
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের ওপর নতুন করে একগুচ্ছ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছেন। এ পদক্ষেপের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’। এর আওতায় প্রায় ৬০টি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও নৌযানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি জাহাজ চলাচল, সোনা, উড়োজাহাজ, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সম্পদের ওপর পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার (সেকেন্ডারি স্যাংশন) পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে।
স্কট বেসেন্ট বলেন, তেহরান সরকারকে টিকিয়ে রাখা প্রতিটি অর্থনৈতিক ‘লাইফলাইন’ ছিন্ন করাই তাঁদের লক্ষ্য, যাতে দেশটি একঘরে হয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের ফোন করছেন। তিনি তাঁদের কাছে ইরানের সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করার সুনির্দিষ্ট অনুরোধ জানাচ্ছেন। তবে ট্রাম্প কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি বা কোনো সময়সীমাও বেঁধে দেননি।
ট্রেড ডেটা মনিটরের সংকলিত সরকারি কাস্টমস তথ্যের ভিত্তিতে ইরানের শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদারদের একটি চিত্র তুলে ধরা হলো। তবে এ হিসাবে ইরানের তেল রপ্তানির বড় অংশটি বাদ পড়েছে। কারণ, এসব লেনদেন কাস্টমসের খাতায় নথিবদ্ধ থাকে না।
ইরানের শীর্ষ রপ্তানি অংশীদার
গত দুই দশকের বেশির ভাগ সময় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই কাটিয়েছে ইরান। এ চাপ দেশটির অর্থনীতিকে ইউরোপ থেকে দূরে সরিয়ে গুটি কয়েক এশীয় ও আঞ্চলিক অংশীদারের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সরকারি কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরান অন্তত ১১২টি দেশ ও অঞ্চলে প্রায় ৫ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। তাদের শীর্ষ রপ্তানি গন্তব্যগুলো হলো—
১. চীন (১ হাজার ৪৫৮ কোটি ডলার): ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। ট্যাংকার-ট্র্যাকিং বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রপথে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি যায় চীনে। এর বড় অংশই বিশেষ ছাড়ে বিক্রি হয়। এগুলো মূলত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া নৌযানের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়, যা কোনো দেশের কাস্টমসের খাতায় তেমন একটা ওঠে না।
২. ইরাক (১ হাজার ১৭০ কোটি ডলার): বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইরাকে দীর্ঘকাল ধরে গ্যাস সরবরাহ করে আসছে ইরান। এ ছাড়া তারা সরাসরি দক্ষিণ ইরাকের প্রদেশগুলোয় বিদ্যুৎ বিক্রি করে। পাশাপাশি খাদ্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রী ও কারখানায় তৈরি পণ্যের বড় উৎসও ইরান।
৩. সংযুক্ত আরব আমিরাত (৭১৬ কোটি ডলার): আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে ইরানের জন্য একটি আর্থিক ও পুনঃরপ্তানি লাইফলাইন হিসেবে কাজ করেছে। ইরানের মোট রপ্তানির ১৩ শতাংশ যায় আমিরাতে। গত সপ্তাহে নিজেদের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য ইরানকে অভিযুক্ত করে অনির্দিষ্টকালের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে আবুধাবি। যদিও তেহরান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
৪. তুরস্ক (৬১০ কোটি ডলার): তাবরিজ-আঙ্কারা পাইপলাইনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে তুরস্কে গ্যাস সরবরাহ করছে ইরান। পাশাপাশি তারা তুরস্কে পেট্রোকেমিক্যাল, খাদ্যপণ্য ও নির্মাণসামগ্রীও রপ্তানি করে।
৫. আফগানিস্তান (২৩০ কোটি ডলার): চারদিকে স্থলবেষ্টিত প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানে জ্বালানি, খাদ্য ও নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করে ইরান। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য আফগানিস্তান ব্যাপকভাবে ইরানের বন্দর ও স্থলপথের ওপর নির্ভরশীল।
ইরানের শীর্ষ আমদানি অংশীদার
সরকারি কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরান অন্তত ৮৭টি দেশ ও অঞ্চল থেকে প্রায় ৬ হাজার ৮৫০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। তাদের শীর্ষ আমদানি অংশীদারেরা হলো—
১. সংযুক্ত আরব আমিরাত (২ হাজার ১০০ কোটি ডলার): ইরানের মোট আমদানির ৩০ শতাংশের বেশি এসেছে আমিরাত থেকে। এসব পণ্যের বেশির ভাগই আমিরাতের নিজস্ব উৎপাদন নয়, বরং পুনঃরপ্তানি করা পণ্য। এর মাধ্যমে পশ্চিমা যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস ও ভোগ্যপণ্য পরোক্ষভাবে তেহরানের হাতে পৌঁছাত। আবুধাবির সাম্প্রতিক অনির্দিষ্টকালের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার ফলে পথটি এখন বন্ধ হয়ে গেছে।
২. চীন (১ হাজার ৭৮০ কোটি ডলার): ইরানের যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, যানবাহন ও শিল্পের যন্ত্রাংশের প্রধান সরবরাহকারী দেশ চীন। পশ্চিমা বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই অংশীদারের ওপরই ইরান সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
৩. তুরস্ক (১ হাজার ১১০ কোটি ডলার): স্থলসীমান্ত ও দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে তুরস্ক ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থল সরবরাহ পথ। এখান থেকে যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, যানবাহন ও প্রস্তুতকৃত পণ্য ইরানে যায়। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য কমেছে।
৪. ইউরোপীয় ইউনিয়ন (৬১০ কোটি ডলার): ইউরোপের বিক্রি এখন ২০১৮ সালের আগের তুলনায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। এটি মূলত এখন ওষুধ, চিকিৎসাসরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
৫. ভারত (১৬০ কোটি বিলিয়ন ডলার): সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারতের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য ব্যাপকভাবে কমেছে। নয়াদিল্লি এখন বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সীমিত পরিসরে রেখেছে। মূলত চাল, চা ও ওষুধের মতো কৃষিজাত ও চিকিৎসাপণ্যের দিকেই তাদের বেশি ঝোঁক।