
সহকারী পাইলটের ক্রমাগত ছুরিকাঘাতের মুখেও ককপিটের দরজা খোলার জন্য কীভাবে লড়াই করেছিলেন, সেই রোমহর্ষ বর্ণনা দিয়েছেন ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটের ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিথ মছার। বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য প্রশংসিত এ পাইলট গত বুধবারের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।
সৌদি আরবের একটি হাসপাতালের শয্যা থেকে শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন ক্যাপ্টেন স্মিথ মছার। সে সময় তিনি বলেন, ‘আমি যখন রক্তাক্ত অবস্থায় নিচে পড়ে যাই, তখন বুঝছিলাম, উড়োজাহাজটি খাড়া নিচের দিকে আছড়ে পড়ছে। আমি জানতাম কিছু একটা করার এটাই আমার শেষ সুযোগ। আর দরজাটি ঠিক আমার পাশেই ছিল।’
উড়োজাহাজটি যখন তীব্রগতিতে মাটির দিকে নেমে যাচ্ছিল, তখন পাইলটের এ মরিয়া চেষ্টার ফলে ক্রু ও যাত্রীরা ককপিটের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়তে সক্ষম হন। এরপর হামলাকারী সহকারী পাইলটকে কাবু করে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেন তাঁরা। যার ফলে নিশ্চিত এক বড় ধরনের বিমান দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায় আরোহীদের প্রাণ।
এদিকে উড়োজাহাজে থাকা একজন ‘ইসরায়েলি প্লাম্বারের’ (পানির লাইনের মিস্ত্রি) সাহসী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ককপিটে ওই ব্যক্তির দ্রুত পদক্ষেপ বড় ধরনের ট্র্যাজেডি রোধে সাহায্য করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘ফ্লাইটে থাকা ইসরায়েলি প্লাম্বার বুঝতে পেরেছিলেন কী ঘটছে। তিনি বেশ শক্তিশালী। সারা দিন ভারী পাইপ তোলার কাজ করলে শরীরে শক্তি থাকাই স্বাভাবিক। ভেতরের চিৎকার শুনেই তিনি পরিস্থিতি আঁচ করতে পারেন।’
বুধবার সকাল ৭টা ৫ মিনিটে দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে রওনা দেয় ফ্লাইট এফজেড১০৭৩। উড়োজাহাজটি পরে ৩৪ হাজার ফুট ওপরে চলতে থাকে। তবে যাত্রার দুই ঘণ্টার কিছু বেশি সময় পর হঠাৎই এটি নিচে নামতে শুরু করে। উড়োজাহাজটি একবার তীব্রগতিতে নিচে নেমে আবার ওপরে ওঠে এবং আবার নিচের দিকে পড়তে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আরও জানান, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে উড়োজাহাজটি যখন প্রায় ১৭ হাজার ফুট (৫,১৮০ মিটার) নিচে নেমে যায়, তখন তীব্র মহাকর্ষীয় বলের (জি-ফোর্স) মধ্যেও ওই ব্যক্তি হামলাকারীকে আসন থেকে টেনেহিঁচড়ে পেছনে ফেলে দেন। সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত অন্য যাত্রীরা তাঁকে চেপে ধরেন। এরপর আগে কখনো উড়োজাহাজ চালানোর অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ওই প্লাম্বার ‘স্টিক’ টেনে ধরেন ও ক্র্যাশ করার ঠিক আগমুহূর্তে উড়োজাহাজটিকে আবার স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।’
এ ঘটনার পর থেকে গত কয়েক দিনে ফ্লাইটের অন্য যাত্রীদের কাছ থেকেও এমন আরও রোমহর্ষ বিবরণ সামনে আসছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৭টা ৫ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় ০৩:০৫) দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবের উদ্দেশে রওনা দেয় ফ্লাইট এফজেড১০৭৩। উড়োজাহাজটি পরে ৩৪ হাজার ফুট (১০ হাজার মিটারের বেশি) ওপরে চলতে থাকে। তবে যাত্রার দুই ঘণ্টার কিছু বেশি সময় পর হঠাৎই এটি নিচে নামতে শুরু করে। উড়োজাহাজটি একবার তীব্রগতিতে নিচে নেমে আবার ওপরে ওঠে এবং আবার নিচের দিকে পড়তে থাকে।
খাড়া নিচের দিকে নামতে শুরু করার ঠিক ১২ মিনিট পর, গ্রিনিচ মান সময় ০৫:৩৩ মিনিটে উড়োজাহাজটি প্রায় ১৫ হাজার ফুট (৪,৫৭০ মিটার) উচ্চতায় পৌঁছালে এটির গতি ও অবস্থান কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
