ইরানে কয়েক সপ্তাহব্যাপী স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন—এ খবর প্রকাশ্যে আসার পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা। এমন এক সময়ে পরিকল্পনাটির কথা জানা গেল, যখন মধ্যপ্রাচ্যে হাজারো মার্কিন সেনা জড়ো করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে চলমান যুদ্ধ একটি নতুন ও আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
বিষয়টির সঙ্গে জানাশোনা আছে এমন মার্কিন কর্মকর্তারা ওয়াশিংটন পোস্টকে জানান, সম্ভাব্য কোনো স্থল অভিযান পূর্ণমাত্রার হবে না। বিশেষ বাহিনী ও পদাতিক সেনাদের সমন্বয়ে সীমিত অভিযানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদিও পেন্টাগনের এমন কোনো পরিকল্পনা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কবে নাগাদ অনুমোদন দেবেন, সেটা স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর জেমস ল্যাঙ্কফোর্ড এনবিসি চ্যানেলের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের সেনা সমাবেশে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি সরাসরি নাকচ করেননি। তবে তিনি বলেন, ‘এই সেনাদের উদ্দেশ্য কী এবং তারা আসলে কী করছে, সেসব আমাদের জানতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের গোয়েন্দা–বিষয়ক কমিটিতে রয়েছেন জেমস ল্যাঙ্কফোর্ড। সম্ভাব্য স্থল অভিযানের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য হলো, ‘কাজটি শেষ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমরা কেন সেনা পাঠাচ্ছি, সেটা জানাও জরুরি।’
‘যদি বিশেষ বাহিনীর কাজ হয় কোনো নির্দিষ্ট অভিযান চালানো—কোথাও প্রবেশ করা ও বেরিয়ে আসা, তবে দীর্ঘস্থায়ী দখলদারির চেয়ে সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন’—বলেন জেমস ল্যাঙ্কফোর্ড। তাঁর মতে, এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে খারাপ যা হতে পারে তা হলো, সংঘাত শেষ না করে অসমাপ্ত রেখে দেওয়া। জেমস বলেন, ‘আমাদের এটা শেষ করতেই হবে।’
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘সর্বাধিনায়ককে (কমান্ডার ইন চিফ) যেকোনো সর্বোচ্চ বিকল্পের সুযোগের জন্য প্রস্তুত করাই পেন্টাগনের কাজ। এর মানে এটা নয় যে প্রেসিডেন্ট কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।’
এর মাঝেই রোববার মার্কিন রণতরি ইউএসএস ত্রিপোলির নেতৃত্বাধীন একটি ইউনিটের অংশ হিসেবে আরও ৩ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা (মেরিন সেনাও রয়েছে) মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছেন। এ বহরে আক্রমণ পরিচালনাকারী ও পরিবহন সরঞ্জাম রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সচরাচর এ অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন করে রাখে।
এভাবে সামরিক শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিকল্প কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে—হরমুজ প্রণালি সুরক্ষিত রাখার পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া, ইরানের সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম জব্দ করা, ইরানের তেল স্থাপনাগুলো দখল করা।
যদিও এর আগে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি কোথাও ‘সেনা পাঠাচ্ছেন না’। মূলত বিদেশে সামরিক সম্পৃক্ততা এবং এ বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নিজের সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যে স্পষ্ট বিভাজনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প এ কথা বলেছিলেন।
ইরানে সেনা পাঠাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কংগ্রেসের অনুমতি নিতে হবে কি না—রোববার জেমস ল্যাঙ্কফোর্ডের কাছে এ প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়া হয়েছিল। তিনি সরাসরি কোনো জবাব দেননি। বলেন, এটা নির্ভর করছে মার্কিন সেনাদের কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তার ওপর।
