ইরানের তেহরানে একটি রাস্তায় একটি প্রতীকী ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের মডেলের পাশ দিয়ে হাঁটছেন লোকজন। ১১ জুন, ২০২৬
ইরানের তেহরানে একটি রাস্তায় একটি প্রতীকী ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের মডেলের পাশ দিয়ে হাঁটছেন লোকজন। ১১ জুন, ২০২৬

ট্রাম্প বলছেন শিগগিরই শান্তিচুক্তি, ইরান বলছে চূড়ান্ত হয়নি—কার কথা সত্য

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ একটি শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারে। এ চুক্তি হলে জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হবে। তবে ইরান বলেছে, কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে তারা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।

চুক্তিটি নিশ্চিত হলে, তিন মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ অবসানে এটি হবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি। এই যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, আলোচনা চলতে থাকা চুক্তির খসড়ার বড় অংশ নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। তবে ইরানের কাছে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত শর্তগুলোর বিষয়ে কোনো আপস হবে না। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো ইসমাইল বাঘাইয়ের এমন বক্তব্য প্রকাশ করেছে।

বাঘাই বলেন, এই বিষয়ে আমরা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাইনি। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যা বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থাগুলো পর্যালোচনা করছে।

তবে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের এক সমঝোতায় পৌঁছেছি।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমরা চুক্তিতে স্বাক্ষর করার সঙ্গে সঙ্গেই প্রণালিটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হবে। এটি খুব শিগগিরই হতে পারে—সম্ভবত ইউরোপে চলতি সপ্তাহের শেষের দিকেই।’

ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এই চুক্তির অনুমোদন দিয়েছেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি যতটুকু বুঝেছি, উত্তর হলো—হ্যাঁ।’

আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখ করে ইরানে সম্ভাব্য সামরিক হামলার পরিকল্পনা বাতিল করার পর ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন। তাঁর ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায় এবং তেলের দাম কমে যায়।

মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন, যুদ্ধ শেষ করতে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। তবে চলতি সপ্তাহে দুপক্ষই একে অপরের ওপর হামলা চালায়। এতে গত এপ্রিলে ঘোষণা করা যুদ্ধবিরতি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি অত্যন্ত শক্তিশালী সমঝোতা স্মারক, তবে এটি কিছুটা ধারণাগত পর্যায়ে আছে।’

ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন, যেকোনো শান্তিচুক্তিতে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে, ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। তবে ইরান দাবি করে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না।

শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রে ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে আছে—আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ থাকা কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদ ছাড় করা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি।

পরে ভিডিও কনফারেন্সে নির্বাচনী এক প্রচার অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের কাছে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না। এর অর্থ হলো—তারা তা তৈরি করতে পারবে না এবং কিনতেও পারবে না।’

পাল্টাপাল্টি হামলা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরুর পর থেকে চলমান এই যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়েছে।

এপ্রিলের শুরুতে কার্যকর হওয়া একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির পরও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।

মার্কিন একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালির আশপাশে দুই দিন ধরে নতুন করে হামলার নির্দেশ দেন।

একই সময়ে ইরানও ওই অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।

বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বৃহস্পতিবার বলেছে, ইরানের ড্রোন আটক করে ধ্বংস করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ পড়ে ১১ বছর বয়সী এক কিশোরী সামান্য আহত হয়েছে এবং কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘আজ রাতে ইরানে খুব কঠোর হামলা চালাবে’। তিনি আরও বলেছিলেন, শেষ পর্যন্ত ইরানের তেল অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখল করতে চান।

খারগ দ্বীপ দিয়ে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি বাণিজ্যে বড় ধরনের বাধা তৈরি করতে পারবে, যা দেশটির অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করবে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আজ শুক্রবার ভোরে বলেছে, দেশটির বাহিনী সমন্বয় ছাড়াই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাত্রার চেষ্টা করা একটি ট্যাংকারকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রণালিটি কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ

এই সংঘাত এখন হোয়াইট হাউসের জন্য রাজনৈতিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে।

কিছু রিপাবলিকান নেতা প্রকাশ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এই যুদ্ধের প্রতি মানুষের অসন্তোষের কারণে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ওপর প্রভাব পড়বে।

ট্রাম্প তাঁর নিজ দলের ইরানবিরোধী কঠোর অবস্থান নেওয়া নেতাদের সন্তুষ্ট রাখার বিষয়টি নিয়েও হিসাব–নিকাশ করছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াও এই পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, ইসরায়েল, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ এই চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছে।

তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরানের সঙ্গে করা সমঝোতা স্মারকের কোনো পক্ষ নয় ইসরায়েল। ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর আলাপের পর এই বিবৃতি দেওয়া হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ট্রাম্প এমন একটি চুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকায় নেতানিয়াহু তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন, যেখানে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সীমিত করা এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা বন্ধ করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এদিকে তেহরান দাবি করে আসছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করতে হবে। সেখানে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সঙ্গে ইসরায়েলের লড়াই আলাদা একটি সংঘাত হিসেবে চলমান আছে।