কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি ডিপো থেকে কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী উঠছে। রিয়াদ, সৌদি আরব। ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি ডিপো থেকে কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী উঠছে। রিয়াদ, সৌদি আরব। ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রিয়াদে বিকট বিস্ফোরণ, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বৃদ্ধি

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরের কাছে গতকাল শনিবার ভোরে বিকট বিস্ফোরণের পর আগুন ও বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে। বিস্ফোরণের আগে শুক্রবার মধ্যরাতের পর রিয়াদ ও আশপাশের অঞ্চলে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো, সামরিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন এলাকায় হুতিদের হামলা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে এসব ঘটনা ঘটল।

এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বহাল রাখার আইনে সই করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনের এ পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে তেহরান।

গত জুলাই থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের বিরোধ নতুন করে প্রকাশ্যে আসে। তখন ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্তকারী বাব আল–মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এরপর হুতিরা বাব আল–মানদেবের কাছে সৌদি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালায়। একই সঙ্গে সৌদি আরবের মূল ভূখণ্ডের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে।

এ পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের সৌদি–সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হুতিদের সংঘর্ষ নতুন করে শুরু হয়। হুতিরা ঝটিকা হামলায় ইয়েমেনের লোহিত সাগর–তীরবর্তী প্রায় পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দরনগরী ও বাব আল–মানদেবের মাইয়ুন দ্বীপ দখলের পর তারা তাইজ ও মারিব এলাকা দখলের অভিযান শুরু করে। এসব অঞ্চলে এখন দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছে। সরকারি বাহিনীর পক্ষ নিয়ে সৌদি বিমানবাহিনীও হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।

ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা চিন্তন প্রতিষ্ঠান ‘সানা সেন্টারের’ কর্মকর্তা ইয়াসমিন আল-ইরিয়ানি আল–জাজিরাকে বলেন, কয়েক মাস ধরে সৌদি আরব ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে সংঘাতে উত্তেজনা বেড়েছে। এ পর্যন্ত সংঘাতের গতিপথ হুতিরাই নির্ধারণ করে আসছে।

রিয়াদে বিমান চলাচলে বিঘ্ন

সৌদি কর্তৃপক্ষ রিয়াদের পাশাপাশি রাজধানীর পূর্বে অবস্থিত আল-খারজ শহরেও সতর্কতা জারি করেছিল। শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত তিনটার কিছু আগে বাসিন্দাদের ফোনে পাঠানো ওই বার্তায় আকাশপথে হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়ে তাঁদের ঘরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। প্রায় আধা ঘণ্টা পর সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।

তাৎক্ষণিকভাবে হুতি বা অন্য কোনো গোষ্ঠী রিয়াদে হামলার দায় স্বীকার করেনি। অন্যদিকে সৌদি আরবও গতকাল রাত ৯টার দিকে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হামলার বিষয়ে কিছু বলেনি।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, সতর্কতা তুলে নেওয়ার পর রিয়াদের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিমানবন্দরের দিকে আগুনের শিখা ও কালো ধোঁয়া দেখেছেন বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা।

উড়োজাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বিত হয়েছে।

এদিকে জুলাইয়ের পর বাব আল–মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল রপ্তানি কমেছে বলে জানিয়েছে সামুদ্রিক পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার। তবে প্রতিকূল পরিবেশ সত্ত্বেও গত এক সপ্তাহে পাঁচটি সৌদি তেলবোঝাই জাহাজ এই পথ পাড়ি দিয়েছে।

ইরানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাড়ল ৫ বছর

হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত শুক্রবার ট্রাম্প ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামের ‘এইচআর ৫৩৩৪’ বিলে সই করেছেন। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়িয়ে ২০৩১ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে। একই আইনে রাশিয়ার বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক ও বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সময়সীমা বৃদ্ধির সুযোগ পাবে ওয়াশিংটন।

ইরানের ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞাগুলোর মেয়াদ চলতি বছর শেষ হওয়ার কথা ছিল। নতুন আইনে ১৯৯৬ সালের ‘ইরান স্যাংশনস অ্যাক্ট’ আরও পাঁচ বছরের জন্য কার্যকর থাকবে। ফলে ইরানের জ্বালানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ২০৩১ সাল পর্যন্ত ব্যবস্থা নিতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে জানায়, গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত তেল, পণ্য ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের পরিমাণ ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

‘নিরাপত্তা বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়’

মধ্যপ্রাচ্যের টেকসই নিরাপত্তাব্যবস্থা এ অঞ্চলের বাইরের কোনো পক্ষের চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। গতকাল ইন্দোনেশিয়ার ‘গ্লোবাল টাউন হল ২০২৬’ অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও সম্মানের ভিত্তিতেই এ অঞ্চলে টেকসই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

আরাগচি গতকাল পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গেও আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে ফোনে কথা বলেছেন। এ সময় দার সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে ফেরার বিষয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা চলছে বলে জানিয়েছে ইরানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তাইজ ও মারিবে লড়াই তীব্র

ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় হুতিরা জানায়, ২৪ ঘণ্টায় তাদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় সৌদি আরব ২৬টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এক সপ্তাহে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ৩০০–এর বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব।

গতকাল ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী দাবি করে, দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় আল–জাওফ প্রদেশে তারা হুতিদের একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। আগের দিন শুক্রবার তারা তাইজ প্রদেশের আল–ওয়াজিয়াহ জেলায় সংঘর্ষে ৩০ জন হুতি যোদ্ধাকে হত্যা এবং ৬০ জনের বেশি আহতের কথা জানিয়েছিল।

তাইজ শহরে সরকারি বাহিনী শুক্রবার ভোরে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। এতে হুতিদের অস্ত্র ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বর্তমানে আল–কাদাহ, মাকবানাহ ও আল–ওয়াজিয়াহর কাছের পাহাড়ি এলাকায়ও তীব্র লড়াই চলছে। দুর্গম ভূখণ্ড ও মাঝেমধ্যে বৃষ্টির কারণে সেখানে যুদ্ধ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

এদিকে হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে মারিবের বাসিন্দারাও নিজেদের এলাকা সুরক্ষিত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মারিব প্রদেশের সাবা রিজিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক আবদুলকাদের ওনিন আল–জাজিরাকে বলেন, কয়েক বছর ধরেই হুতিরা মারিব দখলের চেষ্টা করছে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পরও সেই চেষ্টা থামেনি। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা থেকে স্থানীয় মানুষ মনে করেন, মারিব দখল করা সহজ হবে না।