রিপাবলিকান এই রাজনীতিক আরও বলেন, ‘যদি একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলত, যেমনটা ইরাক বা আফগানিস্তানে হয়েছিল, তাহলে “হ্যাঁ”। কিন্তু এর উদ্দেশ্য যদি হয় মার্কিন নাগরিকদের রক্ষা করা এবং এটা নিশ্চিত করা যে আমরা সেখানে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য থাকব, এরপর সেখান থেকে বেরিয়ে আসব, তাহলে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।’
কংগ্রেসের অনুমোদন না নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আরও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত করার জন্য আনা একাধিক প্রস্তাব এর আগে মার্কিন সিনেটের রিপাবলিকান সদস্যরা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার্ষিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার বাজেটের পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ চেয়েছে পেন্টাগন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিষয়ে ‘আমরা যা আলোচনা করছি, তার বাইরেও আরও অনেক কারণে’ বাড়তি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
এমন এক সময়ে এ বিষয়টি সামনে এল, যখন সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ভূমিতে থাকা একটি মার্কিন ই-৩ সেন্ট্রি আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ উড়োজাহাজ ধ্বংস হয়েছে। ৩০০ মিলিয়ন ডলারের উড়োজাহাজটি ধ্বংসের এ ঘটনা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের এমন আকাশযান হারানোর প্রথম নজির। ধারণা করা হয়, এ মডেলের প্রায় আটটি উড়োজাহাজ এখন মোতায়েন করা রয়েছে।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা রিপাবলিকান পার্টির স্টিভ স্ক্যালিস রোববার জানান, এই অভিযানে নিজেদের উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এবিসি নিউজকে তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্ব জানে যে পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরান বিশ্বের জন্য একটি বিপদ। ইরান এখন যেটা করছে, শুধু সেদিকেই দেখুন। ইরান যে বিপদ সৃষ্টি করেছে, তার কারণে দেশটি শুধু ইসরায়েলকেই নয় বরং চারপাশের সব আরব দেশকে নিজেদের বিরুদ্ধে এককাট্টা করেছে।’
ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের উদ্দেশ্যগুলো স্পষ্ট করেনি—এমন দাবি মানতে নারাজ স্টিভ স্ক্যালিস। তিনি বলেন, ট্রাম্প ‘কী করা দরকার’ সেটা বোঝেন। সেই সঙ্গে তাঁর (ট্রাম্প) চারপাশে চমৎকার একটি দল রয়েছে।
ইরানে চলমান সংঘাত আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারাও। নিউ জার্সির সিনেটর কোরি বুকার বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন আমাদের এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে, যা আমাদের সময়ের অন্যতম বড় ভুল এবং প্রেসিডেন্টের নিজের ভুল হিসেবে বিবেচিত হবে।’
এই রাজনীতিক আরও বলেন, ‘কংগ্রেসের অনুমতি না নিয়েই ট্রাম্প আমাদের এমন এক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো দৃশ্যমান পথ নেই।’
কোরি বুকারের মতে, ‘ইরানের সঙ্গে মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততা স্পষ্টতই শুধু একটি যুদ্ধ নয়। এটা আফগানিস্তান যুদ্ধের পর আমাদের সবচেয়ে বড় সামরিক সম্পৃক্ততা।’
এদিকে মেরিল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন এবিসি নিউজের ‘দিস উইক’ অনুষ্ঠানে বলেন, অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে পেন্টাগনের দেওয়া প্রস্তাব কংগ্রেসে পাস হবে না বলে তিনি আশা করছেন।
এই আইনপ্রণেতা আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় না, এমন একজন প্রেসিডেন্টকে তাঁর ইচ্ছাকৃত একটি অবৈধ যুদ্ধের জন্য আরও অর্থ দেওয়া উচিত, যিনি নির্বাচনী প্রচারের সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি দেশকে নতুন কোনো যুদ্ধে, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে কোনো যুদ্ধে জড়াবেন না।’
ক্রিস ভ্যান হোলেন বলেন, ‘এ যুদ্ধ এখন আমাদের আরও নিরাপদ করার পরিবর্তে মার্কিন নাগরিকদের প্রাণহানি ঘটাচ্ছে। প্রতিদিন শত শত কোটি ডলার খরচ হচ্ছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দামও বাড়ছে।’