
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে সৌদি আরব যোগ দিলে দেশটি পাকিস্তানের সঙ্গে করা প্রতিরক্ষা চুক্তি সক্রিয় করতে পারে। এমনকি পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের সহায়তাও নিতে পারে সৌদি আরব। কানাডার সম্প্রচারমাধ্যম সিবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একজন সৌদি বিশ্লেষক এমনটি জানিয়েছেন।
সৌদি ভূরাজনৈতিক গবেষক সালমান আল-আনসারি সিবিসি নিউজকে বলেন, ‘সৌদি আরব পূর্ণ শক্তি নিয়ে যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত নিলে ইরান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, সৌদি আরব তখন পাকিস্তানের সঙ্গে করা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর করবে।’ তিনি যোগ করেন, তখন ‘সৌদি আরব একটি পারমাণবিক সুরক্ষার আওতায় চলে আসবে, এ কথা আমরা হলফ করে বলতে পারি।’
গত বছর কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের প্রতিনিধিদের অবস্থান লক্ষ্য করে ইসরায়েলের হামলার পর সৌদি আরব ও পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। এই চুক্তির মূল ভিত্তি অনেকটা ন্যাটোর ‘অনুচ্ছেদ ৫’-এর মতো, যেখানে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে।
সৌদি ও পাকিস্তান উভয় সরকার আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে চুক্তির বিষয়ে জানিয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, ‘যেকোনো একটি দেশের ওপর হামলা উভয় দেশের ওপর আক্রমণ বলে ধরে নেওয়া হবে।’ কাগজে-কলমে এর অর্থ হলো, সৌদি আরব যদি ক্রমাগতভাবে আক্রমণের শিকার হয়, তবে পাকিস্তান তাকে সহায়তা করতে বাধ্য থাকবে।
সৌদি আরব পূর্ণ শক্তি নিয়ে যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত নিলে ইরান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, সৌদি আরব তখন পাকিস্তানের সঙ্গে করা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর করবে।- সালমান আল-আনসারি, সৌদি ভূরাজনৈতিক গবেষক
চলমান যুদ্ধে ইরান এরই মধ্যে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস, প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটি এবং সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে ইরান।
এর প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা হামলার হুমকি দিয়ে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান বলেছেন, ‘প্রয়োজন মনে করলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার আমাদের রয়েছে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান। যুদ্ধের আগে এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি হতো।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণের কারণে অঞ্চলটির অন্যান্য দেশের মতো সৌদি আরবের তেল রপ্তানিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরর নিজেদের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনের ওপর বড় রকমের নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত পাইপলাইনটির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বাজারে সরবরাহ করছে দেশটি। যুদ্ধ শুরুর আগে সৌদি আরব প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করত।
সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অন্য দেশগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে না জড়াতে অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে ইরানের হামলা বেড়েছে। এ অবস্থায় সৌদি আরব চলতি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা সামরিক সহায়তা দেবে বা নিজেরা সরাসরি এই যুদ্ধে যোগ দেবে কি না, তা নিয়ে রিয়াদের মধ্যে বিতর্ক বাড়ছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি এই যুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর ইঙ্গিত হলো, এই যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতার জন্য সৌদি আরব এখন কিছুটা হলেও পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এক বিবৃতিতে জানান, তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলাপকালে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে সরাসরি কথা বলেছেন।
ইসহাক দার বলেন, ‘সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। বিষয়টি আমি ইরানকে জানিয়েছি।’ প্রতিক্রিয়ায় তেহরান নিশ্চয়তা চেয়েছে, সৌদি আরবের ভূমি ব্যবহার করে ইরানের ওপর যেন কোনো হামলা চালানো না হয়।
সৌদি আরবের সঙ্গে কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কের পাশাপাশি পাকিস্তান অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
চলতি সপ্তাহে পাকিস্তানি পতাকাবাহী জাহাজ ‘করাচি’ (যা ‘লরাক্স’ নামেও পরিচিত) প্রথম অ-ইরানি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ হিসেবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। জাহাজটি তার অবস্থান শনাক্তকারী ব্যবস্থা অটোমেটিক আইডেনটিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) সচল রেখেই এই পথ পাড়ি দেয়। আক্রমণের ভয়ে বা নিজেদের অবস্থান লুকাতে অনেক সময় কোনো কোনো জাহাজ নিজের এআইএস বন্ধ করে চলাচল করে , যা ‘ডার্ক মুড’ নামে পরিচিত।
জাহাজটি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল শিপিং করপোরেশনের। এটি সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে তেল নিয়ে আসছিল। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান সম্ভবত ইরান সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে জাহাজটির নিরাপদে হরমুজ পাড়ি দেওয়া নিশ্চিত করেছে।