তেহরানের একটি সড়কে ইরানের পতাকা ও প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি–সংবলিত পোস্টার সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এর সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে মানুষ
তেহরানের একটি সড়কে ইরানের পতাকা ও প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি–সংবলিত পোস্টার সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এর সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে মানুষ

যুদ্ধের অবসান এবং সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরান সরকারের আসল পরীক্ষা শুরু, কী সেটা

ইরানের শাসকগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন মোকাবিলা করে টিকে গেছে। তবে তাদের সত্যিকারের সমস্যাগুলো বোধ হয় এখনই শুরু হবে। একদিকে যুদ্ধে টিকে যাওয়ার সাফল্যে উজ্জীবিত কট্টরপন্থীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া, অন্যদিকে দারিদ্র্যপীড়িত ও ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—এই দুই বিপরীতমুখী চাপ সামলানোই হবে শাসকগোষ্ঠীর বড় চ্যালেঞ্জ।

ইরানের প্রভাবশালী কট্টরপন্থীরা মনে করছে, তিন মাসের এ সংঘাতে তারা বিজয়ী হয়েছে। তাই তারা চায়, ইরানের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আসন্ন আলোচনায় কঠোর অবস্থান নিক এবং দেশের সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিক। কট্টরপন্থীদের বিশ্বাস, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে যেকোনো অভ্যন্তরীণ ভিন্নমত বা প্রতিবাদ দমন করা সম্ভব হবে।

তবে সাধারণ ইরানি জনগণ অর্থনৈতিক স্বস্তি দেখতে চান, যা তাঁদের জীবনমান উন্নত করতে কাজে লাগবে এবং ভবিষ্যতের জন্য ভালো সম্ভাবনা তৈরি করবে। কারণ, বিধ্বংসী যুদ্ধের পাশাপাশি তাঁরা বছরের পর বছর ধরে কঠোর নিষেধাজ্ঞার ভারও বহন করে এসেছেন।

এ দুই পক্ষেরই প্রত্যাশা অনেক, দাবি পরস্পরবিরোধী, আর ধৈর্যও খুব কম। এরই মধ্যে নতুন করে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জানুয়ারিতে হওয়া রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভের মতো এই পরিস্থিতি আবারও দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওই বিক্ষোভ কঠোর হাতে দমন করেছিল ইরান সরকার।

অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে জনঅসন্তোষ

বার্লিনভিত্তিক জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজি বলেন, ‘এই অন্তর্বর্তী চুক্তির ভিত্তি যেহেতু নড়বড়ে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার জন্য প্রকৃত সমস্যাগুলো তখনই শুরু হবে।’

ইরানের বর্তমান চার কর্মকর্তা এবং এক সাবেক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, এতদিন সাধারণ জনগণের মনোযোগ যুদ্ধের দিকে ছিল। এখন তারা আবার দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতির দিকে তাকাতে শুরু করেছে। আর সেখান থেকেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ওপর নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে।

ওই কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনজন বলেন, জনগণের প্রত্যাশা হলো—নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়া বা বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ফেরত পাওয়ার মাধ্যমে সরকার যে আর্থিক স্বস্তি অর্জন করবে, তা যেন অর্থনীতিকে চাঙা করতে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে খরচ করা হয়।

ওই কর্মকর্তাদের একজন ইরানি জনগণকে ‘যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগে ক্লান্ত’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সম্ভাব্য অর্থের বড় অংশ পুনর্গঠন কাজে, ব্যাংক খাতে তারল্য জোগাতে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সহায়তা কর্মসূচিতে খরচ করা হতে পারে।

চার কর্মকর্তাই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন, সরকার যদি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার ঝুঁকি আছে। তাঁদের একজন যুদ্ধবিরতির এ চুক্তিকে ‘দ্বিমুখী তলোয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। চুক্তির কারণে জনগণের প্রত্যাশার মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে।

এক সংস্কারপন্থী সাবেক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতারা এসব ঝুঁকি সম্পর্কে ভালোভাবেই জানেন। তাঁর মতে, এ কারণে তেহরান আবারও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চুক্তি মেনে নিয়েছে।

যুদ্ধ অবসানে আগামী শুক্রবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করার কথা আছে। এতে ইরানের জন্য কিছু আর্থিক ছাড় বা সহায়তার ব্যবস্থা থাকার কথা। পাশাপাশি, দুই পক্ষ যদি গ্রীষ্মের শেষ দিকে আরও বিস্তৃত একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটিতে অত্যন্ত মূল্যস্ফীতি চলছে, জাতীয় মুদ্রার মান ক্রমাগত কমছে, বেকারত্ব ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এর ওপর যুদ্ধ শুরুর পর শিল্পকারখানা ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা পুনর্গঠনে বিপুল অর্থ খরচ করতে হবে।

ইরানি অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতি বিশ্লেষক সাইদ লায়লাজ মনে করেন, দেশের ভেতরের অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ইরানের হাতে এখন খুব সীমিত সময় আছে। যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর নজর দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে।

তবে দীর্ঘ মেয়াদে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে ইরানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বৈশ্বিক বাজার ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের পথ আবার খুলে দিতে হলে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও বিস্তৃত একটি চুক্তিতে যেতে হবে। সেই চুক্তির মূল বিষয় হবে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। তবে আপাতত এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনাকে এখনো অনেক দূরের লক্ষ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

ইরানের তেহরানে একটি রাস্তায় ইসলামি বিপ্লবের প্রয়াত নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি এবং ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির প্রতিকৃতি–সংবলিত একটি দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে মানুষ হাঁটছে। ১৪ জুন, ২০২৬

