যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি, পারমাণবিক শক্তি সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাচ্ছে সৌদি আরব

সৌদি আরবের সঙ্গে পরমাণু চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব নিজস্ব পারমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাবে। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৌদি ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল। ৩০ বছর মেয়াদি নতুন চুক্তিটি দুই দেশের সম্পর্ক দৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গতকাল বুধবার চুক্তিটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সই করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শিল্পে কয়েক শ কোটি ডলারের ব্যবসার সুযোগ তৈরি করবে। প্রথমেই এর সুফল পেতে পারে ওয়েস্টিংহাউস। মার্কিন এই প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হওয়া অনেক পারমাণবিক চুল্লির নকশা তৈরি করে থাকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, শিগগিরই মার্কিন কংগ্রেসের সামনে চুক্তির বিস্তারিত উপস্থাপন করা হবে। তবে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান দলের কিছু আইনপ্রণেতা এবং ইসরায়েলের কর্মকর্তারা এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচির আড়ালে সৌদি আরব পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা চালাতে পারে।

এই চুক্তি নিয়ে কয়েক বছর ধরে আলোচনা চলছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জো বাইডেন প্রশাসনের সময় এটি বৃহত্তর কূটনৈতিক প্যাকেজের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। এর শর্ত ছিল, সৌদি আরব ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেবে। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর সেই সম্ভাবনা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে যায়।

কংগ্রেসে বিতর্কের সম্ভাবনা

সৌদি–যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে এটিকে মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কংগ্রেস চাইলে এর বিরুদ্ধে আপত্তির প্রস্তাবে ভোটাভুটি করতে পারে। তবে চুক্তিটি অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ঠেকাতে হলে কংগ্রেসকে প্রেসিডেন্টের ভেটো অতিক্রম করার মতো পর্যাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হবে।

তবুও এই চুক্তি নিয়ে কংগ্রেসে তীব্র বিতর্ক হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে ট্রাম্প এমন কিছু শর্তে সম্মত হয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের ক্ষমতা সীমিত করতে পারে। এর ফলে কোনো পারমাণবিক স্থাপনা থেকে অস্ত্র তৈরির কাজে জ্বালানি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে কি না, তা যাচাই করাটা পরিদর্শকদের জন্য কঠিন হতে পারে।

এ ছাড়া সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথভাবে পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা নিয়ে সমীক্ষা করার বিষয়েও সম্মত হয়েছেন ট্রাম্প। ওই সমীক্ষার পর সৌদি আরবকে নিজেদের ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা প্লুটোনিয়াম পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। চুক্তির বিষয়টি মঙ্গলবার রাতে প্রথম প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

গোপন সম্পূরক চুক্তি

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এর আগে বলেছিলেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তাহলে সৌদি আরবও তা করবে। যদিও ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চালাচ্ছে। তবে ২০২৫ সালের জুনে মার্কিন বাহিনী ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের পারমাণু স্থাপনায় হামলা শুরু করে।

চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা দুটি গোপন সম্পূরক চুক্তির নথিও আছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এসব নথিতে বাণিজ্যিকভাবে স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচিত তথ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয় আছে। তবে কংগ্রেসের কিছু সদস্য মনে করেন, এই গোপন নথিগুলো প্রকাশ করা না হলে তারা চুক্তির পক্ষে ভোট দেবেন না।

ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের সঙ্গে যে চুক্তি করেছে, সেটি একটি ‘ওয়ান-টু-থ্রি অ্যাগ্রিমেন্ট’ ধাঁচের চুক্তি। ওয়ান-টু-থ্রি অ্যাগ্রিমেন্ট হলো এমন একটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক কাঠামো, যা দুই দেশের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার নিয়ম নির্ধারণ করে। এ ধরনের চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করা।

আগেও এমন চুক্তি

এর আগে ২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে একই ধরনের একটি চুক্তি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে সেই চুক্তির শর্ত ছিল অনেক বেশি কঠোর। আমিরাত কর্তৃপক্ষ তখন দেশে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের কাজ করতে দিতে সম্মত হয়েছিল। এ জন্য সংস্থাটির সঙ্গে ‘অতিরিক্ত প্রোটোকল’ নামে পরিচিত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল আরব আমিরাত।

এ ছাড়া আমিরাত কর্তৃপক্ষ নিজস্ব পরমাণু জ্বালানি উৎপাদনের অধিকারও ছেড়ে দিয়েছিল। এতে দেশটির পক্ষে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। ওই চুক্তিকে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকবে।