আল্লাহর রহমত প্রাপ্তির আশায় হজযাত্রীরা আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়েছেন। এ সময় অনেক যাত্রী জাবাল আল–রাহমাহ বা রহমতের পাহাড়ে অবস্থান নিয়েছেন। ২৬ মে ২০২৬, আরাফাতের ময়দান
আল্লাহর রহমত প্রাপ্তির আশায় হজযাত্রীরা আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়েছেন। এ সময় অনেক যাত্রী জাবাল আল–রাহমাহ বা রহমতের পাহাড়ে অবস্থান নিয়েছেন। ২৬ মে ২০২৬, আরাফাতের ময়দান

পবিত্রতম দিনে ক্ষমা ও রহমতের আশায় আরাফাতের ময়দানে হাজিরা

মিনা থেকে হজযাত্রীদের স্রোত মিশেছে ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে। পার্থিব পাপ থেকে মহান আল্লাহর ক্ষমাপ্রাপ্তির আশায় বিশ্বের নানা প্রান্তের নানা বর্ণের লাখ লাখ মুসলিম সমবেত হয়েছেন ঐতিহাসিক এই ময়দানে। নিজেদের পুরোপুরি সঁপে দিয়েছেন মহান আল্লাহর দরবারে। সবার কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে—‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্‌দা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্‌ক, লা শারিকা লাক।’ এর বাংলা অর্থ—‘আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার।’

সৌদি প্রেস এজেন্সি জানাচ্ছে, মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের এক আবেগঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে হজের সবচেয়ে পবিত্র ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্বটির জন্য আজ মঙ্গলবার ১৬ লাখের বেশি হজযাত্রী আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়েছেন।

জাবাল আল-রাহমাহ বা রহমতের পাহাড়ে হাজিরা মহান আল্লাহর দরবারে মোনাজাতে মশগুল। ২৬ মে ২০২৬, আরাফাতের ময়দান

জিলহজ মাসের নবম দিন ফজরের নামাজের পর থেকেই হজযাত্রীরা আরাফাতের ময়দানে আসতে শুরু করেন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই পবিত্র স্থানের নির্ধারিত সীমানার মধ্যে থেকে তারা পুরো দিনটি ইবাদত, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর জিকির–আসকার এবং কান্নাকাটি ও দোয়ার মধ্য দিয়ে কাটাবেন।

ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, ‘ওকুফে আরাফাহ’ নামে পরিচিত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের প্রধান স্তম্ভ। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘হজ হলো আরাফাহ’, যা হাজিদের সমবেত হওয়ার অপরিহার্য গুরুত্বকে তুলে ধরে।

অতিরিক্ত গরমের কারণে হজযাত্রীরা পানি ছিটানো পাখার কাছে অবস্থান নিয়েছেন। ২৬ মে ২০২৬, আরাফাতের ময়দান

ইসলামী চিন্তাবিদেরা এই দিনটিকে ইসলামি ক্যালেন্ডারের অন্যতম পবিত্র দিন এবং আল্লাহর রহমত, ক্ষমা ও আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনটিতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিদায় হজের স্মৃতিবিজড়িত। সে সময় তিনি আরাফাত পাহাড়ে তাঁর বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণে তিনি ন্যায়বিচার, সমতা ও জীবন-সম্পত্তির পবিত্রতার নীতিগুলো তুলে ধরেছিলেন।

দুপুরের দিকে হাজিদের উদ্দেশ্যে আরাফাতে অবস্থিত মসজিদে নামিরা থেকে মসজিদে নববির ইমাম খুতবা দেবেন। এতে ধর্মীয় দিকনির্দেশনা এবং এই দিনের ফজিলত সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হবে। এরপর হাজিরা মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে মিলিয়ে কসর আদায় করবেন।

আজ সকাল থেকে হাজিরা মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও আত্মসমীক্ষার এক আবহে কাতর কণ্ঠে দুই হাত তুলে দোয়া করছেন, তালবিয়া ও তাকবির পাঠ করছেন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন।

আরাফাতের ময়দানের পাশের জাবাল আল-রাহমাহ বা রহমতের পাহাড়ে হাজিরা। অতিরিক্ত গরমে একটু শীতল পরশ পেতে এ সময় অনেকে পানি ছিটানো পাখার নিচে অবস্থান নেন। ২৬ মে ২০২৬, আরাফাতের ময়দান

আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ হাজিদের নিষ্পাপ ঘোষণা করেন। হাদিসে আছে, ‘আরাফাহর দিন আল্লাহ এত বেশি পরিমাণ জাহান্নামিকে অগ্নি থেকে মুক্তি দেন, যা অন্য কোনো দিবসে দেন না।’ (মুসলিম শরিফ)

মক্কা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত আরাফাত হচ্ছে একটি উন্মুক্ত প্রান্তর। এর মধ্যে রয়েছে ‘জাবাল আল-রাহমাহ’ বা রহমতের পাহাড়, যেখানে অনেক হাজি ইবাদত–বন্দেগির জন্য জড়ো হন। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, এই স্থানটি আদম ও হাওয়ার পুনর্মিলনের স্মৃতির সঙ্গে জড়িত। বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী একটি স্থান।

তাঁবুর নগর মিনার ‘তারবিয়াহর দিন’ (৮ জিলহজ)-এরপর আরাফাতের দিকে হজযাত্রীদের যাত্রা শুরু হয়। মিনায় হজযাত্রীরা গতকাল সোমবার হজের সবচেয়ে কঠিন পর্বটির জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে কাটিয়েছেন।

পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যে হজযাত্রীদের যাতায়াত সহজ করতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি কর্তৃপক্ষ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভিড় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবা, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং জরুরি উদ্ধারকারী দল।

সূর্যোদয়ের সময় হাজিদের অনেকে জাবাল আল–রাহমাহ বা রহমতের পাহাড়ে অবস্থান নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে দুই হাত তুলে দোয়া করেন। ২৬ মে ২০২৬, আরাফাতের ময়দান

৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তাপমাত্রার কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তারা হজযাত্রীদের প্রচুর পানি পান করতে, ছাতা ব্যবহার করতে এবং সরাসরি সূর্যের আলোতে দীর্ঘ সময় না থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

সূর্যাস্তের পর হাজিরা আরাফাত থেকে মুজদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন। সেখানে তাঁরা মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে কসর হিসেবে আদায় করবেন। এরপর প্রতীকী বড় শয়তানকে পাথর ছোঁড়ার প্রস্তুতি হিসেবে পুরো রাত ইবাদত–বন্দেগি ও বিশ্রামের মধ্য দিয়ে কাটাবেন।

মুজদালিফায় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো হজের অন্যতম ওয়াজিব। ফজর নামাজের পর হাজিরা শয়তানকে মারতে সাতটি পাথর সংগ্রহ করবেন।

১০ জিলহজ মুজদালিফায় ফজরের নামাজ আদায় করে হাজিরা কেউ ট্রেনে, কেউ গাড়িতে, কেউ হেঁটে আবার মিনায় যাবেন এবং নিজ নিজ তাঁবুতে ফিরবেন। মিনায় বড় শয়তানকে সাতটি পাথর মারার পর পশু কোরবানি দিয়ে মাথার চুল ছেঁটে গোসল করবেন। সেলাইবিহীন দুই টুকরা কাপড় বদল করবেন।