উড়োজাহাজের ভেতরে চলা সেই রুদ্ধশ্বাস কয়েক মিনিটের ভয়াবহ পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ এখন সামনে আসছে।
গ্রিনিচ মান সময় ০৫:২১—খাড়া নিচের দিকে নামতে শুরু করে উড়োজাহাজ
ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি প্রথমে তীব্রগতিতে নিচের দিকে নামতে থাকে। এরপর সেটি এক ঝটকায় আবার ওপরে উঠে দ্বিতীয়বারের মতো খাড়া নিচের দিকে পড়তে শুরু করে।
স্ত্রী ও দুই ছোট সন্তানসহ ফ্লাইটে থাকা যাত্রী অ্যাডাম পোলো সিএনএনকে জানান, প্রথম যখন উড়োজাহাজটি নিচে নামছিল, তখন এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল এটি হয়তো ‘স্বাভাবিক কোনো এয়ার পকেট’ বা শূন্যতা। তবে মাত্র এক সেকেন্ড পরই বোঝা গেল, এ অস্বাভাবিক পতন এবং এর তীব্র গতি কোনোভাবেই স্বাভাবিক ছিল না।
এই যাত্রী আরও বলেন, ‘সে সময় উড়োজাহাজের বিদ্যুৎ–সংযোগ, মাল্টিমিডিয়া সিস্টেম ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র—সবকিছু পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। যাঁরা করিডরে দাঁড়িয়ে ছিলেন কিংবা টয়লেটে যাচ্ছিলেন, তাঁরা ছিটকে পড়ে যান। আসনে বসা ছাড়া বাকি সবাই নিচে পড়ে গিয়েছিলেন। পরিস্থিতি এমন ছিল, যেন জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক রোলার কোস্টারে চড়েছি, তবে এর তীব্রতা ছিল হাজার গুণ বেশি।’
মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে উড়োজাহাজটি ১৭ হাজার ফুটের বেশি নিচে নেমে আসে। নিরাপদে বাড়ি ফিরে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়া যাত্রীরা সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, কেবিনজুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, মানুষ দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করছিলেন এবং একের পর এক তীব্র ঝাঁকুনি হচ্ছিল।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘উড়োজাহাজটি এত খাড়া কোণ করে অবিশ্বাস্য গতিতে নিচের দিকে নামছিল যে এর ঝাঁকুনিতে পেছনের দিক থেকে রাডার ছিঁড়ে যায়। এ ধরনের উড়োজাহাজ এমন গতিতে চলার জন্য তৈরি করা হয়নি। ফলে এটি তার সক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।’
সে সময় উড়োজাহাজের বিদ্যুৎ–সংযোগ, মাল্টিমিডিয়া সিস্টেম ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র—সবকিছু পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। যাঁরা করিডরে দাঁড়িয়ে ছিলেন কিংবা টয়লেটে যাচ্ছিলেন, তাঁরা ছিটকে পড়ে যান। আসনে বসা ছাড়া বাকি সবাই নিচে পড়ে গিয়েছিলেন। পরিস্থিতি এমন ছিল, যেন জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক রোলার কোস্টারে চড়েছি, তবে এর তীব্রতা ছিল হাজার গুণ বেশি।
‘জীবনের জন্য লড়াই’: ছুরিকাহত ক্যাপ্টেন
মাঝআকাশে কেবিনের ভেতরে যখন এই তাণ্ডব চলছে, ঠিক তখনই ককপিটের ভেতরে দুই পাইলটের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। সহকারী পাইলট হঠাৎই ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিথ মছারকে ছুরিকাঘাত করে বসেন।
শুক্রবার স্মিথ মছার বর্ণনা দেন, কীভাবে তিনি হঠাৎই রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় ককপিটের মেঝেয় ছিটকে পড়েছিলেন। নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ভিডিও কলে তিনি বলেন, ‘আমি আহত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে ছিলাম। তবে শেষবারের মতো আরেকটু শক্তি সঞ্চয় করে ভেতর থেকে ককপিটের দরজাটি খোলার জন্য মনস্থির করি।’
