাকে সমর্থন জুগিয়েছে।
মাসুদ খান বলেন, পাকিস্তান একা এ পথে এগোতে পারত না। নিজেদের মধ্যস্থতাকে আরও গ্রহণযোগ্য করতে তাদের চারপাশের সমর্থন প্রয়োজন ছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে এক ডজনের বেশি ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আছে এবং তা ভবিষ্যতেও থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন নিজেদের অঞ্চলে এবং এর বাইরে নতুন নিরাপত্তাসঙ্গীর খোঁজ করছে, যেখানে ইউরোপ আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যুদ্ধের সময় সৌদি আরবকে রক্ষায় সেনা ও যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছিল পাকিস্তান।
অন্যদিকে, মিসরের সবচেয়ে বড় আর্থিক সহায়তাকারী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে মিসরের সৈন্য ও বিমান মোতায়েন করা হয়েছিল। এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে একে অপরের ওপর হামলা না করার চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবদুল খালেক আবদুল্লাহ বলেন, তাঁর দেশ চেয়েছিল ইরানের কাছে যেন কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন না থাকে, তারা যেন প্রক্সি যুদ্ধ না করে এবং তাদের কোনো পারমাণবিক কার্যক্রম না থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা অসম্ভব বলে প্রমাণিত হয়েছে।
আবদুল্লাহ বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত খুবই বাস্তববাদী একটি দেশ। ইরান এখনো বড় এক হুমকি। তবে ২০ বছর ধরে আমরা যে ক্ষমতাশালী ইরানকে দেখেছি, তারা এখন আর তেমন নেই।’
আবদুল্লাহ বলেন, নতুন এক মধ্যপ্রাচ্যের উত্থান ঘটছে, যেখানে দুর্বল হয়ে পড়া তেহরানের শূন্যতা পূরণ করতে তুরস্ক, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করছে।
নতুন উদীয়মান এক অক্ষ গড়ে উঠছে সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে, যারা গত বছর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এ ব্যবস্থার মধ্যে তুরস্ক, কাতার ও মিসরকেও অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা চলছে, যাকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে। অন্যপাশে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার একটি জোট, যা ‘আইটুইউটু’ গ্রুপ নামে পরিচিত।
লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ফেলো এইচ এ হেলিয়ার বলেন, এ অঞ্চলের দেশগুলো হিসাব কষে দেখেছে যে তেহরানের সরকার বদল করাটা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফলে রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। আর এমনটা কেবল ইসরায়েলই চেয়েছিল।
হেলিয়ার আরও বলেন, ট্রাম্পও ভালোভাবে বুঝে গিয়েছিলেন যে এ যুদ্ধ থেকে তিনি নিজের কাঙ্ক্ষিত ফল পাবেন না। তাই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাঁকে চুক্তি মানতে জোর করেনি। বরং এই চুক্তিতে এ অঞ্চলের দেশগুলোর ব্যাপক সমর্থন আছে, ট্রাম্পকে শুধু এমনটা বলার সুযোগ করে দিয়েছে।
হেলিয়ার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থা এখন আর কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে তৈরি হচ্ছে না। উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমেই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের মুহূর্তে হয়তো ওয়াশিংটন তাদের পাশে থাকবে না।