
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। তবে এখনো সমঝোতার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ইরান যুদ্ধ ও ইয়েমেনের সাম্প্রতিক উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির গতকাল বুধবার তেহরান সফর করেছেন। এমন এক সময়ে তিনি দেশটি সফরে গেলেন, যখন মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কিন্তু ইরান তাদের আগের অবস্থানেই অনড়। দেশটি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত মেনে না নিলে তারা হরমুজ প্রণালি খুলবে না এবং যুদ্ধের অবসানও হবে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের যুদ্ধ শুরুর অন্যতম কারণ ছিল দেশটির বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি। ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বারবার বলেছেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শেষ করে দিতে চান।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজায়ি গত মঙ্গলবার রাতে আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠকের পর বলেন, ‘সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের এক গ্রামও ইরান থেকে সরানো হবে না।’
তবে মোহসেন রেজায়ি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমানোর সম্ভাবনা নাকচ করেননি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে ইরানের ভেতরেই এ কাজ করা যেতে পারে। এর আগে তেহরান এমন প্রস্তাব দিয়েছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের যুদ্ধ শুরুর অন্যতম কারণ ছিল দেশটির বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি। ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বারবার বলেছেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শেষ করে দিতে চান।
তবে চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হলে ওয়াশিংটন সন্তুষ্ট হতে পারে।
২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে হামলা চালায়। এর আগে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ধারণা করেছিল, তেহরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম আছে। পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশের বেশি সমৃদ্ধ করতে হয়।
ইরানের শাসকগোষ্ঠী কয়েক দশকের পুরোনো পারমাণবিক কর্মসূচিকে দেশের সার্বভৌম অধিকার ও অর্জন হিসেবে তুলে ধরছে। চলমান যুদ্ধ এবং এর আগে বিভিন্ন হামলা ও হত্যাকাণ্ডের মধ্যেও এ কর্মসূচি বন্ধ হয়নি। গত মঙ্গলবার মোহসেন রেজায়ি এটিকে ‘জাতীয় সম্পদ’ বলে বর্ণনা করেন।
ইরান কম মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বেসামরিক কাজেও ব্যবহার করে। এর মধ্যে রয়েছে ওষুধ তৈরি এবং রাশিয়ার সহযোগিতায় বুশেহর বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন।
ইরানের শাসকগোষ্ঠী বলছে, সামরিক চাপের মুখে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়া আত্মসমর্পণের শামিল হবে। তা ছাড়া কর্মসূচি বন্ধ করলে ভবিষ্যতে হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তাও নেই।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান আইএইএকে তাদের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি। তেহরানের অভিযোগ, সংস্থাটি মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর স্বার্থে কাজ করছে।
২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে আগ্রাসন শুরু চাকরে। এর আগে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ধারণা করেছিল, তেহরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম আছে। পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশের বেশি সমৃদ্ধ করতে হয়।
২০২৫ সালের ওই হামলার পর চলতি বছরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় হামলা চালায়। এতে দেশটির পারমাণবিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আইএইএ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পরিদর্শন করতে না পারায় বর্তমানে ইরানের কাছে কতটুকু সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে, সেগুলোর কী অবস্থা এবং কোথায় রাখা হয়েছে—এসব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান আইএইএকে তাদের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি। তেহরানের অভিযোগ, সংস্থাটি মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর স্বার্থে কাজ করছে।
ইরানের কর্মকর্তারা বলে আসছেন, তাঁরা পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছেন না। তবে মোহসেন রেজায়ির মতো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য হিসেবে থাকার যৌক্তিকতা কী।
চলতি সপ্তাহে ইরানের কর্মকর্তারা একাধিক দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ সোমবার তেহরান সফর করেন। এর আগের দিন তিনি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। অন্য আরব কর্মকর্তাদেরও তেহরান সফরের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব বৈঠকের পরও নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা কমেছে বলে মনে হচ্ছে না।
গতকাল তেহরানে ইরানি রপ্তানিকারকদের এক সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, দেশটির ওপর নতুন করে হামলা এবং আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি রয়েছে।
ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে বলার মতো নতুন কিছুই নেই। গত মাসে দেওয়া শর্তগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। ওই শর্ত মানলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব।মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান মধ্যস্থতাকারী
আরাগচি বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, ইরান এখন সত্যিকার অর্থেই যুদ্ধের মধ্যে আছে এবং যুদ্ধ চলছে। আমরা শান্তির পরিস্থিতিতে পৌঁছাইনি; বরং তা থেকে এখনো অনেক দূরে। তাই, সব সিদ্ধান্তই নিতে হবে যুদ্ধের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে।’
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে বলেছেন, ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে বলার মতো নতুন কিছুই নেই। গত মাসে দেওয়া শর্তগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। ওই শর্ত মানলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব।
চলতি সপ্তাহে ইরানের কাছে মধ্যস্থতাকারীরা কী প্রস্তাব দিয়েছেন, তা প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। তবে তাঁদের বলা হয়েছে, ইরানের শর্ত মেনে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আস্থা তৈরি করতে হবে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে জুন মাসের সমঝোতা স্মারকে ফিরে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাময়িকভাবে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান ও ওমানের চুক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বৃহত্তর সমঝোতার বিষয়ে অবিলম্বে আলোচনা শুরুর প্রতিশ্রুতিও ওই সমঝোতা স্মারকে ছিল। পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেওয়া, জব্দ করা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা এবং লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সামরিক অভিযান বন্ধ করার বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক গবেষক ও উপপ্রধান এলি গেরানমায়েহ মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা ছাড়া ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছাড়তে রাজি হবে না।
আল–জাজিরাকে এলি গেরানমায়েহ বলেন, ‘ইরানিরা স্পষ্ট করে দিয়েছে, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে তারা আলোচনা করতে রাজি। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের একটি সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সরাসরি যুক্ত থাকতে হবে। এ ধরনের আলোচনা শুরু হতে এখনো অনেক পথ বাকি।’
গত মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো দেশটির কয়েকজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, পেন্টাগন ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরি ও একটি মেরিন ইউনিট মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে। বিষয়টিকে ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলা চালানোর প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্প ও তাঁর কর্মকর্তারা ইরানে সম্ভাব্য বিভিন্ন সামরিক অভিযানের বিষয় নিয়েও আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পিক্যাক্স মাউন্টেন এলাকায় হামলা চালিয়ে পাহাড়ের ভেতরে থাকা পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং ‘মাদার অব অল বম্বস’ নামে পরিচিত শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করা।
এর আগে হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপগুলো দখল এবং আরও ইরানি কর্মকর্তাকে হত্যার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি গতকাল এক নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবার হামলা চালালে বা কাউকে হত্যা করলে তেহরানের নীতিনির্ধারকেরা কোনো সংযম না দেখিয়েই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।