উড্ডয়নকালে উড়োজাহাজের ককপিটের দরজা সাধারণত তালাবদ্ধ থাকে এবং শুধু পাইলটরাই তা খুলতে পারেন। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান সংবাদমাধ্যমকে জানান, রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকা সত্ত্বেও স্মিথ মছার ‘তাঁর শেষ মুহূর্তের শক্তি’ দিয়ে ককপিটের দরজার লক খুলতে সক্ষম হন।
মোদির সঙ্গে আলাপকালে মছার বলেন, ‘দরজা খোলার পর অন্যরাও ভেতরে চলে আসেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন। আমি অবশ্যই নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য লড়াই করছিলাম, তবে একই সঙ্গে মনে মনে প্রতিজ্ঞা ছিল, অন্যদের আমি মরতে দেব না।’
এ ঘটনার পর নেতানিয়াহু স্মিথ মছারকে একজন ‘প্রকৃত বীর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে তিনি লেখেন, এ একটিমাত্র কাজের মাধ্যমে পাইলট দারুণ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন এবং উড়োজাহাজে থাকা ১৭৪ জন আরোহীর প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং ককপিটের দরজা খুলে যাত্রী ও ক্রুদের হামলাকারীকে কাবু করার সুযোগ করে দেন। ফলে মাঝআকাশে এক নিশ্চিত বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
ক্যাপ্টেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে জানান, তিনি গত ১৭ বছর ধরে উড়োজাহাজ চালাচ্ছেন। ফলে চোখ বন্ধ করেও বুঝতে পারেন উড়োজাহাজের ভেতরে ঠিক কী ঘটছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্যাপ্টেনের সাহসিকতা, ধৈর্য ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার প্রশংসা করে বলেন, এর ফলেই এত মানুষের জীবন বেঁচেছে এবং পুরো ভারত তাঁকে নিয়ে গর্বিত।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, সৌদি আরবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর স্মিথ মছারকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে আবুধাবিতে নিয়ে আসা হয়েছে এবং তিনি এখন আশঙ্কামুক্ত ও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন।
ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি প্রথমে তীব্রগতিতে নিচের দিকে নামতে থাকে। এরপর সেটি এক ঝটকায় আবার ওপরে উঠে দ্বিতীয়বারের মতো খাড়া নিচের দিকে পড়তে শুরু করে।
রিয়াদে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, এ ‘সাহসী ভারতীয় পাইলটকে’ প্রথমে সৌদি আরবের তাবুক শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, যেখানে উড়োজাহাজটি জরুরি অবতরণ করে।
নিজেদের এক্স হ্যান্ডলে এক বার্তায় দূতাবাস জানায়, পাইলটের স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিস্তারিত রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে। তবে তাঁর অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল। তিনি যেন দ্রুত এই আঘাত কাটিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন, সে কামনা সবার।
‘সিনেমার মতো পরিস্থিতি’: যাত্রীদের ককপিট অভিযান
ক্যাপ্টেন দরজা খুলে দেওয়ার পরপরই সামনের দিকে এক হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যাত্রী জভিকা মানেস জানান, তাঁর স্ত্রী যখন তাঁদের ছোট মেয়েকে নিয়ে উড়োজাহাজের সামনের দিকের টয়লেটে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ককপিটের ভেতর থেকে চিৎকার ও ধস্তাধস্তির শব্দ শুনতে পান।
ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টকে জভিকা মানেস বিষয়টি জানানোর মুহূর্তেই সহকারী পাইলটের ছুরিকাঘাতের মুখে ককপিটের দরজা দিয়ে বাইরে ছিটকে পড়েন মূল পাইলট। এ পরিস্থিতিতে জভিকা দ্রুত টয়লেট থেকে তাঁর মেয়েকে বের করে নেন ও হামলাকারীকে প্রতিহত করতে সামনের দিকে ছুটে যান।
ততক্ষণে উড়োজাহাজের ভেতরে কী ঘটছে, তা আঁচ করতে পেরেছিলেন অন্য আরোহীরাও। নেতানিয়াহুর মুখপাত্র স্পিলম্যান বলেন, ‘উত্তেজনা টের পেয়ে বেশ কয়েকজন যাত্রী একযোগে সামনের দিকে ছুটে যান ও পাইলটের কেবিনে ঢুকে পড়েন। ভেতরে ঢুকে তাঁরা দেখেন, আহত পাইলট মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন এবং হামলাকারী সহকারী পাইলট কন্ট্রোল প্যানেলের ওপর দাঁড়িয়ে সেটি ভাঙচুর করছেন।’
সহকারী পাইলটকে কাবু করতে ভূমিকা রাখা যাত্রী আসাফ রাজুয়ান চ্যানেল ১২-কে বলেন, ‘পুরো ঘটনা ছিল একেবারে সিনেমার মতো। বাস্তব জীবনেও যে এমন কিছু ঘটতে পারে, তা আমার ভাবনার বাইরে ছিল।’
উড়োজাহাজটি যখন খাড়া নিচের দিকে পড়ে যাচ্ছিল, তখন ককপিটের ভেতর থেকে আসা চিৎকার তাঁরা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলেন বলে জানান আসাফ রাজুয়ান।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসায় ভাসা সেই ইসরায়েলি প্লাম্বার ইয়ানিভ হায়ুন পরে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তের বিবরণ দেন। তিনি জানান, কীভাবে জভিকা মানেস ও আসাফ রাজুয়ানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ককপিটের ভেতর জোরপূর্বক ঢুকে পড়েছিলেন এবং দরজার কাছেই আহত ক্যাপ্টেনকে পড়ে থাকতে দেখেছিলেন।
ইয়ানিভ হায়ুন বলেন, ‘আমি ভেতরে ঢুকেই দেখি সহকারী পাইলট দুই আসনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ‘‘স্টিক’’ ধরে টানাটানি করছেন। পাইলটদের আসনে কেউ ছিলেন না। আমি তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে জাপটে ধরি এবং ককপিটের বাইরে টেনে নিয়ে আসি।’ সহকারী পাইলট ককপিটের ভেতরের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করার চেষ্টা করছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
হামলাকারীকে ককপিট থেকে বের করে কেবিনে নিয়ে আসার পর শুরু হয় আরেক লড়াই। সে সময় ফ্লাইটে থাকা এক দন্তচিকিৎসক যখন আহত ক্যাপ্টেনের প্রাথমিক চিকিৎসায় ব্যস্ত, তখন অন্য যাত্রীরা মিলে কয়েক মিনিট ধরে ধস্তাধস্তির পর তারের হেডফোন দিয়ে হামলাকারীকে শক্ত করে বেঁধে ফেলেন। উপস্থিত যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাঁধন খোলার জন্য ছটফট করতে করতে সহকারী পাইলট চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমাকে মেরে ফেলো!’
আমি আহত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে ছিলাম। তবে শেষবারের মতো আরেকটু শক্তি সঞ্চয় করে ভেতর থেকে ককপিটের দরজাটি খোলার জন্য মনস্থির করি।স্মিথ মছার, উড়োজাহাজের পাইলট
‘আবারও ককপিটে’: উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিলেন যাত্রী
সহকারী পাইলটকে টেনে কেবিনে নিয়ে আসার পর ইয়ানিভ হায়ুন আবারও দ্রুত ককপিটের ভেতরে ছুটে যান।
টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে হায়ুন বলেন, ‘আমি এক লাফে ভেতরে ঢুকে কন্ট্রোল স্টিক চেপে ধরি এবং তা ওপরের দিকে টানতে শুরু করি।’ উড়োজাহাজের দুর্ঘটনা নিয়ে তৈরি কানাডীয় টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘মে ডে’ দেখার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার এ প্রাথমিক ধারণা পেয়েছিলেন বলে জানান।
ঠিক সেই মুহূর্তে উড়োজাহাজের পেছনের দিকের আসনে ভ্রমণ করা আরেকজন পেশাদার পাইলট দ্রুত ককপিটে এসে পৌঁছান।
হায়ুন বলেন, ‘উড়োজাহাজটি যখন কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরছিল, ঠিক তখন ওই পাইলট এসে আমাকে জানান যে এখন থেকে বাকিটা তিনি সামলাচ্ছেন।’
গ্রিনিচ মান সময় ০৫:২৮ মিনিটে উড়োজাহাজটি আন্তর্জাতিক জরুরি সংকেত ‘৭৭০০’ (কোড ৭৭০০) পাঠাতে শুরু করে। তবে নতুন পাইলট ককপিটে পৌঁছানোর আগে না পরে এ সংকেত পাঠানো হয়েছিল, তা স্পষ্ট জানা যায়নি। উড়োজাহাজটি তখন সৌদি আরব ও জর্ডানের সীমান্ত এলাকার আকাশসীমায় অবস্থান করছিল।
‘অবস্থা ছিল খুবই আশঙ্কাজনক’: ক্যাপ্টেনের পাশে যাত্রী
