জেএফ-১৭ থান্ডার হলো চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে তৈরি করা একটি ‘মাল্টি-রোল’ যুদ্ধবিমান
জেএফ-১৭ থান্ডার হলো চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে তৈরি করা একটি ‘মাল্টি-রোল’ যুদ্ধবিমান

সৌদিতে যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সেনা মোতায়েন পাকিস্তানের

একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে আট হাজার সেনা, এক স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান এবং একটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করেছে পাকিস্তান। ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রধান ভূমিকা পালন করা সত্ত্বেও রিয়াদের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা জোরদার করল ইসলামাবাদ।

এ মোতায়েনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এবারই প্রথম সামনে এল। তিনজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও দুটি সরকারি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তারা সবাই এটিকে একটি বড় ও যুদ্ধ-প্রস্তুত বাহিনী হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার উদ্দেশ্য সৌদি আরব আবার কোনো হামলার শিকার হলে দেশটির সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করা।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সৌদি আরবের সরকারি গণমাধ্যম শাখা—কোনো পক্ষই এই মোতায়েনের বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

গত বছর স্বাক্ষরিত এই প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণ শর্তাবলি গোপন রাখা হয়েছে। তবে উভয় পক্ষই জানিয়েছে, কোনো এক পক্ষ আক্রান্ত হলে পাকিস্তান ও সৌদি আরব একে অপরের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসতে বাধ্য থাকবে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এর আগে আভাস দিয়েছিলেন যে এই চুক্তির ফলে সৌদি আরব পাকিস্তানের পারমাণবিক সুরক্ষার (নিউক্লিয়ার আমব্রেলা) আওতায় এসেছে।

সূত্রগুলো জানায়, পাকিস্তান প্রায় ১৬টি যুদ্ধবিমানের একটি পূর্ণ স্কোয়াড্রন পাঠিয়েছে, যার বেশির ভাগই চীনের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ ফাইটার। গত এপ্রিলের শুরুতে এগুলো সৌদি আরবে পাঠানো হয়। দুজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, পাকিস্তান দুই স্কোয়াড্রন ড্রোনও পাঠিয়েছে।

পাঁচটি সূত্রই জানিয়েছে, এই মোতায়েনের মধ্যে প্রায় আট হাজার সেনা রয়েছেন এবং প্রয়োজন হলে আরও সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি একটি চীনা এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও পাঠানো হয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং হাজার হাজার সেনার এই মোতায়েনের পরিধি ও ধরন প্রমাণ করে যে পাকিস্তান কেবল প্রতীকী বা উপদেষ্টা মিশন পাঠায়নি; বরং এর চেয়ে অনেক বেশি কিছু পাঠিয়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, এসব সরঞ্জাম পাকিস্তানি কর্মীরা পরিচালনা করছেন এবং এর খরচ বহন করছে সৌদি আরব।

দুজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, ইরান সংঘাতের মধ্যে মোতায়েন হওয়া সামরিক ও বিমানবাহিনীর কর্মীরা মূলত উপদেষ্টা ও প্রশিক্ষণমূলক ভূমিকায় থাকবেন। এই কর্মকর্তারা দুই দেশের মধ্যকার নথিপত্র ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের আদান-প্রদান দেখেছেন বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, পূর্ববর্তী চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে ইতিমধ্যে অবস্থানরত হাজারো পাকিস্তানি সেনার পাশাপাশি এই নতুন বাহিনী যুক্ত হচ্ছে।

গোপন প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল নথি দেখেছে, এমন একটি সরকারি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি বাহিনীর পাশাপাশি দেশটির সীমান্ত সুরক্ষায় সহায়তার জন্য সর্বোচ্চ ৮০ হাজার পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের সুযোগ রয়েছে এই চুক্তিতে।

দুজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, এই চুক্তির আওতায় পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের বিষয়ও রয়েছে। তবে কোনো যুদ্ধজাহাজ ইতিমধ্যে সৌদি আরবে পৌঁছেছে কি না, তা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি।

সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুই দেশের নেতারা। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, রিয়াদ

সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং হাজার হাজার সেনার এই মোতায়েনের পরিধি ও ধরন প্রমাণ করে যে পাকিস্তান কেবল প্রতীকী বা উপদেষ্টা মিশন পাঠায়নি; বরং এর চেয়ে অনেক বেশি কিছু পাঠিয়েছে।

রয়টার্স আগেই জানিয়েছিল, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানি হামলায় এক সৌদি নাগরিক নিহত হওয়ার পর পাকিস্তান সেখানে যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছিল। ওই হামলার পর উপসাগরীয় এই রাজতন্ত্র বড় ধরনের প্রতিশোধ নিতে পারে এবং সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

এটি এমন এক সময়ে ঘটেছিল, যার পরপরই ইসলামাবাদ এ যুদ্ধের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকরে সহায়তা করে, যা ছয় সপ্তাহ ধরে বজায় রয়েছে। ইসলামাবাদ এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার একমাত্র শান্তি আলোচনার আয়োজন করেছে এবং পরবর্তী আলোচনার পরিকল্পনাও করেছিল, যা পরে উভয় পক্ষ বাতিল করে।

রয়টার্স পরবর্তী সময়ে আরও জানায়, সৌদি আরবের ভেতরে হওয়া হামলার প্রতিশোধ হিসেবে রিয়াদ ইরানের ওপর বেশ কয়েকটি অঘোষিত হামলা চালিয়েছিল।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবকে প্রশিক্ষণ ও উপদেষ্টা মোতায়েনের মাধ্যমে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে রিয়াদ বারবার আর্থিক সহায়তা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে।