ইসরায়েলি হামলায় নিহত ছেলেকে দাফন করা হয়েছে। ছেলের কবরের পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা। খান ইউনিস, দক্ষিণ গাজা, ১৮ জানুয়ারি ২০২৪
ইসরায়েলি হামলায় নিহত ছেলেকে দাফন করা হয়েছে। ছেলের কবরের পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা। খান ইউনিস, দক্ষিণ গাজা, ১৮ জানুয়ারি ২০২৪

গাজায় মরদেহ দাফনের জায়গা পাননি, দাদার কবরে বাবাকে দাফন করলেন ছেলে

মৃত বাবাকে কোথায় কবর দেবেন, তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন ২০ বছর বয়সী ওমর আল-সাওহি। তাঁর বাবা মোহাম্মদকে (৪০) গাজার ইয়েলো লাইনের কাছে গুলি করে হত্যা করে ইসরায়েলিরা।

মোহাম্মদ গাজা নগরীর জায়তুন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। গত ১০ জুন ইসরায়েলিদের নির্ধারিত সামরিক এলাকা ইয়েলো লাইনের পাশে ফুটপাতের একটি দোকানে চা ও কফি বিক্রি করছিলেন। আচমকা একটি বুলেট এসে তাঁর ঘাড়ে লাগে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মারা যান।

ওমর তাঁর বাবার মরদেহ দাফনের জন্য জায়তুন করবস্থানে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন, একের পর এক মরদেহে ঠাসা পুরো কবরস্থান। কোথাও একটুকরা জায়গা ফাঁকা নেই। এখানে শায়িত বেশির ভাগই গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর জাতিগত নিধনের শিকার।

ওমর তাঁর বাবার মরদেহ দাফনের জন্য জায়তুন করবস্থানে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন, একের পর এক মরদেহে ঠাসা পুরো কবরস্থান। কোথাও একটুকরা জায়গা ফাঁকা নেই। এখানে শায়িত বেশির ভাগই গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর গণহত্যার শিকার।

জায়গার অভাব এবং যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে বেশির ভাগ কবর শুধু একটি পাথর দিয়ে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। আর সেই পাথরে নিহত ব্যক্তির নাম লেখা একটি কাগজ সেঁটে দেওয়া হয়েছে।

ওমর আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আমি কবরস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দেখলাম, চারদিকে শুধু কবর আর কবর। চারদিকে বালুর স্তূপ, আর তার নিচেই দাফন করা হয়েছে মানুষের মরদেহ।’

ওমর আরও বলেন, যুদ্ধের আগে যেভাবে একটি কবর তৈরি বা প্রস্তুত করা হতো তার ছিটেফোঁটাও এখন নেই। একটি কবরের ওপর শুধু পাথরের টুকরা রেখে দেওয়া হয়েছে। তার ওপর এক টুকরা কাগজে নিহত ব্যক্তির নাম-পরিচয় লিখে রাখা হয়েছে।

বর্তমানে গাজায় একটি কবর প্রস্তুত করতে প্রায় ৫০০ শেকেল (১৬৭ মার্কিন ডলার) খরচ হয়। ওমরের পরিবারের পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। তাই তাদের বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল।

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর গাজায় ইসরায়েলি সহিংসতার মাত্রা কিছুটা কমে আসে। তখন পরিবারগুলো বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এবং অস্থায়ী কবর থেকে তাঁদের স্বজনদের মরদেহ উদ্ধার করে কবরস্থানে নিয়ে দাফন করার সুযোগ পান।

ওমর বলেন, ‘সেখানে নতুন কোনো কবরের জায়গা ছিল না। তাই দাদার কবরেই বাবাকে দাফন করতে বাধ্য হয়েছি।’

গাজায় সব ধরনের নাগরিক পরিষেবা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া এবং অনবরত ইসরায়েলি হামলার ঝুঁকির কারণে যুদ্ধের সময় নিহত হাজারো ফিলিস্তিনির মরদেহ শনাক্ত বা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অনেক পরিবার তাঁদের স্বজনদের মরদেহ বাড়িঘরের আঙিনায়, তাঁবুর পাশে, উদ্বাস্তু শিবিরের মাঠে, স্কুল কিংবা হাসপাতালের চত্বরে দাফন করতে বাধ্য হয়েছেন।

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর গাজায় ইসরায়েলি সহিংসতার মাত্রা কিছুটা কমে আসে। তখন পরিবারগুলো বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এবং অস্থায়ী কবর থেকে তাঁদের স্বজনদের মরদেহ উদ্ধার করে কবরস্থানে নিয়ে দাফন করার সুযোগ পান।

তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত আরও অন্তত ১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের জন্য দাফনের জায়গার প্রয়োজন ছিল। গাজা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিভিন্ন হাসপাতালের চত্বরে থাকা ৭টি গণকবর থেকে এ পর্যন্ত ৫২৯ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

ইসরায়েলি সহিংসতা কমায় মোহাম্মদের পরিবার তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে যথাযথ মর্যাদায় দাফনের জন্য কবরস্থানে নিয়ে যায়।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত সেখানে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হামলা থেকে রক্ষা পায়নি কবরস্থানগুলোও। ফলে এত মানুষের মরদেহ দাফনের জন্য কবরের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

গাজার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস করা হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোয় কবরস্থানে প্রবেশেও কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। এতে পরিবারগুলোর জন্য স্বজনদের দাফনের জায়গা খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইসরায়েলি হামলায় লাখো ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাঁদের আশ্রয় দিতে কবরস্থানের জন্য নির্ধারিত অনেক জায়গাকে উদ্বাস্তু শিবিরে পরিণত করা হয়েছে।

গাজার কর্তৃপক্ষ বলেছেন, কবরের ফলক তৈরির পাথরসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের সংকট রয়েছে। এ কারণে এখন একটি কবর তৈরিতে ৭০০ থেকে ১ হাজার শেকেল বা প্রায় ২৩৫ থেকে ৩৩৫ ডলার খরচ হচ্ছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনের ইট-পাথর, কাদা কিংবা ঢেউটিন দিয়ে অস্থায়ীভাবে কবর চিহ্নিত করা হচ্ছে। পরে অর্থের ব্যবস্থা হলে স্থায়ী কবরের ফলক বসানো হচ্ছে।

গাজার ৬০টি কবরস্থানের অনেকগুলোই যুদ্ধ শুরুর আগেই প্রায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। গাজার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যম কর্মকর্তা ইকরামি আল-মাদালাল বলেন, নতুন কবরস্থান তৈরি করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

মন্ত্রণালয় নতুন কবরের জায়গা খুঁজছে। একই সঙ্গে অস্থায়ীভাবে দাফন করা মরদেহগুলো কবরস্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজও চলছে। তবে ইচ্ছেমতো মরদেহ সরানো যায় না। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে এ কাজ করতে হয়।

গাজার খান ইউনিস কবরস্থানে ১৯ বছরের বেশি সময় ধরে কবর খোঁড়ার কাজ করেন তাফেশ আবু হাতাব। তাঁর পুরো কর্মজীবনে গাজা যুদ্ধের মতো এত কঠিন সময় আর কখনো আসেনি।

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর গাজায় ইসরায়েলি সহিংসতার মাত্রা কিছুটা কমে আসে। তখন পরিবারগুলো বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এবং অস্থায়ী কবর থেকে তাঁদের স্বজনদের লাশ উদ্ধার করে কবরস্থানে নিয়ে দাফন করার সুযোগ পান।

যুদ্ধ শুরুর সময় কবরস্থানটিতে ছিল প্রায় ৬০টি কবর। এখন সেখানে কবরের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। যুদ্ধের একপর্যায়ে তাফেশকে দিনে প্রায় ৩৫টি পর্যন্ত কবর খুঁড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এত ভয়াবহ রক্তপাত আমরা কখনো দেখিনি। প্রতিদিনই কয়েক ডজন শহীদকে এখানে দাফন করতে হচ্ছে।’

তাফেশ যাঁদের জন্য কবর খুঁড়েছেন তাঁদের বড় একটি অংশ নারী ও শিশু। কখনো কখনো একটি পরিবারের সব সদস্যকে একসঙ্গে দাফন করতে হয়েছে।