উড়োজাহাজের ভেতরে চলা এমন চরম বিশৃঙ্খলার মাঝেই চীন থেকে ইসরায়েলের বাড়িতে ফিরতে থাকা এক দন্তচিকিৎসক আহত ক্যাপ্টেনের সহায়তায় এগিয়ে আসেন।
শোতা মুসায়েভ নামের ওই চিকিৎসক দ্য টাইমস অব ইসরায়েলকে বলেন, ‘চিৎকার শোনার ১০ সেকেন্ডের মধ্যেই আমি সামনের দিকে ছুটে যাই, এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করিনি। ককপিটে ঢুকে দেখি পাইলটের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক এবং তাঁর মাথা থেকে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হচ্ছে।’
চিকিৎসক মুসায়েভ আরও বলেন, ‘পুরো ফ্লাইটে আমিই একমাত্র চিকিৎসক ছিলাম। বেশ কিছুক্ষণের চেষ্টায় আমি রক্তপাত বন্ধ করতে এবং তাঁর রক্তচাপ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হই।’
তাঁর দেওয়া এ জরুরি চিকিৎসা ৩৯ বছর বয়সী পাইলট স্মিথ মছারের জীবন বাঁচাতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্বাস করেন শোভা মুসায়েভ।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মুসায়েভ বলেন, ‘মুহূর্তগুলো ছিল অত্যন্ত কঠিন। তবে ফ্লাইটে থাকা কয়েকজন সাহসী মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা এক নিশ্চিত বিপর্যয় এড়াতে পেরেছি।’ সহকারী পাইলট যেন আর নড়াচড়া করতে না পারেন, সে জন্য তাঁর হাত-পা তিনি বেশ কয়েকবার শক্ত করে বেঁধেছিলেন বলে চ্যানেল ১২-কে জানান।
হামলাকারীকে ককপিট থেকে বের করে কেবিনে নিয়ে আসার পর শুরু হয় আরেক লড়াই। সে সময় ফ্লাইটে থাকা এক দন্তচিকিৎসক যখন আহত ক্যাপ্টেনের প্রাথমিক চিকিৎসায় ব্যস্ত, তখন অন্য যাত্রীরা মিলে কয়েক মিনিট ধরে ধস্তাধস্তির পর তারের হেডফোন দিয়ে হামলাকারীকে শক্ত করে বেঁধে ফেলেন। উপস্থিত যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাঁধন খোলার জন্য ছটফট করতে করতে সহকারী পাইলট চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমাকে মেরে ফেলো!’
গ্রিনিচ মান সময় ০৫:৩৩—১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজ
ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, এ সময় উড়োজাহাজটি ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় এসে তার গতি ও অবস্থান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনে। এর দুই মিনিট পর, অর্থাৎ গ্রিনিচ মান সময় ০৫:৩৫ মিনিটে এর ট্র্যান্সপন্ডার কোড বদলে ‘৭৫০০’ করা হয়, যা উড়োজাহাজে বেআইনি অনুপ্রবেশ বা ছিনতাইয়ের চেষ্টার আন্তর্জাতিক সংকেত। এরপর উড়োজাহাজটি পশ্চিম দিকে মোড় নিয়ে কিছু সময়ের জন্য জর্ডানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে এবং পরক্ষণেই আবার সৌদি আরবের দিকে ফিরে আসে।
গ্রিনিচ মান সময় ০৫:৪৪—জরুরি অবতরণের বার্তা
সৌদি আরবের তাবুক শহরের উড়োজাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণকক্ষ ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটটি থেকে একটি জরুরি বার্তা পায়। সেখানে উড়োজাহাজটি জরুরি অবতরণের অনুমতি চায়।
তাবুক বিমানবন্দরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় উড়োজাহাজটির ট্র্যান্সপন্ডার কোড আবারও পরিবর্তন করে ‘৭৭০০’ করা হয়, যা সাধারণ জরুরি অবস্থার নির্দেশক।
গ্রিনিচ মান সময় ০৬:৫৮—উড়োজাহাজের সফল অবতরণ
উড্ডয়নের প্রায় ৪ ঘণ্টা পর ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজটি অবশেষে তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে। সেখানে জরুরি চিকিৎসাসেবা দল ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন।
উড়োজাহাজে থাকা ১৭৪ জন আরোহীর পাশাপাশি আহত হামলাকারী, রক্তাক্ত মূল পাইলট এবং সাময়িকভাবে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সেই সাহসী ‘প্লাম্বার’ ইয়ানিভ হায়ুনকে নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনা হয়।