নিজেদের ভূমিকার পুরস্কার চায় কট্টরপন্থীরা

যুদ্ধ চলাকালে ইরানের কর্তৃপক্ষ কঠোর সতর্কবার্তা, কঠিন শাস্তি ও সরকারপন্থী সমর্থকদের রাস্তায় নামিয়ে ভিন্নমত দমন করার চেষ্টা করেছে। শাসনব্যবস্থার সমর্থনে প্রায় অবিরাম বিক্ষোভ, সমাবেশ ও বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করে তারা জনমত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালিয়েছে।

অনেক বছর ধরে ইরানের কট্টরপন্থীরা দেশটির নেতৃত্বকে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। একই সঙ্গে তাঁরা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানের শক্তি প্রদর্শনের পক্ষে ছিলেন। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে কট্টরপন্থীরা মনে করছেন, তাঁদের অবস্থানই সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। সে কারণে তাঁরা আশা করছেন, যুদ্ধকালে তাঁদের ভূমিকা ও সমর্থনের যথাযথ পুরস্কার দেওয়া হবে।

ইরানের এ কট্টরপন্থী শিবিরে প্রভাবশালী বিভিন্ন গোষ্ঠী আছে। এর মধ্যে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড অন্যতম। তবে বর্তমানে ইরানের টিকে থাকার স্বার্থে বিপ্লবী গার্ড একটি সমঝোতা চুক্তি মেনে নিতে প্রস্তুত হলেও তথাকথিত পেদারি ফ্রন্ট সে অবস্থানে নেই। এই ফ্রন্টে প্রভাবশালী পার্লামেন্ট সদস্য, অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও গণমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আছেন।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যাঁরা রাস্তায় নেমে শাসনব্যবস্থার সমর্থনে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন, তাঁদের মধ্যে এই গোষ্ঠীর ব্যাপক প্রভাব আছে। তাঁরা সরাসরি রাষ্ট্রের নীতি উল্টে দেওয়ার মতো শক্তিশালী না হলেও, শাসকগোষ্ঠীর জন্য নানা ধরনের রাজনৈতিক সমস্যা ও চাপ তৈরি করতে পারেন।

আরও ভালো শর্ত পূরণের জন্য অপেক্ষা না করে ইরান এখনই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হওয়ায় অনেকেই ক্ষুব্ধ।

ইরানের স্বেচ্ছাসেবী আধা সামরিক বাহিনী বাসিজ–এর সদস্য হোসেইন বলেন, ‘যে শত্রু আমাদের নেতাকে (আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি) শহীদ করেছে, তাদের সঙ্গেই তারা এখন চুক্তি করছে। অথচ আমরা যুদ্ধ জিতেছি। তাহলে ইমাম খামেনির রক্তের প্রতিশোধ কোথায়? এটা কেমন ইসলামি সরকার? আর এখন শুক্রবার তারা ইমামের হত্যাকারীদের সঙ্গে হাত মেলাতে যাচ্ছে।’

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা চার কর্মকর্তার একজন স্বীকার করেছেন, জনগণের দুর্ভোগ মোকাবিলা করা জরুরি হলেও এই যুদ্ধ ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে। তাঁর মতে, ইরানের সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের কাজ ‘পূর্ণগতিতে’ চলবে।

বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি মনে করেন, যদি অন্তর্বর্তী চুক্তির মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক সহায়তা বা অর্থ প্রবাহ শুরু হয়, তাহলে সরকার হয়তো আপাতত জনগণের সঙ্গে বড় ধরনের সংকট বা জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়াটা ঠেকাতে পারবে।

ইরানের নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো—নিজেদের কট্টর সমর্থক গোষ্ঠীকে বোঝানো যে এটি আসলে একটি ভালো চুক্তি। কারণ, যুদ্ধ চলাকালে ও যুদ্ধবিরতির সময় সরকার এই কট্টরপন্থী সংখ্যালঘু সমর্থকদের ওপরই অনেক বেশি নির্ভর করেছে।

২০২২–২৩ সালে ইরানে বড় বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শেষ পর্যন্ত সরকার নারীদের পোশাকবিধি নিয়ে কঠোর অবস্থান কার্যত শিথিল করতে বাধ্য হয়েছিল। হেফাজতে থাকা অবস্থায় মাসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে ওই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়িয়েছিল। তখন থেকে অনেক নারী বাধ্যতামূলক হিজাব ছাড়াই প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। আর এই বিষয়টি ইরানের কট্টরপন্থীদের অসন্তুষ্ট করে আসছে।

সংঘাত চলাকালে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর পছন্দের উত্তরসূরি হিসেবে ছেলে মোজতবা খামেনিকে ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রেও বিপ্লবী গার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মোজতবা এখনো জনসমক্ষে দেখা দেননি এবং বিপ্লবী গার্ডের প্রভাবকেও আগের চেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স ভাটাঙ্কা মনে করেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠী ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিরোধী বিক্ষোভকারীদের মতোই নিজেদের সমর্থিত চুক্তির বিরোধিতা করা কট্টরপন্থীদের বিরুদ্ধেও কঠোর হতে পারে।

ভাটাঙ্কা আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, যে বা যারাই প্রতিষ্ঠিত ঐকমত্যকে চ্যালেঞ্জ করবে, তার বিরুদ্ধেই তারা ব্যবস্থা নেবে। কারণ, আলী খামেনির পরবর্তী সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। নারীরা হয়তো হিজাব ছাড়া চলাফেরার মতো কিছু সামাজিক স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে। কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সহনশীলতা দেখানো হবে না।’