ওয়াশিংটন ডিসিতে এক বৈঠকে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প। ২৮ জুলাই ২০২৬
ওয়াশিংটন ডিসিতে এক বৈঠকে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প। ২৮ জুলাই ২০২৬

নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের সমর্থন: যুক্তরাষ্ট্র কি ইসরায়েলকে নিয়ে আবার ইরানে হামলার ছক কষছে

ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে আবার প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য লড়বেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এত দিন এ নির্বাচনে কাউকে সমর্থন দেবেন না বলে জানিয়েছিলেন। তবে গত রোববার আগের অবস্থান থেকে সরে এসে নেতানিয়াহুকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘মহান যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী এবং শান্তির জন্য আরও বড় অংশীদার’ বলে উল্লেখ করেন। একই পোস্টে তিনি বলেন, ইরানকে সামরিক ও আর্থিক-দুই দিক থেকেই ‘পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস’ করে দেওয়া হয়েছে। ইরান দ্রুত নিজেদের অবস্থান না বদলালে শিগগিরই বাকি কাজ শেষ করা হবে।

ট্রাম্প আরও বলেন, ইসরায়েল বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ছাড়া অন্য কাউকে নেতা নির্বাচন করলে যুক্তরাষ্ট্রকে একাই এ কাজ (ইরানকে দমানো) শেষ করতে হবে। আর তাতে আগ্রহী নন তিনি।

ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবর নির্বাচন হওয়ার কথা। দেশটির সংবাদমাধ্যম হারেৎজের সর্বশেষ পূর্বাভাস, ১২০ আসনের পার্লামেন্টে গাদি আইজেনকোতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৫২টি আসন পেতে পারে। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট পেতে পারে ৫১টি আসন।

নেতানিয়াহুকে শক্তিশালী, সাহসী ও মেধাবী উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েলের ভেতরে বিরোধিতার মুখে পড়েও তিনি টিকে আছেন। এমনকি তিনি আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়েছেন।

ট্রাম্প বলেন, নেতানিয়াহুর ওপর যে চাপ ছিল, তা সাধারণ কোনো মানুষ সহ্য করতে পারতেন না। কিন্তু তিনি সেই চাপের মুখে দুর্বল না হয়ে আরও শক্তিশালী হয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের কাছ থেকে এমন অংশীদারত্বই প্রত্যাশা করে। ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্র অনেক কিছু করেছে। এই বার্তাকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পদে আসন্ন পুনর্নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রতি আমার পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন হিসেবে বিবেচনা করুন। নেতানিয়াহু কখনো আপনাদের হতাশ করবেন না!’

ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবর নির্বাচন হওয়ার কথা। দেশটির সংবাদমাধ্যম হারেৎজের সর্বশেষ পূর্বাভাস, ১২০ আসনের পার্লামেন্টে গাদি আইজেনকোতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৫২টি আসন পেতে পারে। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট পেতে পারে ৫১টি।

নেতানিয়াহু নিজের কারাদণ্ড এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে আবার হামলা শুরু করতে চান।
আব্বাস আরাগচি, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

চলতি মাসের শুরুতে টাইম সাময়িকী ট্রাম্পকে দুবার প্রশ্ন করেছিল, আরেক মেয়াদে নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা উচিত কি না। জবাবে ট্রাম্প ইসরায়েল ও ওয়াশিংটনে নিজের জনপ্রিয়তা এবং ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার বিষয়টি তুলে ধরেন।

গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্স ট্রাম্পকে প্রশ্ন করে, তিনি ইসরায়েলের নির্বাচনে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা (ইসরায়েল) চায় আমি যুক্ত হই। হ্যাঁ, তারা চায়।’

নেতানিয়াহুকে বিশ্বাস করেন কি না, জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি কাউকেই বিশ্বাস করি না।’

তবে যুক্তরাজ্যের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল মনে করেন, নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কয়েক মাস ধরেই দুই নেতার মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল।

ভাকিল আল-জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের সমর্থন নেতানিয়াহুকে এমন যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ দেবে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনিই অপরিহার্য।

তবে নির্বাচনে ট্রাম্পের এ সমর্থনের প্রভাব অতিরঞ্জিত করে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন সানাম ভাকিল। তিনি বলেন, নেতানিয়াহুকে নিয়ে ইসরায়েলের ভোটারদের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে। ফলে তাঁর সমর্থকেরা আরও উজ্জীবিত হতে পারেন। তবে এটি তাঁর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সংকটের সমাধান দিতে পারবে না।

লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ ট্রাম্পের এ সমর্থনকে নেতানিয়াহুর জন্য ‘রাজনৈতিক উপহার’বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, নির্বাচনী প্রচারে চ্যালেঞ্জের মুখে আছেন নেতানিয়াহু।

তবে ভাকিলের মতো ক্রিগও মনে করেন, ট্রাম্পের এ সমর্থনকে নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

ক্রিগ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘নেতানিয়াহুর সমস্যাগুলো কাঠামোগত। এর মধ্যে রয়েছে ডানপন্থী দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি, ভোটারদের হতাশা এবং ৭ অক্টোবর হামলার পর নেতানিয়াহু সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। ট্রাম্পের সমর্থন লিকুদ পার্টির এমন কিছু ভোটারকে দলটির পক্ষে আনতে পারে, যাঁরা নেতানিয়াহুকে ভোট দিতে দ্বিধায় আছেন। এতে দলটি এক বা দুটি আসন বেশি পেতে পারে। কিন্তু শুধু এই সমর্থনের কারণে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যাবে, এমন সম্ভাবনা কম।’

নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থনের বড় অংশজুড়েই রয়েছে ইরান যুদ্ধের ইস্যু। এমন এক সময় তিনি এই সমর্থন জানালেন, যখন অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, নভেম্বরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বা পরে ইরানে আবার হামলা শুরু করতে পারেন ট্রাম্প।

এ সমর্থন ইরান যুদ্ধের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে

নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থনের বড় অংশজুড়েই রয়েছে ইরান যুদ্ধের ইস্যু। এমন এক সময় তিনি এই সমর্থন জানালেন, যখন অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, নভেম্বরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অথবা পরে ইরানে আবার হামলা শুরু করতে পারেন ট্রাম্প।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানজুড়ে হামলা শুরু করার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। বর্তমানে সংঘাত কার্যত থেমে আছে।

বিশ্বের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান কার্যত এই নৌপথ বন্ধ করে দেয়। এরপর ইরানের জাহাজ চলাচলে অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী। দুই পক্ষই নিজেদের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে এই নৌপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালায়।

গত মাসে মার্কিন নৌবাহিনী আরও বেশি তেলবাহী ট্যাংকারকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করে নেওয়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ে ফিরেছিল। তবে চলতি মাসের শুরুতে ইরানের ধারাবাহিক কয়েকটি হামলার কারণে আবারও এই প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে।

গত মাসে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি প্রস্তাব দিয়েছে। এতে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তবে এটি সংকট নিরসনে ব্যর্থ হয়। তেহরানের দেওয়া সাতটি শর্তের বিষয়ে ওয়াশিংটন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। শর্তগুলোর মধ্যে ছিল ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়ও।

রোববার ইরানের সংবাদমাধ্যমকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, প্রস্তাবটি এখনো আছে। ওয়াশিংটন তেহরানের শর্ত মেনে নিলে ছয় দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব। পরদিন আবার আলোচনা শুরু করা যেতে পারে।

তবে রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু নিজের কারাদণ্ড এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে আবার হামলা শুরু করতে চান।

আরাগচি লেখেন, ‘শেষবার আপনারা কাজটি শেষ করতে চেয়েছিলেন। ইরান তখন আরও শক্তিশালী হয়ে বেরিয়ে এসেছিল। আবার ভাগ্য পরীক্ষা করতে চান? স্বাগতম। তবে সাবধান; আমাদেরও কিছু অসমাপ্ত কাজ আছে।’

আরাগচি আরও লেখেন, ‘নেতানিয়াহু নিজে কারাগারে যাওয়া এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। ইসরায়েলের জন্য এর পরিণতি কী হবে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জন্য কী হবে, তা নিয়ে তিনি ভাবছেন না।’

ক্রিগের মতে, নেতানিয়াহুকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে ট্রাম্প মূলত ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশলকে জোরদার করছেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তিনি কূটনীতির চেয়ে যুদ্ধকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

ক্রিগ বলেন, ‘নৌ অবরোধ ইরানকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ওয়াশিংটন মনে করছে, সময় তাদের পক্ষে আছে। ট্রাম্পের হিসাব হলো, এ পর্যন্ত বড় ধরনের ছাড় দিতে না হলেও শেষ পর্যন্ত ইরান পরমাণু কর্মসূচিতে ছাড় দিতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি হবে।’

ক্রিগের মতে, ট্রাম্পের এ সমর্থন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকিকে আরও জোরালো করেছে। তবে কূটনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। অন্যদিকে তেহরানও মনে করতে পারে, সংঘাত বৃদ্ধি করলে আলোচনায় তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে।

এরপর কী

ভাকিলের মতে, নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের আরও ঘনিষ্ঠ করেছে। এতে ভবিষ্যতে দুই দেশের যৌথ সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উন্মুক্ত থাকছে। কিন্তু ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ থেকে নিজেকে দূরে রাখা কঠিন হতে পারে। তিনি আর বলতে পারবেন না যে ইসরায়েলের চাপে বা অনিচ্ছা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।

ভাকিল বলেন, ‘ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই এ অংশীদারত্ব এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের দায় নিজের কাঁধে নিচ্ছেন। তবে এ সমর্থনের অর্থ এটা নয় যে দুই নেতা নতুন কোনো সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর জন্য প্রথমে কে সবচেয়ে বেশি চাপ দিয়েছিলেন, সেই প্রশ্নেরও মীমাংসা হয়নি।’

ভাকিল আরও বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্য ইরানের নেতাদের এ বিশ্বাস আরও জোরালো করবে যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে আসলে কোনো পার্থক্য নেই।

আবার নেতানিয়াহু ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ট্রাম্পের অনীহা যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি যুদ্ধের ঝুঁকি নেওয়ার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করতে পারে।

এদিকে ট্রাম্প বলেছেন, নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি ইরানে হামলা চালাবেন না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোট গ্রহণের আগেই নতুন করে হামলা শুরুর পরিকল্পনা তৈরি করেছে পেন্টাগন।

গত সপ্তাহে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাতে তারা জানতে পেরেছে, দুই দেশের নির্বাচনের আগে ইরানে বড় ধরনের নতুন সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু আলোচনা করেছেন।

ক্রিগের মতে, ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় শুরু হতে পারে ৩ নভেম্বরের পর, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের বাধা আর থাকবে না। দুই দেশের সামরিক বাহিনীই সেই সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।’